Ashoke Mukhopadhyay RSS feed

Ashoke Mukhopadhyayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মন্দিরে মিলায় ধর্ম
    ১নির্ধারিত সময়ে ক্লাবঘরে পৌঁছে দেখি প্রায় জনা দশেক গুছিয়ে বসে আছে। এটা সচরাচর দেখতাম না ইদানীং। যে সময়ে মিটিং ডাকা হ’ত সেই সময়ে মিটিঙের আহ্বাহক পৌঁছে কাছের লোকেদের ফোন ও বাকিদের জন্য হোয়া (হোয়াটস্যাপ গ্রুপ, অনেকবার এর কথা আসবে তাই এখন থেকে হোয়া) গ্রুপে ...
  • আমাদের দুর্গা পূজা
    ছোটবেলায় হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন আসছি্ল সব প্রতিমার মুখ দক্ষিন মুখি হয় কেন? সমবয়সী যাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম সে উত্তর দিয়েছিল এটা নিয়ম, তোদের যেমন নামাজ পড়তে হয় পশ্চিম মুখি হয়ে এটাও তেমন। ওর জ্ঞান বিতরন শেষ হলো না, বলল খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করে পুব মুখি হয়ে আর ...
  • দেশভাগঃ ফিরে দেখা
    রাত বারোটা পেরিয়ে যাওয়ার পর সোনালী পিং করল। "আধুনিক ভারতবর্ষের কোন পাঁচটা ঘটনা তোর ওপর সবচেয়ে বেশী ইমপ্যাক্ট ফেলেছে? "সোনালী কি সাংবাদিকতা ধরল? আমার ওপর সাক্ষাৎকার মক্সো করে হাত পাকাচ্ছে?আমি তানানা করি। এড়িয়ে যেতে চাই। তারপর মনে হয়, এটা একটা ছোট্ট খেলা। ...
  • সুর অ-সুর
    এখন কত কূটকচালি ! একদিকে এক ধর্মের লোক অন্যদের জন্য বিধিনিষেধ বাধাবিপত্তি আরোপ করে চলেছে তো অন্যদিকে একদিকে ধর্মের নামে ফতোয়া তো অন্যদিকে ধর্ম ছাঁটার নিদান। দুর্গাপুজোয় এগরোল খাওয়া চলবে কি চলবে না , পুজোয় মাতামাতি করা ভাল না খারাপ ,পুজোর মত ...
  • মানুষের গল্প
    এটা একটা গল্প। একটাই গল্প। একেবারে বানানো নয় - কাহিনীটি একটু অন্যরকম। কারো একান্ত সুগোপন ব্যক্তিগত দুঃখকে সকলের কাছে অনাবৃত করা কতদূর সমীচীন হচ্ছে জানি না, কতটুকু প্রকাশ করব তা নিজেই ঠিক করতে পারছি না। জন্মগত প্রকৃতিচিহ্নের বিপরীতমুখী মানুষদের অসহায় ...
  • পুজোর এচাল বেচাল
    পুজোর আর দশদিন বাকি, আজ শনিবার আর কাল বিশ্বকর্মা পুজো; ত্রহস্পর্শ যোগে রাস্তায় হাত মোছার ভারী সুবিধেজনক পরিস্থিতি। হাত মোছা মানে এই মিষ্টি খেয়ে রসটা বা আলুরচপ খেয়ে তেলটা মোছার কথা বলছি। শপিং মল গুলোতে মাইকে অনবরত ঘোষনা হয়ে চলেছে, 'এই অফার মিস করা মানে তা ...
  • ঘুম
    আগে খুব ঘুম পেয়ে যেতো। পড়তে বসলে তো কথাই নেই। ঢুলতে ঢুলতে লাল চোখ। কি পড়ছিস? সামনে ভূগোল বই, পড়ছি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। মা তো রেগে আগুন। ঘুম ছাড়া জীবনের কোন লক্ষ্য নেই মেয়ের। কি আক্ষেপ কি আক্ষেপ মায়ের। মা-রা ছিলেন আট বোন দুই ভাই, সর্বদাই কেউ না ...
  • 'এই ধ্বংসের দায়ভাগে': ভাবাদীঘি এবং আরও কিছু
    এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে ক্রমে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে সংকটের এক নতুন রুপরেখা তৈরি হচ্ছে। যে প্রগতিমুখর বেঁচে থাকায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি প্রতিনিয়ত, তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, "কোথায় লুকোবে ধু ধু করে মরুভূমি?"। এমন হতাশার উচ্চারণ যে আদৌ অমূলক নয়, তার ...
  • সেইসব দিনগুলি…
    সেইসব দিনগুলি…ঝুমা সমাদ্দার…...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন । মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'...
  • হরিপদ কেরানিরর বিদেশযাত্রা
    অনেকদিন আগে , প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে এই গেঁয়ো মহারাজ , তখন তিনি আরোই ক্যাবলা , আনস্মার্ট , ছড়ু ছিলেন , মানে এখনও কম না , যাই হোক সেই সময় দেশের বাইরে যাবার সুযোগ ঘটেছিলো নেহাত আর কেউ যেতে চায়নি বলেই । না হলে খামোখা আমার নামে একটা আস্ত ভিসা হবার চান্স নেই এ ...

।। ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ: কিছু কথা।। এক

Ashoke Mukhopadhyay

[মধ্য প্রদেশের এক দলিত অধ্যুষিত গ্রামে মেয়ের বিয়েতে ঢোল না বাজিয়ে ব্যান্ড বাজানোর অপরাধে গ্রামের একমাত্র কুয়োর জলে কেরসিন ঢেলে দিয়েছে গ্রামের উচ্চবর্ণের মাতব্বররা। আইসিস সন্ত্রাসীদের মতো এক কোপে গলা না কেটে সঙ্ঘু সন্ত্রাসীরা এই ভাবে অত্যন্ত উদার সহনশীল পদ্ধতিতে গলা শুকিয়ে তিলে তিলে পরলোকে প্রেরণের আয়োজন করছে। ঠিক সেই দিন, যেদিন দক্ষিণ এশিয়ার নামে ভারত সরকার একটি কৃত্রিম উপগ্রহ আকাশে তুলবে বলে ঘোষণা হল। মন্দ না! এই ভাবেই হিন্দু রাজ চায় ১৬ শতাংশের জন্য আধুনিক সুখী রাজ্য গড়ে তুলতে, আর ৮৪ শতাংশকে নিয়ে যেতে চায় ২৭২ খ্রিষ্টাব্দের বর্ণাশ্রমিক ঘোর অন্ধকার কালো যুগে। এই পরিস্থিতির একটা সামগ্রিক মূল্যায়ন বোধ করি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে! সুচিন্তিত যুক্তি, প্রামাণ্য তথ্য ও ভারত ইতিহাসের প্রশস্ত ক্যানভাসে। চলুন, তারই একটা প্রয়াস করা যাক!]

[১] সির্ফ রামজি কে নাম সে!

একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। কাল্পনিক নয়, একেবার সত্যি ঘটনা। শুধু পাত্রদের নামগুলো ফেকি:

১৯৯০-এর দশকের গোড়ার কথা। বাবরি মসজিদ তখনও ভেঙে পড়েনি। ভাঙবার তোড়জোর চলছে দেশ জুড়ে। উত্তর প্রদেশের বেনারস থেকে লক্ষ্ণৌ যাওয়ার তিনটি রেলপথের একটিতে, সুলতানপুর স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে কিলোমিটার পাঁচেক উত্তর-পূর্ব কোণে গেলে একটা গ্রাম পড়ে। সারন। মূলত অনুসূচিত জাতির মানুষদের বাস। সেই গ্রামে ১৯৯১ সালে এক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতার আগমন হয়, দলিতদের মধ্যে রামমন্দিরের পক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে।

তিনি সেই গ্রামের কয়েকশ মানুষের সঙ্গে বৈঠকে বসে প্রথমে সকলের শুভ নাম জানতে চান। স্বভাবতই বেশ কিছু নাম এসে পড়ে এই রকম: রামনরেশ, রামভক্ত, রামপ্রসাদ, রামপ্রকাশ, রামকিষেন, রামনারায়ণ, রামজিত, রামপ্রীত, রামসুন্দর, রামধন, রামকুশল, সীতারাম, ভগতরাম, জগতরাম, . . . ইত্যাদি। আরও অনেক রাম-হীন নামও সেখানে ছিল, যেমন মহেশ যাদব, কিশোর সিং, যুগল প্রসাদ, ইন্দারজিত, ইত্যাদি। কিন্তু সেই নেতা সেই সবের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে এই রাম-পৃক্ত নামগুলি আঁকড়ে ধরে এক গম্ভীর বাণী দিলেন: “জিস রামজি কে নাম হমারে সাথ জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে জীবন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে খান-পান সে হমারে রহন-সহন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, না জানে কিতনে দিনোঁ সে, ওহ নাম কো ক্যায়া হম ভুল যা সকতে হ্যাঁয়? উস পবিত্‌র্‌ নাম সে জুড়ে মন্দির হমে নহি চাহিয়ে? আপ কা ক্যায়া রায় মুঝে জরা বতানা।” বলাই বাহুল্য, সেই গ্রামের সেই বৈঠকে উপস্থিত সমস্ত জনতাই সাগ্রহে রামের নামাঙ্কিত মন্দির নির্মাণে সায় দিয়েছিল। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা ভাবলেন, তাঁর আসা সার্থক হল।

এদিকে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকারের তরফে সেই সময়েই মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বেরিয়েছে। তা নিয়েও চারদিকে হই-চই হচ্ছে। কাঁশিরাম (আবার রাম!) মায়াবতী প্রমুখর অভ্যুত্থান হচ্ছে। তাঁরা আবার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, যাতে সাধারণ দলিত বর্গের মানুষজন রামমন্দিরের হুজুগে গিয়ে না ভিড়ে পড়ে। সুতরাং তাঁদেরও এক নেতা একেবারে সেই সারন গ্রামেই এসে হাজির হলেন। যারা নিয়ে এসেছে, তারা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতার বিগত সভার সাফল্যের কথাও বলে দিয়েছে। সুতরাং তিনিও বাগ্‌বিস্তারে সেই একই পদ্ধতিতে এগোতে চাইলেন। উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলির সকলের নামধাম শোনার পর রামবিহীন নামগুলিকে অগ্রাহ্য করে তিনি বললেন: “জিস রাম কে নাম হমারে সাথ জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে জীবন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে পহচান সে মিলে হ্যায়, না জানে কিতনে দিনোঁ সে, উস নাম সে হমে ক্যায়া মিলা? হমারে খান-পান মে হমারে রহন-সহন মে উস সে ক্যায়া মিলা? নফরত, ঘ্‌রুণা, জীবনভর অবহেলনা, অওর ক্যায়া? তো উস নাম সে হমারা দলিতোঁ কা ক্যায়া লেনাদেনা? উস নাম সে জুড়ে মন্দির হমে কিউঁ চাহিয়ে, জহাঁ হমে ওহ লোগ শায়দ চঢ়নে ভি নহি দেঙ্গে? আপ কা ক্যায়া রায় মুঝে জরা বতানা।” আবারও বলাই বাহুল্য, উপস্থিত সকলেই এক বাক্যে জানাল, সেরকম মন্দিরে তাদের কোনোই আগ্রহ নেই। কাঁশিরামপন্থী নেতা তৃপ্তিসহ ভাবলেন, তাঁরও আসা সার্থক হয়েছে।

বিশ্বের বিচিত্র জটিল ঘটনাচক্রে এর কিছু দিন পর, ১৯৯১ সালের বোধ হয় ডিসেম্বরের দিকে, এই অধমেরও ঠিক সেই গ্রামেই পদার্পণ ঘটে। সেখানে একটি ঘরোয়া সভায় উপস্থিত মানুষেরা দুটো ঘটনাই আমাকে সবিস্তারে জানান। এবং মজার কথা হল, এবার তাঁরা আমার এই ব্যাপারে রায় কী জানতে চান। বলা বাহুল্য, আমার পক্ষে সেই রাম-নাম মাহাত্ম্য নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে খেলা করা সম্ভব ছিল না। পরিস্থিতির গুরুত্বের কথা ভেবে আমি সেদিনের সেই গ্রামীন ঘরোয়া বৈঠকে বেশ কিছু কথা বলেছিলাম, সহজ সরল ভাষায়; এখানে সেই কথাগুলোই একটু শহুরে রঙিন সংলাপে তত্ত্বের আকারে তুলে ধরতে চাই। হয়ত মাঝখানে গত প্রায় তিন দশকে এসে যাওয়া নতুন কিছু তথ্য অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান যোগ করে।

[২] অন্দর মহলে উঁকি

আজ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যেভাবে বিজেপি-র দাপট ও প্রভাব বাড়ছে, যেভাবে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের বক্তব্যকে চাড়িয়ে দিতে পারছে, তাতে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বহু মানুষই উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। এই যে কখনও পাকিস্তান, কখনও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে জিগির তুলে, কখনও দেশপ্রেমের বুলি আউড়ে, কখনও পাকিস্তান-বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সত্য মিথ্যা কাহিনির গুঞ্জন ছড়িয়ে, আবার কোনো সময় সরাসরি মুসলিম বিরোধী বিষোদ্গার করে দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষকে তারা খেপিয়ে তুলছে—এটা তারা করতে পারছে কেন? আমার ধারণা, এই জায়গাটা মার্ক্সবাদী বা বামপন্থী বলে পরিচিত দলগুলো, তাদের নেতা ও কর্মী, এমনকি তাদের আশেপাশে থাকা বুদ্ধিজীবীদেরও অনেকেই ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছেন না। তার ফলে তাদের কাজ কী, কীভাবে এই বিপদের মোকাবিলা করবেন, তাও তাঁরা ভেবে পাচ্ছেন না!

বিজেপি আর এস এস প্রমুখ জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নানা ধরনের প্রচারে যে হিন্দু জনসাধারণের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করে এবং বিভ্রান্ত হয়, এর পেছনে কতগুলো সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। আমরা যদি সেই জায়গাটা ধরতে না পারি, তাহলে ওদের প্রচারের পাল থেকে কখনই হাওয়া কেড়ে নিতে পারব না। মানব দেহের অসুখের চিকিৎসার মতোই সমাজ মননের অসুখেরও চিকিৎসার পদ্ধতি প্রকরণ অনেকটা একই রকম। ভাইরাস ব্যাক্টিরিয়াগুলোকে সনাক্ত করতে হবে, কোথায় তারা কীভাবে বাসা বেঁধেছে, তা জানতে হবে, তারপর তাদের নির্মূল করার কথা চিন্তা করতে হবে। এযাবত আমরা বামপন্থীরা মার্ক্সবাদীরা এইভাবে কাজটা করিনি। করতে যে হবে তাও ভাবিনি। ওরা একের পর এক মিথ্যা প্রচার গুজব বিভ্রান্তি ছড়িয়ে গেছে, আমরা তার পেছন পেছন ছুটে কোনটা মিথ্যা, কোন কথাগুলো গুজব, কী কী বিভ্রান্তি, তার জবাব দেবার চেষ্টা করে গেছি। ততক্ষণে ওরা আবার নতুন কিছু কথা বাজারে এনে ফেলেছে।

আসলে অবস্থাটা হওয়ার দরকার ছিল এই রকম: আমরা ওদের প্রশ্নের পেছনে ছুটব না; আমরা প্রশ্ন তুলব, ওরা উত্তর দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু দেশের বুকে বিভিন্ন প্রান্তে যখন গণ আন্দোলন শ্রেণি সংগ্রাম সমাজমুক্তির লড়াই চলতে থাকে, তখন ওরা এমনিতেই মুখ লুকিয়ে গর্তে বসে থাকে। বামপন্থীরা তখন মনে করে, এসব ধর্মসংক্রান্ত সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদী মুদ্দাগুলোর কথা আম পাবলিকের কাছে তোলার আর কোনো দরকার নেই। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক শ্রেণি মুদ্দাগুলিকে যত জনপ্রিয় করা যাবে ততই এসব ধ্যান ধারণা সমাজ মননে পিছু হঠতে থাকবে। নিজে থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাবে। অথচ, বাস্তবে যেটা হয়, তা হল: অধিকাংশ সাধারণ মানুষের সচেতন মনে সংগ্রামের কথাগুলোই উথালপাতাল হতে থাকে ঠিকই; কিন্তু পাশাপাশি অবচেতনলোকে তখনও অশ্রেণি বা প্রতি-শ্রেণি অভিপাদ্যগুলো ব্যাক্টিরিয়ার মতোই বাসা বাঁধতে থাকে, গহন মনে উপনিবেশ বানিয়ে ফেলতে থাকে। ধর্ম জাতপাত মগজের কিছু না কিছু জায়গা দখল করে বসেই থাকে। আমরা তা খেয়াল করি না, টের পাই না বা গ্রাহ্যও করি না। অন্তত এতকাল লক্ষ করিনি।

কিন্তু যখন এই রকম আন্দোলন থিতিয়ে যায়, মানুষ হতাশায় ভোগে, তখন সমস্ত ধরনের মৌলবাদীরা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, আর ওদের কথাগুলি সরবে বলতে শুরু করে। যেহেতু মানুষের মনে তার কিছু কিছু নিরাপদ আশ্রয় স্থল ভালোভাবে থেকে গেছে, তার ফলে তারা জোর পায়, পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায়, সহজেই এক বিরাট অংশের মানুষের মনের চেতন-অচেতন প্রায় সমস্ত কক্ষ দখল করে ফেলে। তখন বামপন্থীদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কেবলমাত্র সম্প্রীতির কথা বলা, ঐক্যের কথা বলা, ইত্যাদি। তখনও তারা আর ধর্মকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা সমাজের বুকে ছড়িয়ে আছে তা নিয়ে বিচারবিশ্লেষণাত্মক কিছুই বলতে পারে না। কেন না, সেই রকম পরিস্থিতিতে তাদের ভয় হয়, সেই সব কথা তুলতে গেলে যদি মানুষ খেপে যায়। যদি সাধারণ মানুষ আমাদের কথা শুনতে না চায়। জন-বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় আমরা পিছিয়ে যাই। তার মানে হল, প্রয়োজনীয় এই সমস্ত কথাগুলো আমাদের বামপন্থীদের তরফে প্রায় কখনই আর বলা হয়ে ওঠে না। ধর্মীয় মৌলবাদীদের বড় সুবিধা হচ্ছে এই জায়গাটায়। তারা সব সময়েই তাদের কথাগুলো বলতে পারে এবং বলে যেতে থাকে—কখনও ফিসফিস করে, আবার কখনও উঁচু গলায়।

আর একটা কথাও বোধ হয় ভারতের বামপন্থী ও মার্ক্সবাদীরা অনেকেই ভেবে দেখেননি। ইউরোপের কমিউনিস্ট আন্দোলন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বা গণচেতনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুবিধা পেয়েছিল রেনেশাঁস আন্দোলনের ফসল থেকে। ফরাসি বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া থেকে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তার শ্রেণিগত অনেক দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিন বা চারশ বছর ধরে জনসাধারণের মধ্যে ইতিহাসবোধ বা যুক্তিবাদী বিচারধারা গড়ে তোলার বেশ কিছু কাজ করে ফেলেছিল। বিজ্ঞানের বিকাশও সেখানে হয়েছে নানা রকম ধর্মীয় শক্তি সংগঠন ও বিশ্বাসের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করতে করতে। একদিকে কোপার্নিকাস, সার্ভেতো, ব্রুনো, গ্যালিলেও, প্রমুখর হাত ধরে নিউটন পর্যন্ত এসে বিজ্ঞানের তত্ত্বগত বিকাশ ও আরও এগিয়ে প্রযুক্তিগত প্রয়োগ, শিল্প বিপ্লব; অপর দিকে শিক্ষার বিস্তার, গণ মুদ্রণ ও বইপত্রের সংখ্যাবৃদ্ধি, গ্রাম ও শহরের বিচ্ছিন্নতার অবসান—ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের ক্রমবর্ধমান ধাক্কা খেতে খেতে সামন্তযুগীয় প্রাচীনপন্থী ধর্মীয় মনন ধীরে ধীরে বৃহত্তর জন-মানসে তার শক্তি অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। তার দরুন কমিউনিস্ট আন্দোলন সেখানে তার কাজ শুরু করতে পেরেছিল বেশ কয়েক কদম এগিয়ে থেকে।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই সুবিধাটা পাওয়ার উপায় নেই। ভারতীয় বুর্জোয়াদের কিছু ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলে এখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন তথা রেনেশাঁস আন্দোলন যতটুকু হয়েছে তা দেশের দু তিনটে মাত্র পকেটে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। তার উত্তাপ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কম-বেশি গেলেও তার আলো প্রায় কোথাওই খুব একটা যায়নি। আবার ইউরোপের তুলনায় এই দেশের রেনেশাঁস ছিল নানা দিক থেকে খুবই দুর্বল, জমি এবং জমিদারির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে চলার কারণে সামন্ততান্ত্রিক কু-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বহু কথাই সে খুব জোর গলায় বলতে পারেনি। যেটুকু বলতে শুরু করেছিল, তাকেও খুব তাড়াতাড়ি রক্ষণশীলরা নানা মাত্রায় বিরোধিতা করে অথবা প্রাচীন সংস্কারের খাদ মিশিয়ে অনেকখানি পানসে করে দেয়।

ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রামেরও একই সমস্যা। সেখানেও বুর্জোয়াদের সেই অংশটাই নেতৃত্ব দিয়েছে যারা ছিল মূলত রক্ষণশীল, সমস্ত প্রগতিশীল ধ্যান ধারণা মূল্যবোধের স্বাঙ্গীকরণে অপারগ, বা অনিচ্ছুক। ফলে, এখানে কমিউনিস্টদের সংস্কৃতি কর্মীদের এবং তাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মকর্তাদের এমন অনেক বিষয় উত্থাপনের দায় ছিল যা আসলে অপূরিত বুর্জোয়া বিপ্লবেরই সার কথা। এ কাজগুলি তাঁরাও শেষ অবধি সাহস করে না করায়—এমনকি করতে যে হবে তাও না বোঝায় (কেউ কেউ উলটে রেনেশাঁসের অর্জিত সামান্য ফসলটুকুকেও আত্মস্থ করার বদলে তাকে অস্বীকার করার এক মেকি-বিপ্লবীয়ানায় ফেঁসে যাওয়ার ফলে)—সমাজ জীবনে একটা বড় ফাঁক থেকে গেছে, যা সহজেই বর্তমান কালের প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের বস্তাপচা আদিম ও মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা দিয়ে ভরাট করে দেবার সুযোগ পেয়ে গেছে। সেই পাপেরও মূল্য আজ আমাদের কড়ায়-গণ্ডায় চুকাতে হচ্ছে।

২০১৪ সালে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় সরকারে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়া, এবং, বিশেষ করে, আরএসএস পরিবারের গুড-বয়, গুজরাতের শতাব্দকালের ভয়াবহতম মুসলিম নিধন যজ্ঞে হাত পাকানো, নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসার কাছাকাছি সময় থেকে এই সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা আমাদের দেশের বুকে নতুন করে তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। [Bhattacharya 2014] এটাও লক্ষণীয়, যখন যেখানেই নির্বাচনের ঢাক বেজে উঠেছে, সেখানেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিজেপি-র লোকেরা দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছে। লোকসভা এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভার নির্বাচনের প্রাক্কালে ওরা মেরাত মোরাদাবাদ ইত্যাদি জায়গায় মুসলিম বসতির উপরে বেশ ভালো রকম হামলা চালিয়েছে। দিল্লিতে যখন বিধানসভা ভোট আসন্ন, সেখানেও ওরা একবার দাঙ্গা বাধিয়ে বসেছিল।

পশ্চিম বাংলায় বিগত বিধানসভার ভোটের প্রাক্কালেও ওরাও বাজারে নেমে পড়েছিল এবং নানা রকম পরিকল্পনা করেই এগোচ্ছিল, যাতে পুরোদস্তুর দাঙ্গা-হাঙ্গামা যদি নাও লাগানো যায়, অন্তত ভোটদাতাদের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দ্রুত ঘটতে থাকে ও উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডকে কেন্দ্র করে সেই সময় ওরা কীভাবে ঘুঁটি সাজিয়ে এগিয়েছিল, এন-আই-এ-কে দিয়ে কীভাবে একটা জবরদস্ত মুসলিম জঙ্গি চক্রের অস্তিত্ব-কাহিনি তৈরি করে ফেলেছিল, যার মধ্যে এই অপপ্রয়াসের সমস্ত লক্ষণই বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল, এতদিনে সকলেই জেনে গেছেন! [Mirsab 2014; Shahi 2014]

নরেন্দ্র মোদীর সরকার কিছুদিন বিকাশ টিকাশের কথা বলে নিজেদের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী পরিচিতিকে সরিয়ে রেখে একটা শক্ত সমর্থ কাজের দল হিসাবে আসতে চাইলেও, একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে নিতে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ঠুনকো জনপ্রিয়তা দ্রুত হারাতে থাকার ফলে অচিরেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের চাপে বিজেপি আবার তার স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছে। গরু এবং গোমাংস নিয়ে দেশ জুড়ে একটা হইচই বাধিয়ে তুলে যত্রতত্র গোমাংসের খোঁজে এবং গন্ধে নিরীহ মুসলিম জনসাধারণের উপর হামলা চালাতে শুরু করে দেয়। একই সঙ্গে চলতে থাকে দলিত সম্প্রদায়ের উপরেও হামলার সিরিয়াল। যেহেতু হিন্দু হিসাবে ধরলে, তারাই সংখ্যায় বিপুল বৃহত্তর অংশ, এক্ষেত্রেও লক্ষ্য হল, ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন ধরিয়ে তাদেরকে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য ও বিজেপি-আরএসএস মার্কা হিন্দুত্বকে মেনে নিতে বাধ্য করা। আর এই প্রক্রিয়ায় দেশের বুকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে জ্বালিয়ে রাখা।

[৩] ভ্রম নিরসন

প্রথমে আমি এখানে কিছু সাধারণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। অনেকেই মনে করেন, আমরা বামপন্থীরা, মার্ক্সবাদীরা, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের পক্ষের মানুষেরা ভারতে শুধুমাত্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই সোচ্চার; মুসলিম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা নাকি কখনই মুখ খুলি না। সমালোচনা করি না। কথাটা সঙ্ঘ পরিবারের তরফে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা প্রচার এবং সাধারণে প্রচলিত একটি আগাপাশতলা ভুল ধারণা। এই মিথ্যা এবং ভুল চিনবার জন্য বিপরীত দিক থেকে একজন মুসলিম মৌলবাদীর সঙ্গে কথা বলে দেখুন। সাড়ে তিন সেকেন্ডের মধ্যেই টের পেয়ে যাবেন, বামপন্থী, মার্ক্সবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদীদের চেয়ে বড় শত্রু তাদের কাছেও আর কেউ নেই। তারাও বরং হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদেরই অনেক বেশি আপনজন বলে মনে করে। বন্ধুভাবে দেখে।

কেন?

দুটো অনিবার্য কারণে।

এক, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী জঙ্গিপনা দেখানোর তালি বাজানোর ক্ষেত্রেও এক হাতে কাজ হয় না। দুই হাত লাগে। সেখানে এরা একে অপরের তালির কারণ এবং কার্য হিসাবে কাজ করতে পারে। এ ওকে দেখায়, ও একে দেখায়। দু পক্ষেরই দু পক্ষকে প্রয়োজন। এক পক্ষ আর এক পক্ষের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে। এই কথাটা দুনিয়া জুড়েই সত্য। যেখানে ইহুদি জঙ্গিপনা আছে, সেখানেই ইসলামিক জঙ্গিরাও আছে। হিটলারের খ্রিস্টীয় সন্ত্রাসই ইহুদি সন্ত্রাসীদের জন্ম দিয়ে গেছে। এ প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সর্বজনীন সত্য। অতএব ভারতেও শুধু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আছে, মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা নেই—একথা বলার বা মনে করার কোনো কারণই নেই। এটা বাস্তবে সম্ভবই নয়।

দুই, সমস্ত জঙ্গিবাদেরই একেবারে প্রথম প্রয়োজন যুক্তিবাদের বিনাশ। শ্রেণিচেতনার ধ্বংসসাধন। মানুষ যদি স্বাধীনভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে সমস্ত জিনিস বুঝতে চায়, সাধারণ মানুষ যদি তার শ্রেণিস্বার্থের কথা ভাবতে থাকে, ধর্মীয় মৌলবাদের পক্ষে তার চেয়ে সর্বনেশে কীটনাশক আর কিছু হয় না। তার সমস্ত জারিজুরি, সমস্ত জোর, মানুষকে বিভ্রান্ত করার সমস্ত কলকাঠি নিমেষে হাতছাড়া হয়ে যাবে। সুতরাং, আরএসএস যখন যুক্তিবাদকে ধ্বংস করে, শ্রেণিগত ঐক্যের বদলে ধর্মীয় ঐক্যের শ্লোগান দেয়, সে শুধু হিন্দুদেরই যুক্তিবোধ কেড়ে নেয় না, একই সঙ্গে মুসলিম আম জনতারও বিচারবুদ্ধিকে খতম করে দেয়। সে এটা চায় কিনা, ভেবেচিন্তে করে কিনা বড় কথা নয়। যা সে করে তার পরিণাম এটাই। পক্ষান্তরে, মুসলিম মৌলবাদীরাও যা করে তাতে সাড়া দিতে গিয়ে শুধু সাধারণ মুসলিম নয়, একই সঙ্গে হিন্দু জন সাধারণও যুক্তি হারিয়ে মনের ঝাল মেটাতে থাকে। এইভাবে দুই পক্ষই দুই পক্ষকে শক্তি ও ন্যায্যতা যোগাতে থাকে এবং পারে। দু পক্ষেরই টিকে থাকতে গেলে একে অপরকে প্রয়োজন।

এই কারণেই আমরা যখনই যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে বিচার করি, তাতে শুধু হিন্দুত্ববাদীদের নয়, মুসলিম জঙ্গিদেরও গায়ে ফোস্কা পড়ে। বিপরীতভাবে আপনি যদি মুসলিম মৌলবাদকে যুক্তিপূর্ণভাবে বিচার করতে চান, আরএসএস পন্থীরা তাতেও বাধা দেবে। তারাও চেষ্টা করবে আপনাকে যুক্তির বাইরে টেনে নিয়ে যেতে। কিছু বাজে কূটতর্কে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিতে চেষ্টা করবে।

এখানে একটা উদাহরণই সকলের চোখ খুলে দেবে। অনেকেই লক্ষ করেছেন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন যখন একাত্তরের ঘাতকদালালদের নির্মূল করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, এই দেশের বামপন্থী মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদীরা দু হাত তুলে বিপুল উৎসাহে তাকে সমর্থন জানিয়েছে, তার সাথে একাত্মতা জ্ঞাপন করেছে। সে তো ঘোষিতভাবেই ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান-ধারণার বিরুদ্ধে ভাষা-ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাকে লালনের সপক্ষে এক বিশাল ঊর্মিমালা। কিন্তু এই দেশে শুধু ইসলামি সংগঠনগুলি নয়, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলিও তার সপক্ষে একটি বাক্যও ব্যয় করেনি। কেন? কেন না তারাও বোঝে, বাংলাদেশের জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তার প্রকৃত অভিমুখ শেষ বিচারে তাদেরও বিরুদ্ধেই যাবে। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে ভাষার স্বাধিকারের দাবি, ধর্মের ভিত্তিতে নয় ভাষার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দাবি, যে তাদের “হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান”-এর বহু-উচ্চারিত একরেখ কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, এইটুকু বুদ্ধি তাদেরও আছে।

দু নম্বর কথা হচ্ছে, বিশ্ব-প্রেক্ষিতে ধরলে ইসলামি সন্ত্রাস যে একটা বিরাট সমস্যা—তা নিয়ে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই। বিশেষ করে মধ্য প্রাচ্যে, তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, ইত্যাদি নানা নামের যে সমস্ত সংগঠনগুলি কাজ করছে তারা মানবতার পক্ষে এক ভয়াবহ বিপদ। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সাপেক্ষেও, মুসলিম জনসংখ্যার বিপুলাধিক্যের কারণে ইসলামি সন্ত্রাসই সেসব দেশে মারাত্মক বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আবার হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের কোনো গুরুত্বই নেই। কিন্তু আমরা যখন ভারতের প্রেক্ষিতে আলোচনা করছি, তখন দেখতে হবে, এই মুহূর্তে ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক মঞ্চে বড় বিপদ কোত্থেকে আসছে? ইসলামি সন্ত্রাসই যদি দেশের সামনে বেশি শক্তি এবং মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হত, তাহলে তো এতদিনে যেখানে সে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সেই কাশ্মীর থেকেই ভারতের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসার কথা। বরং এখন পর্যন্ত তা যে ঘটেনি তাতেই বোঝা যায়, এই সন্ত্রাসের শক্তি এখনও বৃহত্তর বিপদ নয়।

কথাটা বোঝার জন্য আর একটা ছোট অথচ সহজদৃশ্য উদাহরণ দিচ্ছি। আগের ছয় বছরের অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি শাসন ভারতের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় কতগুলি মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেছে। জ্যোতিষ বাস্তুশাস্ত্র পৌরোহিত্য ইত্যাদি আদিম যুগীয় বর্জিত-বিদ্যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন তালিকায় তুলে দিয়ে গেছে। এবারকার দফায় তার তিন বছরের রাজত্বে সে মোদীর দক্ষ পরিচালনায় ইতিমধ্যে আরও বেশ কিছু বড় আকারের পরিবর্তন এনে ফেলেছে। প্রথমে উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী করে বসল এমন একজনকে যিনি বিদ্যালয়ের গণ্ডি কোনক্রমে পার করেছেন। স্মৃতি ইরানী—যার একমাত্র যোগ্যতা হল তিনি সঙ্ঘ পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য। তিনি আবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদে একের পর এক অযোগ্য লোকদের বসিয়ে দিয়েছেন সেই একই মাপকাঠিতে—শুধু মাত্র সঙ্ঘ পরিবারের কাছে আনুগত্যের কারণে ও প্রয়োজনে। পুনা জেএনইউ হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে স্রেফ দলীয় হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ জোর করে চাপাতে গিয়ে তারা এই সব জায়গায় আগুন জ্বালিয়েছে। হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলিত মেধাবী গবেষক ছাত্রকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে এরা। পুনার ফিল্ম ইন্সটিটিউতের মাথায় বসিয়েছে একজন তৃতীয় স্তরের সিনেমা কর্মীকে। তার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ দমন করতে না পেরে পুলিশি সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে তাদের উপর। জেএনইউ-তে কয়েকজন ছাত্রকে ফেক ভিডিও তৈরি করে মিথ্যা দেশদ্রোহের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়েছে। তাতেও সফল না হওয়ায় সেখানকার একজন ছাত্রকে গায়েব করে দিয়েছে।

এবার ভেবে দেখুন, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে যতই এ-কে ৪৭ ল্যান্ড মাইন আরডিএক্স ইত্যাদি থাকুক, তাদের পক্ষে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে এবং/অথবা প্রশাসনিক কাঠামোয় এরকম একটা ছোট নুড়িও কি যোগবিয়োগের বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষমতা আছে? কাউকে বসানোর কাউকে হঠানোর ক্ষমতা আছে? একটা আঁচড়ও কি কাটার কোনো ক্ষমতা আছে? ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান বা গণিত শিক্ষার পাঠক্রমে? গত ৭০ বছরে তারা কিছু করতে পারেনি; বিজেপি যা করে চলেছে, আগামী একশ বছরেও এরকম বড় মাত্রার ক্ষতি করার মতো জায়গায় তারা যেতে পারবে বলে মনে হয় না।

ফলে, এই বড় বিপদের বিরুদ্ধেই আমাদের সরব হতে হচ্ছে। যারা দেশের, দেশের শিক্ষা সংস্কৃতির অনেক বেশি—বলা ভালো আসল এবং কার্যকর—ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে চলেছে এবং আরও ভয়ানক সর্বনাশ করতে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আমাদের সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের সংজ্ঞা ও আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারেও দু-চার কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক উপাদান হিসাবে দুটো কাছাকাছি হলেও ঠিক এক জিনিস নয়, কিন্তু গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং তাদের মধ্যে একটা গসাগু উপাদান হিসাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবীরূপে বিদ্যমান। আবার, ধর্মের সাথে এদের কিংবা এদের মধ্যে পারস্পরিকভাবে যে সম্পর্ক তাকে কোনোভাবেই ঠিক কারণ-কার্য সম্বন্ধরূপে অবধারণ করা সঠিক বিচার হবে না। অর্থাৎ, ধর্ম থাকলেই তার থেকে অনিবার্যভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদ আসবে, কিংবা কেউ সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা নিয়ে চলে মানেই সে মৌলবাদী, এমনটা সব সময় নাও হতে পারে। যদিও মৌলবাদী মানেই তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা পুরোদস্তুর বর্তমান। এই সব বহু-বর্ণ সম্পর্কগুলি সমাজ-মনস্তত্ত্ব হিসাবেও যেমন সত্য, আবার ব্যক্তিমানসের বিচারেও এই সব কথা মনে রাখতে হয়। তা না হলে বিচারে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যেমন, মধ্য যুগের ভারতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন, পাশাপাশি বাস করেছেন, নিজের নিজের আচার বিশ্বাস পালন করে গেছেন। তাদের মধ্যে অনেক সময়ই ঝগড়াঝাঁটি মারপিট খুনোখুনি হয়েছে, কিন্তু তা কখনই সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হয়নি। মেরুকরণ হয়ে যায়নি। অথবা, ঝগড়াঝাঁটির ছবিটাই সাধারণ সার্বক্ষণিক চলমান ছবি ছিল না। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘটনাই ছিল প্রধান ও প্রলম্বিত বৈশিষ্ট্য (পরে আমরা এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসব)। আবার, পরাধীন ভারতে মুসলিম লিগ একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আবির্ভূত হলেও সেটা মৌলবাদী ছিল না। হলে আর জামায়াতে-ইসলাম জাতীয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের দরকার হত না। পক্ষান্তরে, আরএসএস প্রথম থেকেই অনেক বেশি মৌলবাদী, এবং সেই কারণেই বা তার অন্যতম আধারের সন্ধানেই সে সাম্প্রদায়িক।

ধর্মীয় বিশ্বাস আচার ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একটা গোষ্ঠী যখন নিজেদের একটা বৃহত্তর (কাল্পনিক) ধর্মীয় স্বার্থবোধের দ্বারা তাড়িত ও চালিত হয়, সমাজ ও জীবনের অন্য সমস্ত স্বার্থবোধকে তার কাছে বিলুপ্ত বা গৌণ করে ফেলে, এবং এক (বা একাধিক) ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তার সেই স্বার্থ চরিতার্থতার পথে বাধা বা প্রতিবন্ধক বলে ভাবতে থাকে, তখন সেই গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে পড়ে। একাধিক ধর্মসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এবং চিহ্নিতকরণ সাম্প্রদায়িকতার এক অন্যতম প্রধান শর্ত। সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তার প্রধান লক্ষণ এবং অবলম্বন। এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে কখনও কখনও দাঙ্গার মাধ্যমে, অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, নৃশংস রক্তপাতে।

কিন্তু, মৌলবাদ তো শুধু এইটুকু নয়। সে প্রথমে তার নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই শত্রু চিহ্নিত করে ফেলে। তারপর এবং তার ভিত্তিতে সে অন্যত্রও শত্রু খোঁজে। কেন না, শত্রু বেশি হলে তার সুবিধা হয়। তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম যে বিশ্বাস প্রথা প্রকরণ আচার আচরণকে তারই সম্প্রদায়ের মানুষ ইতিহাসের লম্বা সরণিতে জীবনের স্বাভাবিক উজানে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে, সেইগুলিকে আবার ভাঁটিতে ফিরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তুলে আনা, অন্তত আনার কথা বলা, তার ভিত্তিতে আধুনিক জীবনচর্যাকে সর্বপ্রযত্নে বিরোধিতা করা। ফলে তার প্রথম এবং প্রধান শত্রু অন্য কোনো সম্প্রদায় নয়, তারই সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদী সমাজপরিবর্তনকামী ইতিহাস-বিশ্বাসী মানুষ। তারপর তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম বর্জিত উপাদানসমূহকে মানজাতির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক অর্জন হিসাবে দেখানো এবং প্রচার করা। সেই প্রয়োজনে তাকে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়কেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তুলতে হয়। এই অর্থে মৌলবাদী শক্তি একটা সমাজের পক্ষে আরও বড় বিপদ ডেকে আনে। তার শুধু সাময়িক ভিত্তিতে এলাকা ধরে ধরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করলে হয় না, এক সার্বক্ষণিক সাঙ্ঘর্ষিক জঙ্গি উত্তেজনাকে জাগিয়ে রাখতে হয় তাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের তিন টুকরোকে বিগত শতাব্দের ইতিহাসের দীর্ঘ মেয়াদে ভালো করে লক্ষ করলে এই সমস্ত উপলব্ধিগুলোকে মিলিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন শক্তিগুলিকে চিনতে পারা হয়ত একটু সহজ হবে।

[৪] হিন্দু মৌলবাদের জন্ম ও পুষ্টি

আমি এবার সরাসরি ভারতের সমস্যার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সঙ্ঘ পরিবারের যে মৌলবাদ তার জন্ম হল কীভাবে? সে তো আকাশ থেকে পড়েনি। এই দেশেরই সংস্কৃতির জল মাটি হাওয়ায় সে শ্বাস গ্রহণ করেছে, পরিপুষ্ট হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ লগ্নে, যখন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্ব দেশের বুকে প্রায় অবিসংবাদী রূপে প্রতিষ্ঠিত, অত্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কংগ্রেস যখন খুবই শক্তিশালী জনপ্রিয় সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, সেই সময়ে, উত্তাল জাতীয়তাবাদের লগ্নে, ১৯২৫ সালে, এরকম একটি উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী এবং দেশ ও জাতীয়তা বিরোধী সংগঠনের উৎপত্তি সম্ভব হল কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। এর সুষ্ঠু মীমাংসা এখনও হয়নি।

সকলেই জানেন, সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শের মূল উপাদান দুটো। এক, প্রাচীন ভারতের সব কিছুই জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দুই, এই উপাদানগুলো সমস্তই নষ্ট হয়েছে মূলত মুসলমান রাজত্বের কালে। যা কিছু ওরা বলে, যত ফেনিয়েই বলে, যত খারাপভাবেই বলে, তার সবই হচ্ছে এই দুটো মৌল উপচারের ভাব সম্প্রসারণ। এর বাইরে আর অন্য কোনো কথা ওদের সিলেবাসে নেই।

কিন্তু এই উপচারগুলি ওরা কোথায় পেল? সঙ্ঘ পরিবারের তিন আদি গুরু—হেডগেবার, গোলওয়ালকর, সাভারকর—তাঁরাই কি এগুলোর আবিষ্কারক এবং প্রথম প্রবক্তা?

না। আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আরএসএস প্রতিষ্ঠার অন্তত ছয় দশক আগে থেকেই এই চিন্তাগুলি ভারতীয় শিক্ষিত মননে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মূলত শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রমুখর লেখনী ও বাণীতে।

তাঁদের মাথাতেই বা এ জাতীয় চিন্তাভাবনা এল কোত্থেকে?

ইংরেজ শাসনের সূত্র ধরে। দুই বিভিন্ন পথে। এক বিচিত্র গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়ায়। সেই জায়গাটা আমাদের প্রথমে বুঝে নিতে হবে। ভারত ইতিহাসের এ এক নির্মম রসিকতা।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ প্রশাসকদের তরফে ভারতীয় সমাজ জীবন সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কে যে ঔপনিবেশিক তাচ্ছিল্য ঘৃণা অবজ্ঞার মনোভাব ব্যক্ত হত তার প্রতিক্রিয়ায় উনিশ শতকের একদল উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় নিজেদের সম্পর্কে এক কাল্পনিক উচ্চশিখর প্রাচীন সভ্যতার জয়গানে মুখরিত হয়ে ওঠেন। বঙ্কিম চন্দ্রের “মা যা ছিলেন, . . .”, বিবেকানন্দের “হে ভারত ভুলিও না, . . .”, ইত্যাদি এই কল্পস্বর্গেরই উচ্চকিত আলাপন। এর থেকেই শুরু হয় বৈদিক জনজাতির লোকেদের সম্পর্কে এক আর্য-গরিমা কীর্তন। ঋগ-বেদ হয়ে ওঠে সর্বজ্ঞান সংগ্রহ এবং সর্বোচ্চ জ্ঞানের এক দৈব অপৌরুষেয় আকর। গঙ্গা-সিন্ধু অববাহিকার নিবিড় অরণ্য হয়ে ওঠে কোনো এক মনোরম তপোবন (প্রায় এখনকার অভয়ারণ্যের মতো)। সেকালের সমস্ত মানুষের জীবনে ফুটে উঠতে থাকে গণিতের ‘চার’ নামক সংখ্যাটির বিচিত্র রহস্যময় ক্রীড়াশীলতা—চতুর্বেদ, চতুর্বর্ণ, চতুরাশ্রম, চতুর্বর্গ, চতুর্যুগ, চতুর্মুখ, চতুরানন, ইত্যাদি। ধীরে ধীরে প্রাচীন ভারতে আধুনিক গণতন্ত্রের পার্লামেন্ট জাতীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিরও সাক্ষাত মেলে। তারপর ইউরোপ/আমেরিকায় যেমন যেমন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হতে থাকে, সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই সব কিছুই প্রায় খুঁজে পাওয়া যেতে থাকে বেদে, পুরাণে, উপনিষদে, তন্ত্রশাস্ত্রে, সাঙ্খ্য-বেদান্তে। সেই তালাশ আজও শেষ হয়নি।

এই মিথ্যা গর্বের অনুসন্ধান অনিবার্যভাবে একই সঙ্গে এক চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক মানসের জন্ম দেয়। যুক্তি ও তথ্যের বদলে বিশ্বাস এবং সংস্কারকেই জ্ঞান অর্জনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলে। কী জানা গেল সেটা নয়, কী জানলে সুবিধা হবে—তার ভিত্তিতে জ্ঞানচর্চা করার মন তৈরি করে দেয়। খোঁজার-আগেই-খুঁজে-পাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে গবেষণা।

এই অন্ধতার প্রভাবেই, ব্রিটিশদের প্রচারিত আর একটি মিথ্যাকে তাঁরা বিনা বিচারে সত্য বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যান। সিপাহি বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা শিক্ষা বিষয়ক সমস্যাগুলিকে গতানুগতিকভাবে দেখছিল। কিছুটা লেখাপড়া শিখিয়ে কাজ চালানো গোছের কিছু কেরানি তৈরি করার জন্য তারা এখানে ওখানে দু-দশটা স্কুল খুলছিল, তারপরে একটা-দুটো করে কলেজও খুলেছিল, এইভাবে চলছিল। ১৮৫৭ সালে প্রায় আধা-ভারত জোড়া সিপাহি বিদ্রোহ এবং তার সমর্থনে সীমিত আকারে হলেও এক ধরনের গণ অভ্যুত্থান তাদের আত্মবিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দেয়। তারা বুঝে যায়, শুধু সেপাই বরকন্দাজ দিয়ে ধমক-ধামক দিয়ে হয়ত আর বেশিদিন এই দেশে নির্বিঘ্নে ব্যবসাবাণিজ্য লুটপাট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে এই সময় থেকেই তাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে ভারতের জনমানসে একটা স্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দেওয়া, যা তাদের জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে দেবে না। বা অন্তত জাতি গঠনের প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও বিলম্বিত করবে।

১৮৮০-র দশকে কয়েকজন ব্রিটিশ ইতিহাস লেখক ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুযুগ, মুসলিম যুগ ও আধুনিক যুগ—এইভাবে ভাগ করে ফেলেন। তারপর তাঁরা হিন্দুযুগকে খুব শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতির বিকাশের কাল হিসাবে চিত্রিত করেন। আর মুসলমান যুগকে দেখান হিন্দুদের উপরে নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের এক লম্বা সিরিয়াল হিসাবে। তখন ধরে ধরে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, হিন্দুদের দেবদেবীর মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। [Grewal 1970; Hodiwala 1939; মুখোপাধ্যায় ২০০৪] এই কথাগুলিকে এ দেশের তদানীন্তন বুদ্ধিজীবীরা প্রায় বিনা বিচারে বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাঁদের একবারও মনে হয়নি, এই রকম প্রচারের পেছনে ব্রিটিশ শাসকদের কোনো দুরভিসন্ধিমূলক স্বার্থ থাকতে পারে। তাঁরাও এই কথাগুলিকে তথ্য দিয়ে যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেননি। আসলে এই বিচারশীল মনটাই তখন তাঁদের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রথম দিকের জাতীয়তাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ভারতের জনমানসে জাতীয় আবেগ দেশপ্রেম ইত্যাদি জাগিয়ে তোলার জন্য ব্রিটিশদের পরিবেশন করা ইতিহাস থেকে যে বীর-মূর্তি (hero-icon)–গুলি বেছে নিলেন তা হল রাণা প্রতাপ, ছত্রপতি শিবাজি, প্রমুখ। রাণা প্রতাপের লড়াই ছিল আকবর-এর সঙ্গে; শিবাজির ছিল অওরেঙজেব-এর সঙ্গে। ফলে জাতীয়তাবাদের আগমন-ধ্বনি রচিতই হল তথাকথিত এক নিরন্তর হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের কলরব দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের কথা বললেও শাসকের ধমকে দ্বিতীয় সংস্করণেই বইটিকে আমূল বদলে ফেলে মুসলিম শাসকদের শত্রুস্থানে বসিয়ে দিলেন, ইংরেজদের দেখালেন হিন্দুর রক্ষাকর্তা হিসাবে। দেশ হয়ে গেল দেশমাতা, রূপকে মা দুর্গা। দেশকে ভালবাসার জন্য প্রথম যে সঙ্গীত (“বন্দে মাতরম”!) রচিত হল তা কোনো মুক্তি সংগ্রামের অভিযাত্রিক গীত হল না; তা হয়ে গেল দেশভক্তিগীতি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই শব্দবন্ধের নিষ্পন্ন কর্মধারয় সমাসে মধ্যপদটি কোনোদিনই আর লোপ পেল না। আজও হিন্দি ভাষায় দেশাত্মবোধক গানকে বলা হয় দেশভক্তিগীতি। স্কুল বসার প্রাক্কালে ছাত্রদের জাতীয় সঙ্গীত গাইবার নাম প্রার্থনা—প্রেয়ার। শপথ গহণ নয়। আজ অবধি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মহারাষ্ট্রের শিবাজি-উৎসব এক বিপুল গরিমা লাভ করে; রমেশ চন্দ্র দত্তের উপন্যাসে, দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকেও রাজস্থানের রাজপুতদের এক মিথ্যা অবিচল দেশপ্রেম-কাহিনি রোমান্টিক কল্পবিলাসে দেশবাসীকে মগ্ন করে দেয়।

ইতিহাস-চেতনা ও সাংস্কৃতিক-বোধবুদ্ধির এই রকম ভ্রান্ত উপাদানগুলিই ভারতের এক বিরাট অংশের মানুষের মনে ধীরে ধীরে সঙ্ঘ-পরিবারের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিভূমি রচনা করতে থাকে। তাই আমি মনে করি, ওদের গাল দেবার আগে, সমালোচনা করার আগে আমাদের এই দুর্বল ইতিহাসবোধ, এই মিথ্যা দেশপ্রেম-সন্ধানকে চিনে নিতে হবে।

এরপর চলে আসতে হবে আমাদের রাজনৈতিক বোধভূমিতে।

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পৃষ্ঠভূমি রচনা করেছিল বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না। সেই উপলব্ধি জাতীয় আন্দোলনকে প্রথম থেকেই এক খর্বিত চেতনায় প্লাবিত করে ফেলল। ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম সেই চেতনার আপ্লবে স্বাধীনতার যোদ্ধাদের অচেতনেই হয়ে পড়ল হিন্দুদের অভ্যুত্থান কার্যক্রম। যে সমস্ত ছোট ছোট বিপ্লবী গোষ্ঠী গড়ে উঠল বঙ্কিমী আনন্দমঠের সন্তানদের আদলে, কালী মন্দিরে রক্তশপথ নিয়ে যাদের সংগ্রামে যোগদান শুরু হয়, গীতা হয়ে গেল তাঁদের প্রেরণা-উৎস। বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলেন শিবাজি উৎসব আর গণেশ পুজোর মাধ্যমে। এইভাবে সেদিন ভারতীয় রাজনীতি তার প্রাইমারি শিক্ষার স্তর পার করে মাধ্যমিক স্তরে এসে উপনীত হল। তার আষ্ঠেপৃষ্ঠে হিন্দুচেতনা; তার আগাগোড়া হিন্দুধর্মীয় পলেস্তারা। সে চায় এক অখণ্ড ভারতীয় জাতি; তার ভিত্তিতে সে রেখেছে শুধুই হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গ।

এর আর এক পরিণতি হল, হিন্দু ধর্মের বাধ্যতামূলক অঙ্গ জাতিভেদ প্রথা এই জাতীয় ঐক্যের দুর্বল প্রয়াসের মধ্যে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই জায়গা পেয়ে গেল। তথাকথিত উচ্চবর্ণের আধিপত্য যতটা বাস্তবে, তার চেয়ে অনেক বেশি আশঙ্কায়, এই আন্দোলনের শক্তিকে গ্রাস করে নিল, একে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে লাগল। স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু হিন্দু্ধর্মাবলম্বীদের নয়, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রায় সোচ্চার চারণভূমি হয়ে উঠল। স্বয়ং তিলকের নেতৃত্বে এবং নির্দেশেই একটা সময় থেকে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে রাজনৈতিক সম্মেলনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কার সম্মেলন মঞ্চটি বন্ধ করে দেওয়া হল। তখনও কিন্তু আরএসএস নামক উপদ্রব এসে পৌঁছয়নি ভারতের রাজনীতির সক্রিয় রঙ্গমঞ্চে।
তার কিছুদিন পরই রাজনীতির ময়দানে আবির্ভাব ঘটল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর।
//ক্রমশ//



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন