Shuchismita Sarkar RSS feed

Shuchismita Sarkarএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • গো-সংবাদ
    ঝাঁ চকচকে ক্যান্টিনে, বিফ কাবাবের স্বাদ জিভ ছেড়ে টাকরা ছুঁতেই, সেই দিনগুলো সামনে ফুটে উঠলো। পকেটে তখন রোজ বরাদ্দ খরচ ১৫ টাকা, তিন বেলা খাবার সঙ্গে বাসের ভাড়া। শহরের গন্ধ তখনও সেভাবে গায়ে জড়িয়ে যায় নি। রাস্তা আর ফুটপাতের প্রভেদ শিখছি। পকেটে ঠিকানার ...
  • ফুরসতনামা... (পর্ব ১)
    প্রথমেই স্বীকারোক্তি থাক যে ফুরসতনামা কথাটা আমার সৃষ্ট নয়। তারাপদ রায় তার একটা লেখার নাম দিয়েছিলেন ফুরসতনামা, আমি সেখান থেকে স্রেফ টুকেছি।আসলে ফুরসত পাচ্ছিলাম না বলেই অ্যাদ্দিন লিখে আপনাদের জ্বালাতন করা যাচ্ছিলনা। কপালজোরে খানিক ফুরসত মিলেছে, তাই লিখছি, ...
  • কাঁঠালবীচি বিচিত্রা
    ফেসবুকে সন্দীপন পণ্ডিতের মনোজ্ঞ পোস্ট পড়লাম - মনে পড়ে গেলো বাবার কথা, মনে পড়ে গেলো আমার শ্বশুর মশাইয়ের কথা। তাঁরা দুজনই ছিলেন কাঁঠালবীচির ভক্ত। পথের পাঁচালীর অপু হলে অবশ্য বলতো কাঁঠালবীচির প্রভু। তা প্রভু হোন আর ভক্তই হোন তাঁদের দুজনেরই মত ছিলো, ...
  • মহাগুণের গপ্পোঃ আমি যেটুকু জেনেছি
    মহাগুণ মডার্ণ নামক হাউসিং সোসাইটির একজন বাসিন্দা আমিও হতে পারতাম। দু হাজার দশ সালের শেষদিকে প্রথম যখন এই হাউসিংটির বিজ্ঞাপন কাগজে বেরোয়, দাম, লোকেশন ইত্যাদি বিবেচনা করে আমরাও এতে ইনভেস্ট করি, এবং একটি সাড়ে চোদ্দশো স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাট বুক করি। ...
  • রূপকথা মগলা
    মগলাকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাতে সানথাল, দেখতে শুনতেও মানুষ। কিন্তু মানুষ না। ওর পূর্বপুরুষরা ছিল ম্যাস্টোডন। হাতিদের সঙ্গেই ওঠাবসা। হাতিদের মতই দিনে চার ঘন্টা ঘুমোয়, কুড়ি ঘন্টা দাঁত নাড়ে। অবশ্য, শুধু হাতি নে, জঙ্গল আর জঙ্গলের সমস্ত প্রাণীর জন্যই ...
  • কয়েকটি রঙিন স্যান্ডেল
    সেদিন সন্ধ্যায় সৈয়দ শামসুর রহমানের মনে হল তিনি জীবনে ব্যর্থ হয়েছেন। তার ব্যর্থতার পরিমাণ দেখে তিনি নিজেই বিস্মিত হলেন। তার গলা শুকিয়ে গেল অতীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছন্নছাড়া কিছু চিন্তা করে। সৈয়দ শামসুর রহমান বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তিনি উঠে বসলেন। বিছানার ...
  • পুরনো পথ সাদা মেঘ, পর্ব ৪
    পুরনো পথ সাদা মেঘ — বুদ্ধদেবের পথে পথ চলা, পর্ব ৪[অন্যত্র: https://medium.com/জ...
  • পুরনো পথ সাদা মেঘ - পর্ব ৩
    [এটি আপনি https://medium.com/জ...
  • পুরনো পথ সাদা মেঘ - দ্বিতীয় পর্ব
    মোষ চরাণোর কথকতাসুশীতল দিন। গভীর মনসংযোগ সহকারে দ্বিপ্রাহরিক আহার শেষ করে ভিক্ষুরা যে যার পাত্র ধুয়ে মেজে মাটিতে আসন বিছিয়ে বুদ্ধদেবের দিকে মুখ করে বসলেন। বাঁশবন মঠটিতে অজস্র কাঠবেড়ালি, তারা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়, সাধুদের মাঝখান দিয়েই খেলে বেড়াতে ...
  • ক্রিকেট
    ১।সেলিব্রিটি পাবলিকদের মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেবার সময় গুগলি প্রশ্ন দেবার চেষ্টা করে। তেমনি এক অখাদ্য গুগলি টাইপের প্রশ্ন হল, আপনি জীবনে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট কি পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে। বলাই বাহুল্য আমি বিখ্যাত কেউ নেই, তাই আমাকে এই প্রশ্ন কেউ ...

নকশার উল্টো পিঠ

Shuchismita Sarkar

আমার দিদার ছিল গোটা চারেক ভালো শাড়ী। একটা বিয়ের বেনারসী, একটা গরদ, মাঝবয়েসে বেনারস বেড়াতে গিয়ে সেখান থেকে কেনা একটা কড়িয়াল বেনারসী, এছাড়া শেষের দিকে তসরও হয়েছিল। মায়ের প্রথম দামী শাড়ী পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোন হস্তশিল্প মেলা থেকে কেনা দুধে আলতা রঙের একটা বালুচরী। পঁচিশ বছর পরেও তার জলুষ অম্লান এবং তার তুল্য একটি দ্বিতীয় বালুচরী আজ পর্যন্ত দেখলাম না। সেই শাড়ীটি কেনার সময়ে মায়ের পনেরো বছর চাকরী করা হয়ে গেছে। তারপরে মুক্ত অর্থনীতি এসে লোকজনের হাতে টাকাপয়সা বেড়েছে। এখন মধ্যবিত্তের ঘরেও বিভিন্ন প্রদেশের একাধিক হ্যান্ডলুম শাড়ী। কিন্তু যারা এই শাড়ীগুলো মধ্যবিত্তের হাতে তুলে দিচ্ছেন তাদের অবস্থা কেমন? এবং এককালে যেসব শাড়ী মানুষ একটা দুটোর বেশি কিনে উঠতে পারত না, তা এমন সহজলভ্যই বা হয়ে উঠছে কি উপায়ে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার আগে সংক্ষেপে হ্যান্ডলুম শাড়ীর নির্মাণ প্রক্রিয়া জানা যাক। হ্যান্ডলুম অর্থাৎ কিনা হাতে বোনা। কাপড় যদি খাদির হয় তাহলে সুতোটাও হাতে তৈরী। বেশীর ভাগ সিল্কের ক্ষেত্রেও তাই। ব্যাঙ্গালোর সিল্কের ক্ষেত্রে সুতো তৈরী হচ্ছে মেশিনে। খাদী ছাড়া অন্য কটন সুতোও মেশিনে তৈরী। যে রকম সুতোই হোক না কেন, প্রাথমিক ভাবে সেটা হবে কোরা রঙের (বিস্কুট কালার)। রঙিন কাপড় চাইলে সেই সুতো প্রথমে ব্লিচ করতে হবে। তারপর তাতে রঙ ধরাতে হবে। অর্থাৎ সাদা কাপড়ের ক্ষেত্রেও যে রঙটা আমরা দেখি তা সুতোর আসল রঙ নয়। ইক্কত গোত্রের কাপড়ের ক্ষেত্রে আবার রঙ করার বিশেষ পদ্ধতি আছে। ইক্কতে যে প্যাটার্ণ তোলা হবে সেই হিসেব মত সুতোর এক একটা অংশ এক এক রকম রঙ করা হয়। রঙ করার শেষে সুতোর গুটি বানিয়ে তুলে রাখা হয় শাড়ী বোনার জন্য।

এবার তাঁত (লুম) প্রস্তুত করতে হবে কাপড় বোনার জন্য। সাধারণ ঢালা শাড়ীর ক্ষেত্রে এটা খুব বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু বালুচরী, বোমকাই, সম্বলপুরী, কাঞ্জীভরমের মত জমকালো শাড়ীর বেলায় লুম তৈরী করতেই লেগে যায় দশ-বারো দিন। একটা শাড়ী বুনতে দুইদিক থেকে সুতো আসে। একটা হরাইজন্টাল বা টানা সুতো। অন্য সুতোটা আসছে ভার্টিকালি। একে বলা হয় পোড়েনের সুতো। বোমকাই, সম্বলপুরী, জামদানী জাতীয় শাড়ীর ক্ষেত্রে জমির নকশা তোলা হয় এই পোড়েনের সুতো দিয়ে। লুম তৈরী করার অর্থ হল প্রতিটা টানার সুতোকে সমান্তরাল ভাবে সূচে ভরে দেওয়া। পাড়ের নকশায় যদি আলাদা রঙের সুতো যায় তাহলে নকশা অনুযায়ী সেই সুতোর গতিবিধি ঠিক করা। এর পর তাঁতী পোড়েনের সুতো চালিয়ে নকশা তুলবে শাড়ীতে। বালুচরী, কাঞ্জীভরম, বেনারসী গোত্রের শাড়ীর ক্ষেত্রে জাকার্ড লুমের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। সেক্ষেত্রে যে ডিজাইন বোনা হবে সেটা কার্ডে তোলা থাকে। সেই কার্ড এবং কোন অংশে কি রঙের সুতো যাবে সেই হিসেব মত লুম তৈরী করা হয়। একবার লুম তৈরী হয়ে গেলে শাড়ী বুনতে খুব বেশী সময় লাগে না। সাধারণ তাঁতের শাড়ীর ক্ষেত্রে একদিনই যথেষ্ট। কাজের সুক্ষ্মতা অনুযায়ী এক থেকে ছয়দিন লাগে শাড়ী বুনতে। যদি একই ডিজাইনের অনেকগুলো শাড়ীর অর্ডার থাকে, তাঁতী সেক্ষেত্রে একই লুমে সবকটা শাড়ী বুনে ফেলতে পারেন। লুম তৈরী করার সময়টা সেক্ষেত্রে বেঁচে গেল।

এবার আমাদের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। নিজের হাতে সুতো তৈরী করে, কাপড় বুনে তাঁতীরা মজুরী কেমন পান? সম্পুর্ণ হাতে তৈরী একটা শিল্প যে টাকায় কিনে আমরা ঘরে তুলি সেটা কি যথেষ্ট? যদি না হয়, তাহলে কেমন করে চলছে এই বাজার? শেষের দিক থেকে শুরু করা যাক। হ্যান্ড্লুম শাড়ীর রমরমা শুরু হওয়ার পর থেকে অনেকেই সীমিত অভিজ্ঞতা ও পড়াশোনা নিয়ে বুটিক খুলে বসেছেন। এবং সেখানে অনেক সময়েই দেখা যাচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে একই রকম শাড়ী এক্জন বিক্রি করছেন পাঁচ হাজার টাকায়, অন্যজনের কাছে পাওয়া যাচ্ছে তার অর্ধেক দামে। এটা কি ভাবে সম্ভব হচ্ছে? প্রথম যে কথাটা বলা যায় তাহল বেসরকারী শাড়ীর দোকানে কোন কোয়ালিটি চেক হয় না। ২০১৭ সালে, একটা আসল তসরের থানের দাম পড়ে অন্তত ৩৫০০ টাকা। কিন্তু অনেকেই এর ঢের কমে তসর বিক্রি করছেন। এটা সম্ভব হচ্ছে কারন ভারতীয় তসরের সাথে এসে মিশছে কম দামী কোরিয়ান তসর। এই মিশ্রণ অনভিজ্ঞ চোখে ধরা প্রায় অসম্ভব। একটা কোরিয়ান সুতো, একটা ভারতীয় সুতো দিয়ে বোনা হচ্ছে এই মিশ্র তসর। দাম নেমে আসছে ২৩০০ তে। গত সাত-আট বছরে ঘিচা তসরও খুব জনপ্রিয় হয়েছে। ঘিচা অবশ্য নকল তসর নয়। কিন্তু বনেদী মসৃণ উজ্জ্বল তসরের চেয়ে কিছু নিরেশ। ঘিচার যে দাগ এবং অমসৃণতা এর অ্যাপিল বাড়ায় সেটাই ঘিচার তুলনামূলক কম দামের কারন।

এ তো গেল উপাদানের ভেজাল। পদ্ধতির ভেজালও আছে। অবশ্য তাকে ভেজাল বলতে আমার আপত্তি আছে। যদিও লেখার শুরুতেই বলেছিলাম হ্যান্ডলুম মানেই হাতে তৈরী, আদতে অনেক জায়গায় পাওয়ার লুম ঢুকে গেছে। পাওয়ার লুমের শাড়ীতেও হ্যান্ডলুম এফেক্ট দেওয়া সম্ভব, যদিও অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়বেই। পাওয়ার লুমের শাড়ী অনেক নিখুঁত হবে। হ্যান্ডলুমের যে ছোটখাটো ত্রুটিগুলো প্রতিটা শাড়ীকে অনন্য করে তোলে সেটা পাওয়ার লুমে অনুপস্থিত। নামেই বোঝা যাচ্ছে, পাওয়ার লুমে অনেক তাড়াতাড়ি শাড়ী তৈরী সম্ভব। একটা শাড়ী হাতে বুনতে যেখানে এক বা একাধিক দিন লেগে যায়, পাওয়ার লুমে সেখানে একদিনে অনেকগুলো শাড়ী তৈরী করে ফেলা যাচ্ছে। ফলে সেই শাড়ী কম দামে বিক্রি করাও সম্ভব হচ্ছে। পাওয়ার লুমে তৈরী শাড়ী যদি সেই ট্যাগ সহ বিক্রি হয় আমি তাতে অন্যায় দেখি না, যদিও এই প্রবন্ধ লেখায় আমি যার সাহায্য নিচ্ছি তার মতে পাওয়ার লুমের বহুল প্রচলনের ফলে হ্যান্ডলুম শিল্প একদিন মরে যাবে যেটা একটা অপূরণীয় ক্ষতি। এই যুক্তিটা অনস্বীকার্য। এগুলো যেহেতু বংশপরম্পরায় বাহিত জ্ঞান, হ্যান্ডলুমের মৃত্যুর সাথে সাথে এই জ্ঞানভান্ডারও হারিয়ে যাবে।

এর পর আসি মজুরীর প্রসঙ্গে। মজুরীর ব্যাপারে দক্ষতা অনুযায়ী ভেদাভেদ নেই। যিনি সুতো বানাচ্ছেন, যিনি রঙ করছেন, যিনি বুনছেন, প্রিন্টের ক্ষেত্রে যিনি ব্লক বসাচ্ছেন সবার এক মজুরী। দিনে তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো। যে তাঁতী স্বাধীন ভাবে নিজের ঘরে থেকে কাপড় বিক্রি করছেন তিনিও এর বেশী ধরেন না। বরং অনেকসময় তাঁর মজুরী আরোই কম। বহুক্ষেত্রেই এঁদের নিজেদেরই ভালো ধারনা নেই কত মজুরী হওয়া উচিত। ফুলিয়ায় তাঁতীর ঘর থেকে যে শাড়ী চারশো টাকা বা তারও কমে পাইকারী রেটে তুলে আনা হল, তার জন্য একজন তাঁতীর কাঁচামালের খরচই অন্তত সত্তর টাকা। তাহলে মজুরী বাদ দিয়ে লাভ বলতে গেলে নেই। কিন্তু যাঁরা স্বাধীন ভাবে ব্যবসা করেন তাঁরা কাঁচামালের খরচ উঠে গেলেই খুশি। নিজেদের পরিশ্রমের কতটা মূল্য তা তাঁরা নিজেই জানেন না। আরো একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। ধরা যাক তাঁতী কোন বড় ব্যবাসায়ীর থেকে অর্ডার পেলেন। তখন অর্ডারের শাড়ী হয়ে যাওয়ার পরেও যে কাঁচামাল বাঁচে তাতে তিনি আরো কয়েকটা শাড়ী বুনে ফেলতে পারেন। সেই শাড়ী তখন খুব কম দামে বিক্রি হয়ে গেলেও তাঁতীর লোকসান থাকে না।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মধ্যবিত্তের ঘরে সুলভে হ্যান্ডলুম উঠলেও তাঁতীর ঘরের অবস্থা বিশেষ বদলাচ্ছে না। এবং সুলভ হ্যান্ডলুমের যোগান দিতে গিয়ে ভেজাল শিল্পও লক্ষ্যনীয় ভাবে পুষ্ট হয়ে উঠছে। দুটোই তাঁতশিল্পের জন্য খারাপ খবর। এর থেকে বেরোনোর এক্ষুনি কোন উপায় নেই যদি না তাঁত শিল্পের প্রতি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী বদলানো সম্ভব হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের হাতে বোনা শাড়ী আমরা যে আগ্রহ ও ভালোবাসার সাথে সংগ্রহ করি, সেই উৎসাহের কিছুটা সংশ্লিষ্ট শিল্প এবং তার ধারক-বাহকদের জানার জন্য খরচ না করলে নিজেকে শাড়ীপ্রেমিক বলে দাবী করার মানে হয় না। এটা আমাদের বুঝতে হবে প্রতিটা হাতে বোনা শাড়ীই অমূল্য। হস্তশিল্প মেলায় গিয়ে দরদাম করে কেনার জন্য এ জিনিস নয়। নিজে তাঁতীর ঘরে গিয়ে সম্মান দিয়ে একে নিয়ে আসতে হবে। এটা ঠিক, এই আশঙ্কা মনে থাকবেই যে এত দাম দিয়ে যে জিনিস কেনা হচ্ছে তা আসল কিনা। সে জন্য কোয়ালিটি চেকের ব্যবস্থা সরকারের তরফ থেকেই থাকতে হবে। কিন্তু কোয়ালিটি চেকের পর তার দাম দিতে গিয়ে কৃপণতা করলে সেই শিল্পের সাথে জড়িত মানুষদের প্রতি অবিচার করা হবে। আর তাতে মরে যাবে শিল্পটাই। যে তাঁতী দিনে সাড়ে তিনশো টাকা মজুরী পান, তিনি কি চাইবেন তাঁর সন্তানও এই পেশায় আসুক? হয়ত সর্বত্র পাওয়ার লুম এসে গেলে তাঁতীর মজুরী নিয়ে ভাবারই প্রয়োজন ফুরোবে। তাঁতশিল্প মিউজিয়ামে আশ্রয় নেবে। তাঁতীরা চলে যাবেন অন্য পেশায়। তেমনটা হলে খুব খুশি হব বলতে পারি না। তার চেয়ে বরং খুশি থাকতে পারি যদি আমার দিদার মত আমারও সারা জীবনে মোটে গোটা চারেক বলার মত শাড়ী থাকে। দিদার যুগে সম্ভব ছিল না, কিন্তু এযুগে তো সম্ভব আমাদের জীবনের ঐ গুটিকয় শাড়ী যাঁরা বানাবেন তাঁদের খুঁজে বার করা, তাঁদের থেকে শাড়ী তৈরীর গল্পটা জেনে নেওয়া, অমূল্য শিল্পের জন্য যতখানি বেশি সম্ভব পার্থিব মূল্য দিয়ে শাড়ীটি সংগ্রহ করা। আলমারীতে একশোটা শাড়ীর বদলে এই গুটি চার শাড়ীর গল্প জেনে তাকে আপন করে নেওয়া অনেক রোমাঞ্চকর নয় কি?

(এই লেখাটি লিখতে আমায় সাহায্য করেছেন আমার পিসতুতো ভাই ছন্দক জানা। তিনি ন্যাশনাল ইন্সটিটিঊট অফ ফ্যাশন টেকনোলজির স্নাতক ও শাড়ীশিল্পী)


Avatar: d

Re: নকশার উল্টো পিঠ

চমৎকার তথ্যসংগ্রহ হুচি।
এই জায়গাটায় আমার খটকা এই যে চারটে কি পাঁচটা শাড়ি যদি আমি তুমি সংগ্রহ করি, তাতে কি তাঁতীর খুব উপকার হবে? মানে প্রচুর দাম দিয়ে অল্পসংখ্যক শাড়ি কিনলাম, তার গল্প জানলাম এটা একজন ইউজারের দিক থেকে ঠিকই আছে হয়ত। শাড়ির বদলে অন্য আরো পাঁচরকম পরিধেয় যেখানে আরো সস্তা, সহজলভ্য ও সুবিধেজনকও বটে।
কিন্তু তাতে কি তাঁতীদের সত্যি উপকার হবে?
Avatar: a

Re: নকশার উল্টো পিঠ

টানা পোড়েন তাহলে এখান থেকেই এসেছে
Avatar: Shuchismita

Re: নকশার উল্টো পিঠ

তাঁতী এবং তাঁতশিল্পের অবস্থা এই মুহুর্তে বেশ খারাপ। তার কিছু কারন আমি এই লেখায় উল্লেখ করেছি। আরও কিছু কারন নিশ্চয়ই আছে যেগুলো বাদ পড়ে গেছে। আমি যেটুকু জানতে পেরেছি তাতে আমার মূল সমস্যা মনে হয়েছে কোয়ালিটি চেকের অভাব। এর ফলে নকল বা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট মানের জিনিস আসল বলে বিক্রি হচ্ছে। যিনি কিনছেন তাঁর বোঝার ক্ষমতা নেই অনেকসময়েই। আবার পাওয়ারলুমের শাড়ীও হ্যান্ডলুম বলে বাজারে চলছে। এগুলো দেখার কেউ নেই বলে যে তাঁতী সত্যি করেই হ্যান্ডলুম করছেন বা আসল উচ্চমানের উপাদান ব্যবহার করছেন তাঁর কাপড় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। কারন সেই কাপড়ের যা দাম হবে তার চেয়ে অনেক কম দামে প্রায় একই রকম দেখতে শাড়ী পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। ইতিহাসে পড়েছি, প্রথম যখন কাপড়ের কল এসেছিল, তখন সস্তায় মিলের শাড়ীর সাথে প্রতিযোগিতায় হাতে বোনা তাঁতীদের নাভিশ্বাস উঠেছিল। আমার মনে হচ্ছে, এই অবস্থায় সবচেয়ে আগে প্রয়োজন কোয়ালিটি চেকের। পাওয়ার লুমে হ্যান্ডলুম এফেক্টের শাড়ী তৈরী হলে এবং সেটা সুলভে বাজারে এলে ক্ষতি নেই যদি সেটা পাওয়ার লুম হিসেবেই বিক্রি হয়। নইলে যে তাঁতী সত্যিকারের হ্যান্ডলুম বানাবেন তিনি কি করে ক্রেতাকে বিশ্বাস করাবেন কেন তাঁর শাড়ীর দাম বেশি। একই কথা প্রযোজ্য সুতোর কোয়ালিটি নিয়ে। যে কোরিয়ান মিক্সড তসরের কথা আমি লেখায় উল্লেখ করেছি সেটাও দেখতে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু কেউ সেটা আসল ভারতীয় তসর ভেবে কিনলে ভারতীয় তসরের প্রতি অবিচার হবে।

একটা হ্যান্ডলুম শাড়ী বানাতে কতটা পরিশ্রম হয় তার কিছুটা আন্দাজ আমি এই লেখায় দিতে চেষ্টা করেছি। অনেক কিছু এখানে বাদও পড়েছে। যেমন ধরা যাক খাদি বা তসরের সুতো বানাতে কেমন সময় লাগে সেই তথ্য আমার এখনও সংগ্রহ করা হয়নি। এই তথ্যগুলো দিতে চাই কারন এগুলো সামনে এলে সচেতন মানুষ নিজেই হিসেব করতে পারবেন একটা সম্পূর্ন হাতে বোনা শাড়ীতে কত ঘন্টার পরিশ্রম লাগছে। তারপর শাড়ীর দাম থেকে তিনি বুঝতে পারবেন এই হাতের কাজের জন্য ঘন্টাপ্রতি একজন তাঁতী কত টাকা মজুরী পান। আমার নিজের হিসেবে মনে হয়েছে তাঁতীদের উপযুক্ত মজুরী দিতে গেলে আমার পক্ষে প্রতি বছর একটা করে হ্যান্ডলুম শাড়ী কেনা সম্ভব হবে না। আমি এটা বলতে চাইনি যে শাড়ী সংগ্রাহকের সারা জীবনে চারটির বেশি শাড়ী কেনা চলবে না। আমার বক্তব্য হল, যত খুশী শাড়ী কিনুন, কিন্তু হাতের কাজের উপযুক্ত মূল্য দিন। মেশিনে বানানো শাড়ী আর হাতে বানানো শাড়ীর এক মূল্য হতে পারে না।

হ্যান্ডলুমের দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তাঁতীদের পেশা বিপন্ন হবে বলে মনে হচ্ছে? আমার তো ধারনা পেশাটি ইতিমধ্যেই বিপন্ন। যেসব গ্রামে পাওয়ার লুম এসে গেছে সেখানে হাতে বোনার লোকের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। যাঁরা এখনও হাতে বুনছেন, তাঁরা তাঁতের পাশাপাশি চাষের কাজও করছেন। নইলে সংসার চলে না। এই অবস্থায় হ্যান্ডলুম সংরক্ষণ করতে গেলে এই পেশার মানুষকে নিয়ে আলাদা করে ভাবতেই হবে। একটা পেন্টিং-এর যখন দাম নির্ধারণ হয় তখন তো আমরা ভাবি না সেটা সুলভ হল কিনা। তাঁতীও একজন শিল্পী। সেই শিল্পের উপযুক্ত মূল্যায়ন এবং যথাযথ পারিশ্রমিক দিতে হবে বইকি।

আমি তাঁতশিল্পের সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি এমন দাবী করছি না। আমি শুধু হ্যান্ডলুম বিষয়ে সচেতনতা এবং আলোচনা চাইছি। হ্যান্ডলুমের প্রধান ক্রেতা উচ্চশিক্ষিত এবং আর্থিক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ মেয়েরা। তারা এ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করলে কিছু সমাধান বেরিয়ে আসবে বলেই আমার ধারনা।





Avatar: পাই

Re: নকশার উল্টো পিঠ

হুচি খুব ভাল করেছে এই কথাগুলো তুলে এনে। এসব নিয়ে তো এতকিছু জানতামও না, ভাবিওনি।
এখানে একটা ভাল আলোচনা হচ্ছে। রেখে গেলাম।
https://m.facebook.com/groups/175129282505026?view=permalink&id=17
49858978365374

Avatar: Shuchismita

Re: নকশার উল্টো পিঠ

ফেসবুক থেকে একটা গুরুত্বপূর্ন তথ্য এখানে তুলে রাখছি।

ছন্দক জানা লিখেছেনঃ

গোল্ড-এর যে রকম Hallmark হয় সেরকম টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে Silk mark, wool mark, cotton mark, organic cotton mark ও handloom mark আছে। এগুলো রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নেওয়া যায়। কিন্তু এই মার্ক লাগালে শাড়ীর দাম একটু বেশি হয়। তখন অনেকেই বেশি দাম বলে সেই শাড়ী কিনতে চান না। তাই কেউ এই মার্ক নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না।

Avatar: SS

Re: নকশার উল্টো পিঠ

ফ্রি মার্কেট সিস্টেমে যে জিনিসের দাম বেশি সেটার ক্রেতা কম হবেই, কিছু করার নেই। যে কারণে উবার এসে রেজিস্টার্ড ট্যাক্সি বিজনেস অলমোস্ট বন্ধ করে দিচ্ছে, সেই কারণেই ট্রেডমার্ক ওলা শাড়ি বেশি দাম দিয়ে লোকে কিনবে না। আর সোনার গয়নার সাথে ঠিক শাড়ির তুলনা করা যায়না, কারন গয়না এখনো সিকিওরিটি। গয়না বন্ধক রেখে দরকারে লোন নেওয়া যায়। তাই ক্রেতার কাছে কোয়ালিটি একটা গুরূত্বপূর্ন ব্যাপার, কোয়ালিটি খারাপ হলে সিকিওরিটি হিসেবে ব্যাবহার করা যাবে না। এছাড়া, গয়না এক জেনেরেশন থেকে আর এক জেনেরেশনে ট্রান্সফার হয়। একটা শাড়ির আয়ু বড়জোর এক থেকে দুই জেনেরেশন। আর শাড়ি সিকিওরিটি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তাই শাড়ির কোয়ালিটি নিয়ে খুব বেশি কেউ মাথা ঘামাবে না।আমি জানিনা শাড়ির দাম ইত্যাদই নিয়ে কোনো কম্প্রিহেন্সিভ মার্কেট স্টাডি কোথাও হয়েছে কিনা। মানে কি ধরণের শাড়ির চাহিদা সবথেকে বেশি, কোন শাড়ির জন্যে লোকে কত টাকা খরচ করতে রাজি আছে, বছরের কোন সময় শাড়ির চাহিদা বাড়ে, বিয়ের মরশুম নাকি পুজোর সময় এইসব। সকারের বয়ন শিল্প বিভাগ থেকে এইরকম একটা উদ্যোগ নেওয়া যায়। যদি দেখা যায় পুজোর সময় লোকে একটু বেশি দাম দিয়ে শাড়ি কিনতে রাজি, তাহলে হ্যান্ড্লুম একটা সিজনাল শিল্প হতে পারে। সারা বছর ধরে তাঁতিদের তাহলে হ্যান্ড্লুমের উপর নির্ভর করতে হবে না।
ইন্ডস্ট্রিয়ালাইজেশনের প্রভাব তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু কোনো শিল্প যদি টিঁকে থাকতে চায় তাহলে ফর্ম চেন্ঞ্জ করেই থাকতে হবে। আর প্রধানত সরকারকেই এই উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে হয়।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন