Ashoke Mukhopadhyay RSS feed

Ashoke Mukhopadhyayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সাম্মানিক
    বেশ কিছুদিন এই :লেখালিখি'র কচকচানিতে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়নি বলতে ইচ্ছে ছিল ষোল'র জায়গায় আঠারো আনা, এমনকি, যখন আমাদের জুমলাবাবু 'কচি' হতে হতে তেল-পয়সা সবাইকেই ডুগডুগি বাজিয়ে বুলেট ট্রেনে ওঠাচ্ছেন তখনও আমি 'ঝালিয়ে নেওয়া'র সুযোগকে কাঁচকলা ...
  • তোত্তো-চান - তেৎসুকো কুররোয়ানাগি
    তোত্তো-চানের নামের অর্থ ছোট্ট খুকু। তোত্তো-চানের অত্যাচারে তাকে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছে। যদিও সেই সম্পর্কে তোত্তো-চানের বিন্দু মাত্র ধারনা নেই। মায়ের সঙ্গে নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য সে চলছে। নানা বিষয়ে নানা প্রশ্ন, নানান আগ্রহ তার। স্টেশনের টিকেট ...
  • চলো এগিয়ে চলি
    #চলো এগিয়ে চলি#সুমন গাঙ্গুলী ভট্টাচার্য প্রথম ভাগের উৎসব শেষ। এরপরে দীপাবলি। আলোর উৎসব।তার সাথে শব্দবাজি। আমরা যারা লিভিং উইথ অটিজমতাদের ক্ষেত্রে সব সময় এই উৎসব সুখের নাও হতে পারে। অটিস্টিক মানুষের ক্ষেত্রে অনেক সময় আওয়াজ,চিৎকার, কর্কশ শব্দশারীরিক ...
  • সিনেমা দেখার টাটকা অভিজ্ঞতা - মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি
    চট করে আজকাল সিনেমা দেখতে যাই না। বাংলা সিনেমা তো নয়ই। যদিও, টেলিভিশনের কল্যাণে আপটুডেট থাকা হয়ে যায়।এইভাবেই জানা যায়, এক ধাঁচের সমান্তরাল বাংলা ছবির হয়ে ওঠার গল্প। মধ্যমেধার এই রমরমার বাজারে, সিনেমার দুনিয়া আলাদা হবে, এমন দুরাশার কারণ দেখিনা। কিন্তু, এই ...
  • কিংবদন্তীর প্রস্থান স্মরণে...
    প্রথমে ফিতার ক্যাসেট দিয়ে শুরু তারপর সম্ভবত টিভিতে দুই একটা গান শোনা তারপর আস্তে আস্তে সিডিতে, মেমরি কার্ডে সমস্ত গান নিয়ে চলা। এলআরবি বা আইয়ুব বাচ্চু দিনের পর দিন মুগ্ধ করে গেছে আমাদের।তখনকার সময় মুরুব্বিদের খুব অপছন্দ ছিল বাচ্চুকে। কী গান গায় এগুলা বলে ...
  • অনন্ত দশমী
    "After the torchlight red on sweaty facesAfter the frosty silence in the gardens..After the agony in stony placesThe shouting and the crying...Prison and palace and reverberationOf thunder of spring over distant mountains...He who was living is now deadWe ...
  • ঘরে ফেরা
    [এ গল্পটি কয়েক বছর আগে ‘কলকাতা আকাশবাণী’-র ‘অন্বেষা’ অনুষ্ঠানে দুই পর্বে সম্প্রচারিত হয়েছিল, পরে ছাপাও হয় ‘নেহাই’ পত্রিকাতে । তবে, আমার অন্তর্জাল-বন্ধুরা সম্ভবত এটির কথা জানেন না ।] …………আঃ, বড্ড খাটুনি গেছে আজ । বাড়ি ফিরে বিছানায় ঝাঁপ দেবার আগে একমুঠো ...
  • নবদুর্গা
    গতকাল ফেসবুকে এই লেখাটা লিখেছিলাম বেশ বিরক্ত হয়েই। এখানে অবিকৃত ভাবেই দিলাম। শুধু ফেসবুকেই একজন একটা জিনিস শুধরে দিয়েছিলেন, দশ মহাবিদ্যার অষ্টম জনের নাম আমি বগলামুখী লিখেছিলাম, ওখানেই একজন লিখলেন সেইটা সম্ভবত বগলা হবে। ------------- ধর্মবিশ্বাসী মানুষে ...
  • চলো এগিয়ে চলি
    #চলো এগিয়ে চলি #সুমন গাঙ্গুলী ভট্টাচার্যমন ভালো রাখতে কবিতা পড়ুন,গান শুনুন,নিজে বাগান করুন আমরা সবাই শুনে থাকি তাই না।কিন্তু আমরা যারা স্পেশাল মা তাঁদেরবোধহয় না থাকে মনখারাপ ভাবার সময় না তার থেকে মুক্তি। আমরা, স্পেশাল বাচ্চার মা তাঁদের জীবন টা একটু ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    দক্ষিণের কড়চা▶️অন্তরীক্ষে এই ঊষাকালে অতসী পুষ্পদলের রঙ ফুটি ফুটি করিতেছে। অংশুসকল ঘুমঘোরে স্থিত মেঘমালায় মাখামাখি হইয়া প্রভাতের জন্মমুহূর্তে বিহ্বল শিশুর ন্যায় আধোমুখর। নদীতীরবর্তী কাশপুষ্পগুচ্ছে লবণপৃক্ত বাতাস রহিয়া রহিয়া জড়াইতে চাহে যেন, বালবিধবার ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

জিওরদানো ব্রুনো—সত্যনিষ্ঠার এক অনির্বাণ জাগপ্রদীপ # দুই

Ashoke Mukhopadhyay

[আগামি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বিজ্ঞান শহিদ জিওরদনো ব্রুনোর ৪১৭-তম মৃত্যু বার্ষিকী। এই উপলক্ষে আমি ব্রুনো সম্পর্কে আমার একটি লেখা এখানে সকলের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। যাঁরা ওই দিন বা ওই সময়ে ব্রুনো চর্চা করবেন, তাঁদের কাছে আনুষঙ্গিক এই সব তথ্য থাকা দরকার। যাঁরা এগুলো ইতিমধ্যেই জানেন, তাঁরা এটাকে স্বচ্ছন্দে অগ্রাহ্য করতে পারেন। এবার দ্বিতীয় কিস্তি]

[২] গুরু-প্রণাম

কোথায় যাবেন জিওরদানো? মন স্থির করতে সময় লেগেছিল কিনা আমরা কেউ জানি না। কিন্তু দেখা গেল, ব্রুনো প্রথমে চললেন পোল্যান্ডের দিকে, থর্ন শহরে।

কেন? হঠাৎ সেখানে কেন? কী আছে সেখানে? বা কে?

আছেন একজন। আছেন সেই মানুষটি, যাঁর বিখ্যাত সেই গ্রন্থ ব্রুনোকে দেশান্তরী করেছে। নিকোলাস কোপারনিকাস। সমস্ত কর্ম জীবন ইতালিতে কাটিয়েও এই মানুষটি ফিরে এসেছিলেন তাঁর স্বদেশে শেষ বারের মতো ভূমিশয্যা নিতে। তাঁরই সমাধিতে ব্রুনো এসেছেন দু মুঠো ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে।

খুঁজে খুঁজে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে সমাধিস্থল দেখে তাঁর চোখ কপালে উঠে গেল। বাঁধানো ফলকের গায়ে উৎকীর্ণ প্রার্থনা বাক্যটি এই রকম:

“হে ভগবান! তুমি সন্ত পলকে যে করুণা দান করেছ তা আমি আমার জন্য চাই না; পিটারকে যা দিয়েছ তাও আমার যাচঞা নয়। আমাকে তুমি শুধু সেইটুকুই করুণা দিও যা তুমি ক্রুশবিদ্ধ চোরকে দিয়ে থাক।” [উদ্ধৃত: White 1960, I, 124]

এই অপূর্ব বাণী পাঠ করে জিওরদানো ব্রুনোর ঘর ছাড়ার দুঃখ সেদিন অনেকটাই কেটে গিয়েছিল।[4]

[৩] দিন বদলের পালা

ব্রুনোর মানসলোক, তাঁর সংগ্রাম ও সাধনাকে বুঝতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে ইতিহাসের একটু পেছনের অধ্যায় থেকে। ইউরোপের অটল গম্ভীর সামন্তী সংসারে বিগত দু তিনশ বছর ধরেই সেদিন ফাটল ধরতে শুরু করেছে। কিছু কিছু নতুন জিনিস জানতে পেরে মানুষের মনে তখন বহু ব্যাপারেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। নবজাগরণের ঢেউ তখন ইতালি থেকে স্পেন পর্তুগাল হয়ে ইংল্যান্ড হল্যান্ড জার্মানি সুইডেন সুইজারল্যান্ড ফ্রান্সের বুকে আছড়ে পড়েছে। প্রাচীন কালে আমাদের দেশের লোক যেমন সসাগরা পৃথিবী বলতে বুঝত জম্বুদ্বীপ (আসলে উত্তর-পশ্চিম ভারত ও আফঘানিস্তান), তেমনি ইউরোপের লোকেরাও ইউরোপকেই পৃথিবীর সীমা বলে মনে করত। এমনকি খ্রিস্টধর্মের জন্মস্থান মধ্য প্রাচ্য সম্পর্কেও তাদের কোনো সঠিক ধারণা ছিল না।

সেই সীমানা তখন ভাঙতে শুরু করেছে।

১৪৯২ সালে ক্রিস্তফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬) বেরিয়ে পড়েছেন, ভারত খুঁজতে চলেছেন আমেরিকার দিকে। এক দশকের মধ্যেই তাঁর পেছন পেছন চললেন আমেরিগো ভেসপুচ্চি (১৪৫৪-১৫১২) দুই নতুন মহাদেশকে চিহ্নিত করতে। ১৫১৯ সালে বেরলেন ফারদিনান্দ ম্যাগেলান (১৪৮০-১৫২১) হঠাৎ বড় হতে থাকা প্রায় গোটা এই পৃথিবী একবার প্রদক্ষিণ করে দেখতে। এরকম আরও অসংখ্য ভৌগোলিক অভিযানের ফলে ভূগোলের এতদিনকার সংকীর্ণ ধারণায় চিড় ধরতে শুরু করল। সওদাগর বণিকরা তখন বাণিজ্য করতে, নতুন মালপত্র কিনতে, খাদ্যশস্য মশলা বা কাপড় বেচাকেনা করতে, সোনা রুপো হিরের খনি আবিষ্কার দখল ও লুট করতে, নতুন দেশ অধিকার করে উপনিবেশ বানাতে এবং দাস ব্যবসায় হাত পাকাতে দূর দূরান্তে পাড়ি দিতে চাইছে। সেই নতুন অভিজ্ঞতায় তারা দেখছে -- এই দুনিয়ায় নানা ধরনের মানুষ আছে। কত রকম তাদের চেহারা, কত রকম তাদের ভাষা, কত রকম খাদ্যাভ্যাস, কত রকম পোশাক-আশাক। আবার কত রকমই না সামাজিক আদব কায়দা আচার অনুষ্ঠান! ফলে গির্জার পাদ্রিদের কাছে দুনিয়ার সম্পর্কে যা শোনা যায়, বাইরের দুনিয়া তার থেকে অনেকটাই আলাদা। আসলে বেশিরভাগটাই অন্য রকম।

নতুন কথাও উঠতে শুরু করেছে। ত্রয়োদশ শতকে রজার বেকন (১২১৪-৯৪) এমন কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন, এমন কিছু কথা বলেছেন, যা ধর্মশাস্ত্রগুলিতে নেই। অসুখ-বিসুখ মহামারীর কারণ “শয়তানের কারসাজি” নয়, প্রাকৃতিক; এবং জীবনযাত্রায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে তা অনেকটা কাটানো যেতে পারে -- এরকম মতামত দেবার অপরাধে যাজকদের কোপে পড়ে তাঁকে শেষ জীবনের অনেকটা সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। আসলে ধর্মমতে শুধু ভগবান নয়, শয়তানের ক্ষমতাকেও কমিয়ে দেখা চলত না। বিজ্ঞান দর্শন ভাষা ব্যাকরণ তর্কশাস্ত্র -- জ্ঞান জগতের নানা শাখাতেই তিনি এমন কিছু কথা বলতে পেরেছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর সাতশ বছর পরেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং অবস্থান নিয়ে বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদদের মধ্যে মতান্তর ও বিতর্ক চলছে। মধ্যযুগীয় ইসলামি ধর্মনিস্পৃহ দার্শনিকদের চিন্তাগুলিকে তিনিই অনেকটা ধরে রেখে রেনেশাঁসের দরজার চৌকাঠের কাছে রেখে গিয়েছিলেন।

১৫৪৩ সালে কোপারনিকাসের সেই বিখ্যাত বইটির সঙ্গে আর একটাও যুগান্তকারী বই বেরল। লেখক বেলজিয়াম থেকে সুইজারল্যান্ডে আগত চিকিৎসক আন্দ্রেয়াস ভেসালিউস (১৫১৪-৬৪); বইটার নাম De Humani Corporis Fabrica, অর্থাৎ, The Structure of the Human Body (মানব শরীরের গঠন)। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটার কথা কম আলোচনা করা হয়। অথচ এই বইটির ভূমিকাও সেদিনকার মানুষের মনোভাবনা পাল্টানোর ক্ষেত্রে খুব কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। লেখককে এর জন্য বারবার নানা রকম হেনস্থা সহ্য করতে হয়েছে। আর তাঁর সেই মূল্যবান বইটিকে বহুকাল ধরে প্রায় নিঃশব্দ অবজ্ঞার অন্ধকারে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

ব্রুনোর একেবারে কাছাকাছি সময়েই আর একজন মানুষের সংগ্রামও প্রায় একই রকম দুঃসাহসিক এবং তার পরিণতিও মোটামুটি একই রকম করুণ। মিগুয়েল সারভেতো (১৫০৯-৫৩)। পেশায় -- না, এক কথায় বলার মতো নয় -- স্পেন-দেশীয় এই মানুষটি রেনেশাঁস যুগের এক মহান মানবতাবাদী, বহুবিদ্যায় ব্যুৎপন্ন, ধর্মতাত্ত্বিক, ভাষাবিদ, গণিতবিদ, চিকিৎসক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আবহবিদ, ভূগোলবিদ, মানচিত্র-নির্মাতা, আইনশাস্ত্রী, অনুবাদক, বাইবেল বিশেষজ্ঞ, এবং, এবং, . . . । তিনি ফুসফুসের মধ্য দিয়ে রক্তসংবহনের শারীরতাত্ত্বিক ঘটনা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু এত সব গুণ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর এক দোষ। তিনি খ্রিস্টধর্মকে তার নানা রকম সমকালীন কুসংস্কার ও গোঁড়ামি থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। যিশুকে তিনি মানবসন্তান হিসাবে গণ্য করতেন ও সেইভাবে প্রচার করতেন। সেই তিনি এক সময় দুটি খুব গর্হিত অপরাধ করে ফেললেন। প্রথমত, ১৫৩১ সালে তিনটি বই লিখে তিনি যিশু খ্রিস্ট সম্পর্কে তাঁর চার্চ বিরোধী মতামত প্রচার করেন। দ্বিতীয়ত, দু বছর বাদে তলেমির লেখা ভূগোল বইটির তিনি লাতিন থেকে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ ও সম্পাদনা করে ১৫৩৩ সালে প্রকাশ করেন। বাইবেলে বলা হয়েছে, যিশুর জন্মস্থান জুডিয়া একটি সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা “দুধ ও মধু উপচে পড়া” দেশ। কিন্তু তলেমির বইতে যা লেখা হয়েছে তাতে বোঝা যায়, ধারণাটা ঠিক নয়। মধ্য প্রাচ্যের এই সব অঞ্চল নেহাতই শুষ্ক ঊষরভূমি। সার্ভেতো বলতে চাইলেন, “দেখ, তোমরা তো তলেমিকে মান, শ্রদ্ধা কর। তিনি যা বলছেন তা বাইবেলের বক্তব্যের সাথে মেলে না। অতএব বাইবেলের সব কথা তোমরা আক্ষরিক অর্থে অভ্রান্ত ধরে নিও না।”

ধর্মতন্ত্রের সমস্যা হল, তারা তলেমির ভ্রান্ত জ্যোতির্বিদ্যা গ্রহণ করতে রাজি ছিল, কিন্তু তাঁর সঠিক ভূগোল-জ্ঞানকে নয়। তার উপর সার্ভেতো যাজকদের খ্রিস্টকে ঈশ্বর-পুত্র থেকে মানব-সন্তান বানিয়ে ফেলার ফলে তারা তাঁর উপর প্রবল চটে ছিল। সেই তিনি যখন তলেমির বই সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন, তখন তো তা আরও ছোঁওয়ার অযোগ্য। অতএব তারা চার্চের বক্তব্য সংশোধনের পরিবর্তে সার্ভেতোকেই শোধন-লক্ষ্য বানিয়ে ফেলল। সার্ভেতো ক্যাথলিক ফ্রান্স ছেড়ে প্রোটেস্টান্ট সুইডেনে চলে এলেন। সেখানেও সমস্যা বাড়ল বই কমল না। জন ক্যালভিন তাঁর সমালোচনা করায় সার্ভেতো চিঠিতে ক্যালভিনকেও তাঁর ভুল ধরাতে গেলেন। ব্যক্তিগত চিঠি হলেও ক্যালভিন তাতে অসন্তুষ্ট হয়ে সুযোগ খুঁজতে লাগলেন, কীভাবে তাঁকে শায়েস্তা করা যায়। ১৫৫৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রোটেস্টান্ট চার্চের কর্তারাই বিচার করে রায় দিয়ে দিল -- মৃত্যুদণ্ড। এবং তাঁকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল।

এইভাবে অসংখ্য মূল্যবান প্রাণ ধ্বংস করলেও খ্রিস্টীয় ধর্মতন্ত্র সেদিন একটা বিরাট উপকার করেছিল ক্রমাগত অধিকতর সংখ্যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এর বিরুদ্ধে বিবেক বুদ্ধি জ্ঞান চর্চার আগ্রহ জাগিয়ে দিয়ে। এযাবতকাল গির্জা বা মঠই ছিল মানুষের সামাজিক মেলামেশার একমাত্র জায়গা। এখন সাধারণ মানুষও এর বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের সভাসমিতি গঠন করে মুক্ত মনে নতুন বিষয়ে মনোনিবেশ করে এক ভিন্নতর জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ব্যবস্থা করতে লাগল। সেই সব নতুন কথা একে অপরের কাছে বলতে এবং একে অপরের থেকে শুনতে চাইল তারা। ব্রুনোর নিজের দেশ ইতালিতেই ১৫৬০ সালে গড়ে উঠেছিল Academia Secretorum Naturæ (Academy on the Secrets of Nature)। সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য যাজকতন্ত্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভয় দেখিয়ে, আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সব সমিতির দু একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে কোনো অনুমোদিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে উঁচু পদ এবং/অথবা সুযোগ সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে এই জাতীয় প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছিল। এই অ্যাকাদেমিয়াকেও তারা ১৫৭৮ সালে ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে দেয়। এই সমস্ত প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গায়ে প্রায়শই তারা লাগিয়ে দিত কিছু ভয়ঙ্কর শব্দ-ছাপ -- নাস্তিকতা (atheism), অবিশ্বাস (infidelity), শাস্ত্রদ্রোহ (heresy), ধর্মবিদ্বেষ (blasphemy), ইত্যাদি। তখন এর মোকাবিলা করে তাদের বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে উঠত।

তবু সে এক সন্ধিক্ষণ। এক ঐতিহাসিক সামাজিক টানাপোড়েনের রঙ্গকাল।

ইউরোপে তখন মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসকাল এগিয়ে আসছিল। ব্যবসাবাণিজ্যের পরিধি যত বাড়ছিল, ততই সামন্তী সমাজপতি ও উদীয়মান ধনপতিদের মধ্যে বিরোধ ঘনীভূত হচ্ছিল। ইউরোপের বড় বড় শহরের যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি (burghers), যাদের মধ্য থেকেই পরবর্তীকালের বুর্জোয়াদের উদ্ভব ঘটেছিল, তাদের তখন গৎ-বাঁধা শাস্ত্র দিয়ে আর নিত্য-নতুন কাজকারবার চলছে না, বিজ্ঞান চাই। তাদের তখন দরকার ছিল, দুনিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্যানুগ জ্ঞান ও অনুসন্ধান পদ্ধতি। আবার বিজ্ঞান যতটুকু এগোচ্ছিল, তাকে ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ আরও বেশ কয়েক কদম এগিয়ে যাচ্ছিল। কোপারনিকাস থেকে ব্রুনোতে উত্তরণই তার একটা বড় সাক্ষ্য। মানুষের চিন্তাধারায়ও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। দুনিয়ার সব কিছুই এক অমোঘ ঐশ্বরিক বিধান, যা কিছু যেমন আছে তেমনই থাকবে চিরকাল -- এই অটল বিশ্বাসে তখন চিড় ধরেছে। মানুষ নিজেকে আর ঈশ্বরের খামখেয়ালিপনার ভৃত্য হিসাবে দেখতে চাইছে না। নিজেই নিজের অধীশ্বর হতে চাইছে। পঞ্চদশ শতাব্দের একজন মহান শিল্পী (এবং আরও অনেক কিছু), লেওন ব্যাতিস্তা আলবের্তি (১৪০৪-৭২), যে কথাটা উচ্চারণ করেছিলেন -- “মানুষ ইচ্ছা করলে সব কিছুই করতে পারে” -- সেটাই ছিল সেদিনকার বহু মানুষের নিরুচ্চার ভাবনা। তার থেকেই তখন রাজতন্ত্র, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার, জমিদারি প্রথা, ভূমিদাস প্রথা, ইত্যাদির যৌক্তিকতা নিয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিল।[5]

সমগ্র মধ্যযুগ ধরে ইতিহাসে রাজতন্ত্র আর যাজকতন্ত্র পৃথিবীর সব দেশেই এবং সব ধর্মগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই একে অপরের দোসর। কিছু না হলেও তখনই প্রায় দু হাজার বছরের আত্মীয়তা তো বটেই। পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের সাথে খ্রিস্টীয় ধর্মতন্ত্রের ঘনিষ্ঠতা সেদিনই এক হাজার বছরের বেশি পুরনো। তাই ধর্মীয় শিক্ষায় কিংবা ধর্মগ্রন্থে ভুল বেরলে এবং তা নিয়ে জনসাধারণ চর্চা করলে শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রও আর উদাসীন থাকতে পারে না। বিপদের গন্ধ পায়। রাজারা নাকি সব ঈশ্বরের ইহলোক-প্রতিনিধি। সেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই যদি প্রশ্ন জেগে ওঠে, তাহলে রাজার অস্তিত্ব এবং রাজতন্ত্রের যৌক্তিকতা নিয়েও তো প্রশ্ন উঠবেই মানুষের মনে। তাই দুই পক্ষই খুব হুঁশিয়ার হয়ে ঘটনার গতিপ্রকৃতির দিকে লক্ষ্য রাখছে। তার উপর তখন আবার ইউরোপের সমস্ত স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি বিশপদের অধীনস্থ বা তাদের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে চলত। আর মহামান্য পোপের অধীন ক্যাথলিক চার্চ তখন সারা পশ্চিম ইউরোপেই তার নজরদারির নিশ্ছিদ্র জাল পেতে রেখেছিল। ফলে ইতিহাসে বাতিল হয়ে সেই সামন্ততন্ত্রকে রক্ষা করার মহান দায়িত্ব নিয়েই পবিত্র ধর্মতন্ত্র তখন উদীয়মান নব্য বিজ্ঞানের পায়ে রাশ পরিয়ে রাখতে চাইছিল। নতুন যুগের প্রতিনিধি, নতুন মূল্যবোধ ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের বৈতালিক, সত্যসাধক জিওরদানো ব্রুনো সেই বেড়িগুলিকেই ভাঙতে চেয়েছিলেন।

একজন ব্যক্তির তরফে এ প্রায় একটা কঠিন অচলায়তনকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান!


সংযোজনী

[4] পাঠকরা হয়ত খুশি হবেন জেনে, কোপারনিকাসের মৃত্যুর ৪৬৭ বছর বাদে এতদিনে ক্যাথলিক চার্চ বুঝতে পেরেছে যে কোপারনিকাসের তত্ত্বকে বুঝতে সমকালে তাদের কিঞ্চিত ভুল হয়েছিল। এক গণসমাধিস্থলের জঙ্গলে প্রায় হারিয়ে যাওয়া তাঁর কবরস্থানকে খুঁজে বের করে পোল্যান্ড সহ নানা দেশের বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞানের এই জন্মদাতাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে। ২০০৫ সালে তাঁর কবর খুঁজে চিহ্নিত করার পর জমি খুঁড়ে যে সামান্য দেহাবশেষ পাওয়া যায় তাকেই আবার নতুন করে ২০১০-এর ২২ মে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে কবরস্থ করা হয়। এই উপলক্ষে স্থানীয় ক্যাথলিক চার্চের কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত হয়ে এই মহান বিজ্ঞানীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানান এবং বলেন, অতীতে তাঁদের পূর্বসূরিদের কোপারনিকাসের তত্ত্ব সম্পর্কে ভুল ধারণা হয়েছিল।

তবে, কালের হস্তাবলেপে সেই সমাধি-ফলকটি প্রাকৃতিক নিয়মে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের আর একটা পাপের স্বীকারোক্তি আর করতে হয়নি।

[5] ব্রুনোর সময়কাল সম্পর্কে ঊনবিংশ শতাব্দের এক মহান সমাজবিজ্ঞানী ফ্রেডরিখ এঙ্গেল্‌স (১৮২০-৯৫) একটি চমৎকার রূপরেখা (১৮৭৮) তুলে ধরেছিলেন:

“ইউরোপ যখন মধ্যযুগ থেকে উত্তীর্ণ হল, শহুরে উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণিই তখন তার বিপ্লবাত্মক চালিকা শক্তি। মধ্যযুগের সামন্তী ব্যবস্থায় সে একটা স্বীকৃত অবস্থান আদায় করে নিলেও তার বিস্তার ক্ষমতার তুলনায় সেটা ছিল খুবই ছোট। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুর্জোয়া হিসাবে বিকাশের পথে সামন্ততন্ত্র বাধা হয়ে পড়েছিল; ফলে সামন্ততন্ত্রকে বিদায় নিতে হল।

“কিন্তু সামন্ততন্ত্রের একটা বিরাট আন্তর্জাতিক শক্তি ছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চ। এর দ্বারাই পশ্চিম ইউরোপের সামন্ততন্ত্র আভ্যন্তরীন যুদ্ধবিগ্রহ সত্ত্বেও একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রিক এবং অপরদিকে মুসলিম রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে একটা বিরাট রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের গায়েই এ একটা পবিত্র দিব্যজ্যোতির ছাপ মেরে দিয়েছিল। এর নিজের সাংগঠনিক কাঠামোটিও গড়ে উঠেছিল সামন্ততান্ত্রিক স্তরানুক্রমিক মডেলে। আর তাছাড়া, এ নিজেই ছিল সমস্ত অর্থেই সবচেয়ে শক্তিশালী সামন্তপতি। কারণ এর দখলেই ছিল ক্যাথলিক দুনিয়ার এক তৃতীয়াংশ জমি। হীন সামন্ততন্ত্রকে এক একটি দেশে এবং সমস্ত ক্ষেত্রে সফলভাবে আক্রমণ করার আগে, তার এই পবিত্র কেন্দ্রীয় সংগঠনটিকে ধ্বংস করার দরকার হয়ে পড়েছিল।

“তাছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভ্যুত্থানের সমান্তরালভাবেই বিজ্ঞানেরও ব্যাপক অগ্রগতি শুরু হয়ে গিয়েছিল; জ্যোতির্বিজ্ঞান, বলবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, শারীরস্থান, শারীরতত্ত্ব নিয়ে আবার চর্চা শুরু হল। আর বুর্জোয়াদের শিল্প বিকাশের জন্য দরকার ছিল প্রাকৃতিক বস্তুসমূহের ভৌত ধর্ম এবং বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক শক্তির কার্যকলাপ ঠিক ঠিক বোঝার মতো একটা বিজ্ঞান। এদিকে তখনও পর্যন্ত বিজ্ঞান ছিল চার্চের হাতের পুতুল, ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে সে এক পাও ফেলতে পারত না। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সে বিজ্ঞান হয়ে উঠতেই পারছিল না। বিজ্ঞান চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল; বুর্জোয়াদের বিজ্ঞানকে ছাড়া চলছিল না, তাই তারাও এই বিদ্রোহে যোগদান করতে বাধ্য হল।” [Engels 1975, 24-25]

এঙ্গেল্‌স অবশ্য এও দেখালেন যে সামন্ততন্ত্রকে ধ্বংস করে তার জায়গায় ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করে ফেলার পর ক্ষমতাসীন ব্যবসায়ীরা আর ধর্মের বিরোধিতা করতে চায়নি। বরং তখন তারাও ধর্মকে ব্যবহার করতেই আগ্রহী হয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লবে নেতৃত্বে থাকা বুর্জোয়ারা যখন ধর্মকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে দিতে চাইছে, তখন ইংরেজ বুর্জোয়া শ্রেণি, যারা প্রায় একশ বছর আগেই সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ফেলেছে, ধর্মের সাথে নানা মাত্রায় আপস করে চলতে ব্যস্ত।

“সওদাগর বা ক্ষুদ্র কলমালিক নিজেকে তখন প্রভু হিসাবে ভাবতে লাগল, বা পুরনো রীতি মেনে, তাদের কেরানিকুল, শ্রমিক বা ঘরের চাকরবাকরদের তুলনায় নিজেকে ‘অভিজাত বংশীয়’ বলে মনে করত। সে তখন এদের কাছ থেকে যত বেশি এবং যতটা ভালো সম্ভব কাজ পেতে চাইত; তার জন্য তাদের মধ্যে দাস্যভাবের জন্ম দেবার দরকার হত। সে নিজে তখন ধর্মভিরু; তার ধর্ম তাকে রাজা জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়বার মন্ত্র যুগিয়েছে; তার এটা আবিষ্কার করে ফেলতে দেরি হল না—এই ধর্মকে কাজে লাগিয়েই সে তার অধস্তনদের চেতনার উপর এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যাতে তারা ঈশ্বরের ইচ্ছায় তাদের মাথার উপর যে নতুন প্রভু চেপে বসেছে তার হুকুমগুলি মাথা নিচু করে পালন করে যাবে। সংক্ষেপে বলা যায়, ইংরেজ বুর্জোয়াদের এখন একটা কাজ হয়ে দাঁড়াল দেশের নিচুশ্রেণির লোকগুলোকে, উৎপাদক জনসাধারণকে, দাবিয়ে রাখা, আর তার জন্য একটা যে উপায় তারা কাজে লাগাতে পারল তা হল ধর্মের প্রভাব।” [Ibid, 29]

ইংরেজ বুর্জোয়াদের প্রসঙ্গে তাঁর এই মন্তব্য আসলে কম-বেশি সমস্ত দেশের সম্পর্কেই খাটে। ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশে বুর্জোয়াদের ক্ষমতার মসনদে বসার আগে ও পরে ধর্ম ও বিজ্ঞানের প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনায় এঙ্গেল্‌সের এই দুই পর্যায়ের বক্তব্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ।


24 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন