শিবাংশু RSS feed

শিবাংশু দে-এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • কাফিরনামা...(পর্ব ২)
    আমার মতন অকিঞ্চিৎকর লোকের সিরিজ লিখতে বসা মানে আদতে সহনশীল পাঠকের সহ্যশক্তিকে অনবরত পরীক্ষা করা ।কোশ্চেনটা হল যে আপনি কাফিরনামা ক্যানো পড়বেন? আপনার এই দুনিয়াতে গুচ্ছের কাজ এবং অকাজ আছে। সব ছেড়ে কাফিরনামা পড়ার মতন বাজে সময় খুদাতলা আপনাকে দিয়েছেন কি? ...
  • #পুঁটিকাহিনী ৭ - ছেলেধরা
    আজ পুঁটির মস্ত গর্বের দিন। শেষপর্যন্ত সে বড় হল তাহলে। সবার মুখে সব বিষয়ে "এখনও ছোট আছ, আগে বড় হও" শুনে শুনে কান পচে যাবার জোগাড়! আজ পুঁটি দেখিয়ে দেবে সেও পারে, সেও কারো থেকে কম যায় না। হুঁ হুঁ বাওয়া, ক্লাস ফোরে কি আর সে হাওয়া খেয়ে উঠেছে!! রোজ মা মামনদিদি ...
  • আকাটের পত্র
    ভাই মর্কট, এমন সঙ্কটের সময়ে তোমায় ছাড়া আর কাকেই বা চিঠি লিখি বলো ! আমার এখন ক্ষুব্বিপদ ! মহামারি অবস্থা যাকে বলে । যেদিন টিভিতে বলেছে মাধমিকের রেজাল্ট বেরোবে এই সপ্তাহের শেষের দিকে, সেদিন থেকেই ঘরের পরিবেশ কেমনধারা হাউমাউ হয়ে উঠেছে। সবার আচার-আচরণ খুব ...
  • আকাটের পত্র
    ভাই মর্কট, এমন সঙ্কটের সময়ে তোমায় ছাড়া আর কাকেই বা চিঠি লিখি বলো ! আমার এখন ক্ষুব্বিপদ ! মহামারি অবস্থা যাকে বলে । যেদিন টিভিতে বলেছে মাধমিকের রেজাল্ট বেরোবে এই সপ্তাহের শেষের দিকে, সেদিন থেকেই ঘরের পরিবেশ কেমনধারা হাউমাউ হয়ে উঠেছে। সবার আচার-আচরণ খুব ...
  • মন্টু অমিতাভ সরকার
    পর্ব-২ঝাঁ-চকচকে শহরের সবচেয়ে বিলাসবহুল বহুতলের ওপরে, সৌর বিদ্যুতের অসংখ্য চাকতি লাগানো এ্যান্টেনার নীচে, একটা গুপ্ত ঘর আছে। সেটাকে ঠিক গুপ্ত বলা যায় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। যাহা চোখের সামনে বিরাজমান, তাহা গুপ্ত হয় কেমনে? ভাষা-বিদ্যার লোকজনেরা চোখ ...
  • পুঁটিকাহিনী ৬ - পারুলদি পর্ব
    পুঁটির বিয়ের আগে শাশুড়িমা বললেন যে, ওবাড়ি গিয়ে পুঁটিকে কাজকম্মো বিশেষ করতে হবে না। ওমা! তাও আবার হয় নাকি! গিয়ে কিন্তু দেখা গেল, সত্যিই তাই। পুঁটি সপ্তাভর আপিস করে আর সপ্তাহান্তে মাসতুতো-মামাতো দেওর-ননদ জুটিয়ে দিনভর আড্ডা- অন্তাক্ষরী-তাস খেলা এ সব করে। ...
  • গরু ও মানুষের বিবরণ
    সেই সময়ের গল্পটা আপনাদের আজ বলা প্রয়োজন, কারণ আজ হয়ত সেই সময়ের চেয়ে পূর্বের বা পরের একটা সময়, যখন আপনি এই গল্পটা পড়ছেন, এটিকে আপনার ভুল বুঝার যথেষ্ট অবকাশ আছে, কারণ লিখিত বক্তব্য লিখিতই এবং তা যেসব বক্তব্য তৈরি করে ক্ষেত্রবিশেষে তা এতই স্বাধীন হয়ে যায় যে ...
  • নামসংকীর্তন কহে নরোত্তম দাস
    সাধনপদ্ধতি হিসাবে কীর্তনের প্রয়োগ সম্ভবতঃ ভক্তিধর্মের উত্থানের একদম গোড়ার দিক থেকেই। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনাতেও সমবেতভাবে আধ্যাত্মিক গান গাওয়ার প্রচলন ছিল (উদাঃ চর্যাগীতি)। বাংলায় বিভিন্ন আকর গ্রন্থে (চৈতন্যমঙ্গল, চৈতন্য চরিতামৃত) ‘সংকীর্তনদাতা’ বা ...
  • টুকরোটাকরা ৬
    ১৯৫১ সালে অশোক কুমারের আহ্বানে সারা দিয়ে বম্বে টকিজের ব্যানারে নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে বিমল রায় তার ইউনিটের একাংশ নিয়ে বম্বে চলেছেন হিন্দি সিনেমা বানাবেন বলে।ইউনিটের সদস্যরা হচ্ছেন প্রধান সহকারী অসিত সেন,এডিটর হৃষিকেশ মুখার্জি, পল মহেন্দ্র, চিত্রনাট্যকার এবং ...
  • সরদার বেগম
    সরদার বেগম১৯৩৪ সাল। লুধিয়ানার এক আদালতে ১৩ বছরের একটা ছেলেকে জজসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কার সঙ্গে থাকতে চাও আব্দুল হায়ি?ছেলেটা শুধু একবার ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল তার পিতার দিকে, তারপর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো অপরূপ সুন্দরী সরদার বেগমের ত্রস্ত চাহনির জবাবে দৃঢ় কণ্ঠে ...

জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

শিবাংশু

"....অনেকদিনের মনের মানুষ যেন এলে কে
কোন ভুলে যাওয়া বসন্ত থেকে...."
-------------------------------
চার দশক আগের কথা। সদ্য কলেজ ছেড়েছি। চাকরিতে তখনও ঢোকা হয়নি। একটা পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলুম রাঁচি। বি আই টি, মেসরায় ছিলো পরীক্ষাকেন্দ্র। ফেরার পথে একটু দিক বদলে বুটি রোড ধরে মোরাবাদি। ভাঙাচোরা রাস্তা। কিছু ট্রেকার, কিছু রিকশা। বাকিটা এগারো নম্বর। যাবো নিশ্চিন্দিপুর, অর্থাৎ ঠাকুর পাহাড়। মোরাবাদি ধরে যেতে যেতে বাঁদিকে ছোটো খাপরা, খড়ের প্রাসাদ। ডানদিকে মস্তো বাগানঘেরা বাংলোবাড়ির সারি। দেউড়িতে নামের ইশারা। ঘোষ, ব্যানার্জি, দাশগুপ্ত গোছের নাম সব। বোঝা যায়, বর্ধমান কম্পাউন্ড, লালপুরের পর প্রাচীন বাঙালি উপনিবেশ ছিলো এ এলাকায়। ও তল্লাটে সে সময় সব চেয়ে বড়ো ঠিকানা ছিলো রামকৃষ্ণ মিশন। ঠিক পাহাড়ের পায়ের কাছেই। মিশনের পাঁচিল পেরিয়েই বাঁদিকে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে ভাঙাচোরা পাথরের পাকদন্ডি। মাঝপাহাড়ে পড়ন্ত রোদে জ্যোতিদাদার বাড়ির বিবর্ণ দেওয়াল উঁকি দিচ্ছে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে।
------------------------------------------
" ,.....আমার বিয়ের কিছুদিন পরে দার্জিলিং প্রবাসকালে যে শরীর খারাপ হয়, সে অসুখ শীঘ্র সারে না ও খুব রোগা হয়ে যাই। মা তো কেঁদেকেটে অনেক হাঙ্গাম করে পাহাড় থেকে নাবিয়ে আনলেন। তার পর বললেন আমার মেয়ের যেখানে শরীর সারবে, সেইখানে বাড়ি করব। তখন স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবে রাঁচির গুণগান সবে শুরু হয়েছে। কতক কবিরাজি ওষুধের ফলে এবং কতক রাঁচির হাওয়ার গুণে আমার নষ্ট স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার হয়। তাই যে কথা, সেই কাজ,- মা ওঁরা সেখানে প্রথম দু-একটা ভাড়া বাড়িতে থেকে পরে নিজেরা বাড়ি তৈরি করেন। কাকামশায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পাহাড়ের উপর শান্তিধাম বাড়ি ও চূড়ার উপর মন্দির তো এখন রাঁচিযাত্রী মাত্রেরই একটা দ্রষ্টব্য স্থান হয়ে উঠেছে। আর পাহাড়ের তলায় মায়ের পরিকল্পিত বাংলোবাড়িও তার আটপৌড়ে গড়নের দরুন একটু অসাধারণ ধরনের। বাবার ইচ্ছেয় তার নাম রাখা হয় 'সত্যধাম'। " (ইন্দিরা দেবীঃ প্রবাসী, ফাল্গুন ১৩৪৮)।

১৯০৭ সালের শেষদিকে রাঁচি বেড়াতে গিয়ে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জায়গাটি ভালো লেগে যায়। ইন্দিরা দেবী যেমন লিখেছেন, তাঁরা শেষ জীবনটা রাঁচিতে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। দেখেশুনে তাঁরা মোরাবাদি পাহাড়টি বসবাসের জন্য পছন্দ করেন। এই জমি ও পাহাড়ের মালিক ছিলেন হরিহর সিং নামের এক স্থানীয় জমিদার। রাঁচির তৎকালীন পি ডবলিউ ডি'র ইঞ্জিনিয়র মহেন্দ্রনাথ দত্তের মধ্যস্থতায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পাহাড়টি কিনে ফেলেন। ১৯০৮ সালের অক্টোবর মাসে জায়গাটি তাঁর নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। ১৯০৯ সাল থেকে পাহাড়ে ওঠার রাস্তা ও থাকার বাড়ি নির্মাণ হওয়া শুরু হয়। ১৯১০ সালের ১৭ই এপ্রিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বাড়ির উদ্বোধন হয়। নাম শান্তিধাম। কিছুদিন পরে এই পাহাড়টির পায়ের কাছে সত্যেন্দ্রনাথও তাঁর 'সত্যধাম' নামে বাড়িটি তৈরি করেন।
------------------------------------------------
".... মাঝে মাঝে কোন বাতাসে চেনা দিনের গন্ধ আসে
হঠাৎ বুকে চমক লাগায় আধভোলা সেই কান্নাহাসি..."

রাঁচি শহর প্রথম যাই নিতান্ত আমার বাল্যকালে। তখন জামশেদপুর থেকে রাঁচি যাবার ৩৩ নম্বর জাতীয় সড়ক তৈরি হয়নি। সড়কপথে যেতে গেলে চাইবাসা, চক্রধরপুর, টেবো, হেসাডি দিয়ে অনেক ঘুরে যেতে হতো। নয়তো রেলপথে মুরি হয়ে পাহাড় ঘুরে ঘুরে ঝিকঝিক করতে করতে যাওয়া। মুরি, সিল্লি, লোটা, হলং হয়ে টাটিসিলওয়াই। ঘন পাহাড় জঙ্গলের ছবির মতো পথ দিয়ে রেলগাড়ি চলেছে নিজের মতো। রাত ভর যাত্রা।

সেটা ছিলো এপ্রিলমাসের শেষ। গরমের ছুটি পড়ে গেছে। জামশেদপুরের জ্বলন্ত গ্রীষ্ম ততোদিনে দোরগোড়ায়। রাতের ট্রেনে যখন চড়েছি তখনই পোড়ানো গরম। হলুদ কাঠের পাটা দিয়ে তৈরি বেঞ্চি আর বাংক। তখনও কেউ স্লিপার কামরা দেখেনি। দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়া। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেলো ঠান্ডা লেগে। তখনও রোদ ওঠেনি। জানালা দিয়ে ভোরের শিরশিরে হাওয়া ভাসিয়ে দিচ্ছে চরাচর। বাইরে তাকিয়ে দেখি সবুজ থেকে সবুজ, পাহাড় থেকে পাহাড়। রাঁচি যে এতো সুন্দর একটা জায়গা হতে পারে, কখনও ভাবিনি।
---------------------------------------
কেমন ঘুমন্ত একটা শহর। জামশেদপুরের জাঁকজমক কিছু নেই। তখন বোঝার বয়স হয়নি পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে এই ছোট্টো জনপদটা কতোটা ছোটো ছিলো। বাংলাদেশের সম্পন্ন লোকেরা মধুপুর, শিমুলতলা, গিরিডি'র সঙ্গে রাঁচিতেও হাওয়াবদল করতে এসে বাড়িঘর বানাতে শুরু করে দিয়েছেন ততোদিনে। ঠাকুরবাড়ির দুই অগ্রণী প্রতিনিধিও সিদ্ধান্ত নিলেন এই মফস্সলে এসে শেষ জীবনটা কাটাবেন। মনে রাখতে হবে দু'জনেই ভারতবর্ষের মহানাগরিক যাপনের মুখপাত্র, দীর্ঘদিন ধরেই। এটা কি তাঁদের জন্য পুরাকালের বানপ্রস্থ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো?
-------------------------------------------------------
১৯০৯ সালের ১৪ই এপ্রিল, পয়লা বৈশাখে, পাহাড়চূড়ার ব্রহ্মমন্দিরে ভোর সাড়ে পাঁচটায় উপাসনা শুরু হলো। প্রথমে আরতি, " তাঁহারে আরতি করে চন্দ্র তপন" এই গান গেয়ে। তারপর সত্যেন্দ্রনাথের উপদেশ। পর পর পিতা নোহসি, "অখিল ব্রহ্মাণ্ডপতি"। ১৭ই এপ্রিল, চৌঠা বৈশাখ ব্রহ্মোৎসব করে জ্যোতিদাদার বাসস্থান 'শান্তিধাম' প্রতিষ্ঠার দিন। শান্তিনিকেতনের স্বামী অচ্যুতানন্দ, প্রিয়নাথ শাস্ত্রী এবং সত্যেন্দ্রনাথ বেদী গ্রহণ করে উপাসনা করলেন। জ্যোতিদাদার ডায়রিতে পাই " মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে সুরেন, সংজ্ঞা, দিদি,সত্য, বর্ণ ও শাস্ত্রী এসেছেন।" রবীন্দ্রনাথ কিন্তু আসেননি। জ্যোতিদাদার উপর তাঁর কোন অভিমান এতোটা জাগরূক ছিলো, তার হদিশ কখনও কেউ জানতে পারেনি। সেই উপলক্ষ্যে তো বটেই, রবীন্দ্রনাথ তার পরেও কখনও রাঁচি আসেননি।
-------------------------------
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে নীলমণি ঠাকুরের পরিবারে সব চেয়ে বহুমুখী সেরিব্রাল মননের অধিকারী ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। জ্ঞান হবার পর থেকে সারা পরিবারের মধ্যে তিনিই ছিলেন কবির হিরো। কিন্তু যৌবনে পৌঁছে কোথাও একটা তাল কেটে যায়। হয়তো কাদম্বরীপর্ব একটা কারণ হতে পারে। অথবা অন্য কিছু। এটা চিরকাল একটা সমাধানহীন রহস্য হয়ে থেকে গেছে। বাইরের জগতে কবি বারবার জ্যোতিদাদার প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসার ইশারা প্রকাশ করে গেছেন। কিন্তু অন্তর্জীবনে তাঁর প্রতি কোথাও একটা ধূসর অনুভূতি সম্পর্কটিকে একটু ম্লান করে রাখতো। জ্যোতিদাদা কিন্তু একান্ত স্নেহাষ্পদ রবির প্রতি তাঁর পক্ষপাত কখনও ঢেকে রাখতেন না। শেষ জীবনে রাঁচিতে থাকার জন্য স্থানান্তরের দূরত্ব একটা ভূমিকা পালন তো করতো নিশ্চয়। কিন্তু জ্যোতিদাদা কখনও হৃদয়ের রাজত্ব থেকে রবিকে দূরে যেতে দেননি। ১৯১৩ সালের মে-মাসে জ্যোতিদাদার তেষট্টিতম জন্মদিন পালন হয়েছিলো রাঁচিতে। সেখানে ২৬ জন অতিথি এসেছিলেন। তাঁদের সামনে তিনি বাল্মীকিপ্রতিভা গেয়ে শুনিয়েছিলেন। বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি গ্রন্থে আমরা এই সব তথ্য পাই। জ্যোতিদাদা বসন্তকুমারকে প্রশ্ন করেছিলেন, " আপনারা আমাকে রবি ভাবেননি তো?" তখন তিনি ছোটোভাইয়ের মতো দীর্ঘ শ্মশ্রু ধারণ করতেন।
------------------------------------
সত্যেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দুজনেই পাশাপাশি বাড়ি করেছিলেন রাঁচিতে। যদিও সত্যেন্দ্রনাথ অনেক সময় কলকাতাতেই থাকতেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ঠিকানা কিন্তু প্রধানতঃ ছিলো রাঁচিতেই। ঠাকুরবাড়ি ও বাংলার বহু প্রধান ব্যক্তিত্বরা প্রায়ই এই বাড়িতে এসে আতিথ্য গ্রহণ করতেন। ১৯১৫ সালের অক্টোবর মাসে কবির বড়ো মেয়ে-জামাই, বেলা ও শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী গাড়ি করে হাজারিবাগ থেকে এসেছিলেন। উল্লেখ্য, এই সময় এঁদের সঙ্গে স্বয়ং কবির সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। নভেম্বর মাসে সস্ত্রীক দিনেন্দ্রনাথ শান্তিধামে এসেছিলেন। তিনি যেতে না যেতেই সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র বসুও এসে কিছুদিন থেকে গেছেন।
--------------------------------
"... আলো জ্বালো হৃদয়দীপে অতি নিভৃত অন্তরমাঝে
আকুলিয়া দাও প্রাণ গন্ধচন্দনে....."

সমুচিত সময়ে মহর্ষির পঞ্চম পুত্রের আশ্রয়ছায়া না পেলে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কতোটা এগিয়ে যেতে পারতেন বা কতোদিনে তা সম্ভব হতো, এসব দৈবজ্ঞের এলাকা। তবে অতো বড়ো ঠাকুরবাড়ির চারদিকে ছড়ানো নক্ষত্রদের মধ্যে স্বতষ্ফূর্তভাবে রবির প্রকৃত গাইডিং অ্যাঞ্জেল হয়ে উঠেছিলেন তাঁর জ্যোতিদাদা। শারীরিক, মানসিক, সৃজনশীল, সব মাত্রাতেই এই দুই ভাইয়ের মধ্যে সাযুজ্য ছিলো লক্ষ্যনীয়। কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে বাদ দিলে জোড়াসাঁকোর প্রধান নক্ষত্র ছিলেন জ্যোতিদাদা। মহর্ষির পুত্র, অসাধারণ ধীমান দ্বিজেন্দ্র বা সত্যেন্দ্রর ভাই জ্যোতিরিন্দ্র যখন এফ এ পড়তে গিয়ে প্রেসিডেন্সি ছেড়ে ব্রাহ্মমননের চক্ষুশূল, থিয়েটার নাটকে মনোনিবেশ করেন, তখন একটা ব্যতিক্রমী নজির তৈরি হয়। এই নজিরটি অনুসরণ করেন কনিষ্ঠ রবি। প্রথাগত পাঠক্রমের খাঁচায় যে ঐ মাপের সৃজনশীলতাকে বেঁধে রাখা যায়না সেই সত্যটি তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন। আরো দু'তিনশো বছর আগে য়ুরোপে যে সময়টিকে 'রেনেশাঁস' বলা হয়, তার সঙ্গে জড়িত মানুষজন, তাঁদের ক্রিয়াকলাপ, চিরকালের মানবিক ইতিহাসে তাঁদের পদচিহ্ন, তার সামগ্রিক আবহের নির্যাসটি জোড়াসাঁকোর গলিতে পায়ে পায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো এই দুই ভাইয়ের হাত ধরে। জ্যোতিদাদা ছিলেন বাস্তববুদ্ধিহীন। এই ব্যাপারে তাঁর অগ্রজ ছিলেন দ্বিজেন্দ্র। অথবা উন্মাদ বা প্রায় উন্মাদ বীরেন্দ্র আর সোমেন্দ্র'র তো কথাই নেই। হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন গৃহস্থ। প্রকৃতপক্ষে জোড়াসাঁকোয় কপিবুক বাঙালির পরিবারের কর্তা হিসেবে হেমেন্দ্রনাথ একাই ছিলেন। দ্বারকানাথ বা দেবেন্দ্রনাথের সূক্ষ্ম বাস্তববুদ্ধির ঐতিহ্য পেয়েছিলেন দু'জন মাত্র। সত্যেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ। ১৮৮৪ সালে জ্যোতিরিন্দ্র যখন বিপত্নীক হ'ন, তখন তিনি সম্ভবতঃ সমগ্র বঙ্গদেশে উজ্জ্বলতম, গরিমাময় নায়ক হিসেবে গণ্য হতেন। সেকালে বাংলায় যেকোন শ্রেষ্ঠ নারীরত্ন তাঁকে সঙ্গী হিসেবে পেলে নিজেকে ভাগ্যবতী বোধ করতেন । কিন্তু তিনি দাম্পত্যজীবন থেকে দূরে সরে থেকেছেন পরবর্তী একচল্লিশ বছর। তাঁর প্রিয় রবি'র সঙ্গেও অদৃষ্ট সে রকম কিছু একটা খেলা খেলেছিলো। মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পরের দিন মহর্ষি বলেছিলেন, রবির জন্য তিনি ভাবেন না। কারণ রবির নিজেকে নানাকাজে জড়িয়ে রাখার ক্ষমতা রয়েছে। তাঁর চিন্তা শুধু তাঁর নাবালক পৌত্রপৌত্রীদের জন্য। রবির উপর মহর্ষির ভরসা ছিলো। কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্র নিঃসন্তান, বিপত্নীক, বাস্তববুদ্ধিহীন, যদিও উচ্চস্তরের এক প্রতিভা। তাই তাঁর উপর কারুর 'ভরসা' ছিলোনা। স্বমহিমায় বেঁচে থাকতে জ্যোতিদাদার একজন অবলম্বন দরকার হতো। হয়তো রবিই সেই ভূমিকাটি সব চেয়ে সুচারুভাবে পালন করতে পারতেন। কিন্তু দুজনের মধ্যে যে কাচের দেওয়ালটি এসে দাঁড়িয়েছিলো, তা কোনওদিন সরে যায়নি। জ্যোতিদাদার সহায় হয়ে যিনি এসেছিলেন তিনি মেজদা, সত্যেন্দ্রনাথ। সব কিছু থেকেও একান্ত একলা জ্যোতিকে মেজদা নিয়ে এসেছিলেন অজ্ঞাত, অখ্যাত বনপাহাড়ের মফস্সল রাঁচির এই একলা টিলায়। তিনি বুঝেছিলেন, যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের, মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা। অশ্বত্থের শাখা ঐ পাহাড়চূড়ায় এসে শিকড় পাতলেন শেষজীবনে।
-------------------------------------------
'শান্তিধামে' ওঠার সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় একটা কুসুমগাছের ছায়ায় বসে এই সব কথা মনে আসছিলো। আমরা গল্প করছিলুম। লোকে বলে এই কুসুমগাছটির ছায়ায় জ্যোতিদাদা এসে বসতেন, প্রায়ই।
----------------------------------
আগেই লিখেছি , ঠাকুরবাড়ির লোকজনের যখন এই জায়গাটা ভালো লেগে যায়, তখন এর নাম ছিলো মোরাবাদি পাহাড়। তাঁরা গোটা পাহাড়টিই কিনে নেন। পাহাড়ের গোড়ায় সত্যেন্দ্রনাথ নির্মাণ করেন তাঁর বাংলোবাড়ি, 'সত্যধাম'। চূড়ায় ওঠার মধ্যেপথে তৈরি হয় জ্যোতিরিন্দ্রের বাড়ি, 'শান্তিধাম'। আর একেবারে চূড়ায় 'ব্রহ্মস্থল'। মাটির থেকে তিনশো ফিট উঁচু এই পাহাড়। সে সময়কার তোলা কোনও ফোটো আছে কি না, জানিনা। তবে ১৯১২ সালে নন্দলাল বসুর ছাত্র, পরবর্তীকালের বিখ্যাত শিল্পী, মুকুল দে মশাই কিছুদিনের জন্য এখানে এসে জায়গাটার একটি ছবি এঁকেছিলেন।সেই ছবিটিতে দেখা যায় আদিগন্ত প্রান্তরের মধ্যে একটি ছোটো পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। ধারেকাছে কোনও লোকালয় নেই। সামনে খোলা জমিতে একটি বাংলো ধরণের বাড়ি। তার পর পাহাড়ে ওঠার ঢালু রাস্তা। কিছুদূর পাহাড়ে ওঠার পর পাঁচিলঘেরা শান্তিধাম। পাহাড়ের চূড়ায় ব্রহ্মস্থল। পাহাড়টি মোটামুটি ন্যাড়া। কয়েকটি বৃক্ষ এদিকওদিক। চূড়ার পথে একটি খোলা গোল চত্বর। কোনও বাঁধানো সিঁড়ি চোখে পড়ছে না। পাথরের পাকদন্ডি বেয়ে চূড়ায় ওঠার রাস্তা। গোটা ছবিটায় ফুটে উঠেছে অপরাহ্নের আলোয় মৌন নিসর্গের একটা মায়াবী আলেখ। আমি যখন প্রথম দেখি প্রায় চারদশক আগে, তখনও মোরাবাদি পাহাড়ের একাকী মাহাত্ম্য খর্ব হয়নি। বহুদূর পর্যন্ত তার চারদিকে ঘেরা ছিলো কলরবহীন, সমাহিত নৈঃশব্দ্যের প্রান্তরভূমি। দিনের বেলা তাকে দেখতে পাওয়া যায় দূর থেকে। কিন্তু রাতের বেলা একেবারে পাণ্ডববর্জিত নিরালোক একটি নিসর্গ। মোকাম কলকাতার উজ্জ্বলতম মহানাগরিকদের বসবাসের জন্য একেবারে বেমানান এক নির্বাসনভূমির মানচিত্র যেন।
---------------------------------
মোরাবাদি পাহাড় বা টেগোর হিল রাঁচি শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রায় চার কিমি উত্তরে রয়েছে। আপারবাজার কাছারি রোড থেকে রেডিয়াম রোড। ফৌজিডেরা পেরিয়ে আরো একটু এগিয়ে গেলেই মোরাবাদি রোড। সেখান থেকে ডাইনে মোচড় মেরে একটু এগিয়ে গেলেই সটান উত্তরের দিকে চলে গেছে রামকৃষ্ণ মিশনের রাস্তা। তেমন ভিড়ভাড় থাকেনা। একটু এগোলেই রাস্তার দুধারে রামকৃষ্ণ মিশনের বহুমুখী ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে বিজড়িত নানা ঘরবাড়ি। এই আশ্রমটি মিশনের অন্যতম প্রাচীন ও বিস্তৃত কেন্দ্র। সেগুলির শেষে রাস্তার বাঁদিকে একটি চড়াই রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ের দিকে। ডানদিকে পাহাড়, বাঁদিকে বাড়িঘর। প্রায়ই গেটে আইনজীবীদের নাম আঁটা। এই সব বাড়িঘর অধিকাংশই বেআইনিভাবে জবরদখল করে তৈরি করা হয়েছে। গোটা এলাকাটিই শান্তিধামের অংশ ছিলো সেকালে। একটু দূর উঠলেই ডানদিকে একটা মস্তো বেমানান তোরণ। সেটাই প্রবেশপথ। তোরণের সামনে চারপাঁচ ধাপ সিঁড়ি। তার সামনে লোকে রোদ পোয়াতে পোয়াতে আড্ডা দেয় ।
--------------------------
১৯২৫ সালে জ্যোতিরিন্দ্রের দেহাবসান হবার দুবছর আগেই সত্যেন্দ্রনাথের প্রয়াণ ঘটেছিলো। এই সম্পত্তিটির রক্ষণাবেক্ষন বর্তে ছিলো সুরেন্দ্রনাথ এবং ইন্দিরাদেবীর জিম্মায়। তাঁরাও কিছুদিন পর আর এই দায়িত্ব পালন করতে পারলেন না। তার পর বহুবার হাত বদল হয়ে একদিন তা জবরদখল হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত একদিন দেখা গেলো এই ঐতিহ্যমণ্ডিত নিদর্শনটিকে ছাত্রদের থাকার জায়গা বানিয়ে একজন ব্যবসা শুরু করছে। এ ছাড়া এই সুরম্য প্রাকৃতিক পরিবেশে রাঁচির লোকজন বনভোজন করতে একত্র হতো প্রায়ই। ২০০৩ সাল নাগাদ ভারতীয় পর্যটন নিগম এই জায়গাটিকে উপযুক্তভাবে সংস্কার করার জন্য দু'কোটি টাকা বরাদ্দ করে। শান্তিধাম ও ব্রহ্মস্থলের সংস্কার ছাড়াও পরিকল্পনায় ছিলো শিখর পর্যন্ত সিঁড়ি, তোরণ, শৌচাগার, দর্শনীয় বিন্দুগুলিতে মঞ্চ, একটি আর্টগ্যালারি ও মিউজিয়ম। আজ পর্যন্ত তার কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হয়নি। ২০০৫ সালে ঝাড়খন্ড সরকার ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলো এটিকে অধিগ্রহণ করার জন্য। কিন্তু এখনও তার কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
-------------------------------
"..... মন আজও তার নাম জানে না, রূপ আজও তার নয়কো চেনা-
কেবল যে সে ছায়ার বেশে স্বপ্নে আমার বেড়ায় ঘুরে...."
সদর দেউড়ি দিয়ে ঢুকে ডানদিকে সত্তর-আশি ধাপ উঠলেই শান্তিধামের তোরণ পৌঁছে যাবে। পাহাড়ের খাদের দিকটা জুড়ে মূল প্রাচীরটি। পরবর্তীকালে অবশ্য চারদিকে আলাদা করে প্রাচীর তোলা হয়েছে নিরাপত্তার দিকে নজর রেখে। শান্তিধামের মূল ভবনের সামনের দিকটিতে একটি ঘরের মতো পরিসর রয়েছে। ভবনটি টানা বিস্তার পেয়েছে পিছনদিকে। একতলা বাড়ি। ছাদটি রেলিং দিয়ে ঘেরা। একটি সিঁড়ি বাড়ির বাইরে দিয়ে ছাদে উঠে গেছে। রেলিং ও ছাদের সামনে স্থাপত্য মূলতঃ বৌদ্ধধাঁচের। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে এই স্থাপত্যের প্রয়োগ আমরা দেখেছি। শ্রীলঙ্কায় ডাম্বুলা পাহাড়ের বৌদ্ধ গুহামন্দিরে ও ক্যান্ডির বৌদ্ধবিহারে অবিকল এই শৈলির স্থাপত্য চোখে পড়েছিলো। বাড়ি ও প্রাচীরসহ সমগ্র পরিসরটি মনে হলো সদ্যো শাদা রং করা হয়েছে। এই শুভ্রতা, শান্তিধামের স্বভাবের অনুসারী। বাড়িটি বন্ধ ছিলো। তাই ভিতরে ঢুকে দেখার সুযোগ হয়নি। পাশের দেওয়ালে নানা রকম ম্যুরাল, বাসরিলিফের কাজ রয়েছে। ঘরানাটা কলাভবনের। ঢোকার মুখে তিন-চারটি সিঁড়ির ধাপ, তার পর আধ-গোল একটি বারান্দা। দু'দিকে থাম। সামনে একটি মূল দরজা,। তবে বাড়ির পাশের দিকে আরো দরজা আছে, সরাসরি অন্দরমহলের দিকে, যার পাশ দিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি উঠে গেছে। এই ছাদটি দেখলে জোড়াসাঁকোর সেই ছাদের কথা মনে হবেই, যেখানে প্রতি সন্ধেবেলা জ্যোতিদাদা, বৌঠান আর রবি মিলে জুঁই-বেলির গন্ধমাখা হাওয়ায় গানবাজনা করতেন। এই ছাদটিতে বসে একসময় বাংলা রেনেশাঁসের কতো প্রধান মানুষেরা চা-চক্র উপভোগ করেছেন, ইয়ত্তা নেই। কিন্তু রবি বা তাঁর বৌঠান কখনও আসেননি সেখানে।
------------------------------
তখন যা ছিলো পাকদন্ডি, এখন সেখানে প্রশস্ত সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে। সিঁড়ির দুধারে চওড়া নিচু পাঁচিল। ক্লান্ত লাগলে কয়েকদণ্ড বসে থাকা যায়। রাঁচিতে হাওয়া বেশ শীতল, মনোরম। শ'খানেক সিঁড়ি আরো ভাঙলে শীর্ষদেশে পৌঁছে যাওয়া যায়। সেখানেই দাঁড়িয়ে একটি ছত্রি, নাম ব্রহ্মস্থল। ন'ফুট X ন'ফুট বাঁধানো চাতালের উপর আটটি থামের উপর রাজপুত স্থাপত্যের লাল পাথরের ছত্রি এবং তার উপর গথিক শিখর। চূড়ায় ছোটো আমলক ও ধ্বজদণ্ড। কেউ একটা শাদা কমলা ডোরা পতাকা তেকোণা পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। চারদিকে ছড়ানো রাঁচি শহরের ল্যান্ডস্কেপ। রক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছোটো ছোটো পাহাড়ের সারি। ভাসিয়ে দেওয়া হাওয়ার স্রোত। সকালবেলার পূবদিকের আকাশে বেশ কিছুটা উঠে গেছে রোদ। চুপ করে বসে থাকার জন্য আদর্শ। যাঁরা ধ্যান করেন তাঁদের স্বর্গ। অন্যদিকে দেখতে গেলে এই জায়গাটা বহুদিন ধরেই রাঁচির ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ল। আমাদের কালে যখন এই সব গ্রামে যুগলে বসে বিশ্রম্ভালাপ একটা ট্যাবু ছিলো তখনও এই বিজন বিপিনে কিছু সাহসী যুগলকে দেখা যেতো। এই মূহুর্তে তো যেদিকে তাকাই ইউনিফর্ম পরা ব্যাগ কাঁধে বাচ্চারা বসে আছে জোড়ায় জোড়ায়। হর্মোনের কাছে রক্তমাংস কতো অসহায়।
------------------------------------------------
"....আজ কি তবে এত ক্ষণে জাগল বনে যে গান ছিল মনে মনে
সেই বারতা কানে নিয়ে যাই
যাই চলে এই বারের মত...."

"জ্যোতিকাকামশায়ের শেষ সময়ে আমরাই কাছে ছিলুম। সুরেন কাজের হিড়িকে থাকতে পারেননি, চলে গিয়েছিলেন।মা যদিও কাছে ছিলেন, কিন্তু ব্যামো যে কত গুরুতর হয়েছে তা বোধ হয় হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি, নিয়মমতো ঘরকন্নার কাজ করে যাচ্ছেন। জ্যোতিকামশায় বরং এক আধবার বলতেন-'মেজবৌঠান আমার কাছে একটু বসেন না কেন!'....

জ্যোতিকামশায় যে কতদিন হার্নিয়ায় ভুগছেন, সে জিনিসটা যে কী তা পর্যন্ত মা জানেন না।.... আর তিনিও ঐ রোগ নিয়ে বছরের পর বছর কী করে যে একলা ঐ পাহাড়ের উপর কাটিয়ে গেলেন- একটা চাকর ডাকবার দরকার হলেও পাহাড়ের মাঝরাস্তার ছোটো বাড়ি থেকে ঘন্টা বাজিয়ে তবে তাকে আনতে হত। এও আর-এক আশ্চর্য ব্যাপার।অথচ ঐ অন্ত্র বেরিয়ে পড়লে যে কত সাংঘাতিক অবস্থা হতে পারে তা কি আর তিনি বুঝতেন না?- অথচ একলা থাকতে তো কোনো ভয়ডর ছিল না। যে-ঘন্টা জাপান থেকে রবিকা এনে দিয়েছিলেন, তার চেহারা এখনো চোখে ভাসছে, আর শেষদিন বেলা পাঁচটা পর্যন্তও সেই ঘন্টা নিজের হাতে বাজিয়েছেন, তার আওয়াজ এখনো কানে বাজছে-অথচ ছ'টার সময় সব শেষ হয়ে গেল।
বুকে কাশি বসেছিল- চিরদিনই তো ওঁদের হাঁপানি কাশির ধাত। ভালো সাহেব ডাক্তারই দেখেছিল, কিন্তু কিছু করতে পারলে না। আমাদের দুজন অনুগত লোক রাতদিন কাছে থেকে যথেষ্ট সেবা করেছিল। আর সেই পর্যন্ত রোগশয্যায় ব'সেও উপাসনায় যোগ দিয়েছেন। যেমন ওঁদের ভাইদের ধাত ছিল। ...... নতুন কাকিমার একটি নিজ হাতে আঁকা পেনসিলের ছবিই সেই ঘরের একমাত্র সজ্জা ছিল।....
..... তবে তিনি যে জমিটুকু মোরাবাদীর রাস্তার উপর কুয়ো খোঁড়াবার জন্য কিনেছিলেন ও বাড়ি তৈরি করতে আরম্ভ করেছিলেন, তাঁর শেষ ইচ্ছাপত্র অনুসারে তাঁরই ব্যাঙ্কে জমা টাকা দিয়ে সে বাড়ি শেষ করে তাঁরই নির্দেশমতো ঐ অঞ্চলের গরিব আদিবাসীদের হোমিওপ্যাথি ঔষধ বিতরাণার্থে 'সেবাধাম' নাম দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে দেওয়া হয়েছে।"
------------------------------------
জানা যায়, "..... শ্রীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের মৃত্যু উপলক্ষ্যে আশ্রমে একদিন অনধ্যায় ছিল। এতদুপলক্ষ্যে প্রাতঃকালে মন্দিরে উপাসনা হয় এবং সন্ধ্যায় একটি সভা হয়। তাহাতে শ্রদ্ধেয় রামানন্দ বাবু, নেপালবাবু ও এণ্ডরুজ সাহেব জ্যোতিরিন্দ্র বাবুর জীবনী সম্বন্ধে আলোচনা করেন। "
তবে জ্যোতিদাদার মৃত্যু উপলক্ষ্যে আয়োজিত কোনও প্রকাশ্য সভা অনুষ্ঠানে তাঁর প্রিয় ভাই রবি যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়না।
----------------------------
ঠিক এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে বাঙালির কাছে জ্যোতিদাদা'র পরিচয়টি কী? 'নষ্টনীড়ে'র বড়ো ভাই অথবা কিছু পণ্ডমেধা বাঙালি লিখনব্যবসায়ীর ধান্দাবাজির খোরাক। হয়তো শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের ছোটোবৌঠানের দিশেহারা স্বামী। আমাদের মনে থাকেনা, সেই ১৮৬৫ সালে তিনি ভাই গণেন্দ্রনাথের সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন 'জোড়াসাঁকো নাট্যশালা', একটি পারিবারিক উদ্যম এবং বাংলার প্রথম প্যারালেল থিয়েটার। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'বিদ্বৎজন সভা' এবং হিন্দুমেলা। বাঙালির প্রথম সামূহিক সেরিব্রাল উদ্যম। অনেক মঞ্চসফল বাংলা নাটক রচনার সঙ্গে অনুবাদ করেছিলেন সংস্কৃত, ইংরিজি ও ফরাসি ভাষার ক্ল্যাসিক সৃষ্টি। বাংলানাটকের সমৃদ্ধ অনূদিত প্রযোজনার পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। একজন খ্যাতনাম গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রী, কম্পোজর এবং শিল্পী। বড়দাদামশায় দ্বিজেন্দ্রনাথের প্রেরণায় বাংলাগানের প্রথম নিজস্ব স্বরলিপি লেখক। সেকালের বিশিষ্ট চিত্রকার। তাঁর আঁকা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতিগুলি আমাদের ইতিহাসের সম্পদ। লালন সাঁইয়ের একমাত্র প্রতিকৃতিটি এঁকেছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রথম বাংলা 'লিটল ম্যাগাজিন', 'ভারতী'। এই বিশেষণটি এইজন্য ব্যবহার করলুম, যেহেতু 'ভারতী' প্রাথমিকভাবে ঠাকুরপরিবারের গৃহপত্রিকা হিসেবে শুরু হলেও তার চরিত্র ছিলো সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক। 'বঙ্গদর্শন' থেকে একেবারে আলাদা আর 'সবুজপত্রে'র পূর্বসূরী।

এসব লিখতে গিয়ে বেশ অবাক লাগছে আমার। ভাবা যায়, জ্যোতিদাদা'র বায়োডাটা লিখতে হচ্ছে এক অধম, অনধিকারী উত্তরসূরিকে। কারণ সে বারম্বার দেখেছে, কথা উঠলে একুশ শতকের সভ্যসমৃদ্ধ বাঙালি বেশ উদাসভাবে প্রায়ই বলে ওঠে,
" জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, হু ??"

(সৌজন্যেঃ অন্যদেশ )


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 7 -- 26
Avatar: i

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

ভালো লাগল খুবই।
Avatar: pi

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

খুব ভালো লাগল।
Avatar: ন্যাড়া

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

বাঃ, পরিশ্রমী লেখা। এবং প্রয়োজনীয়। বাংলা পপুলার কালচারে শিবাংশুবাবু যা লিখেছেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তো রবীন্দ্রনাথের সাইড-কিক হয়ে রইলেন। অথচ ভদ্রলোকের ক্রিয়েটিভ দিক নিয়ে যা আলোচনা হবার, সে আর হল না।
Avatar: avi

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

বড় ভালো লাগলো। জীবনস্মৃতি আর প্রথম আলোর বাইরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিয়ে প্রায় কিছুই জানতাম না।
Avatar: b

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

একটা ক্যাসেট বেরিয়েছিলো "ঠাকুরবাড়ির গান"। সেখানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অনেকগুলি গান (লিরিক+সুর) শুনেছিলাম।


Avatar: b

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

Avatar: prativa

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে নিয়ে তথ্যবহুল লেখার বড় অভাব। লেখাটি সে কারণে বিশিষ্ট। আর উপরি পাওনা লেখার স্বাদু ভঙ্গী।ওনার বাড়ি,বসার বেদী এসবের ছবি দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল।অন্য লেখায় দেখেছি লেখকের ক্যামেরাকে অনেক কথা বলতে।
Avatar: দ

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

ভারী ভাল লেখা। বড্ড ভাল।
কিন্তু ছবি কিছু দেখতে পেলাম না। বোধহয় পাবলিক করা নেই।
Avatar: শিবাংশু

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

অতনু, ডিডি, ইন্দ্রাণী, পাইদিদি, ন্যাড়া, অভী, b, প্রতিভা, দ,

সব্বাইকে অনেক ধন্যবাদ। একটা লিংক রাখলুম। এবার মনে হয় ছবিগুলো দেখা যাবে।

https://goo.gl/photos/aoyBpRmSEPWh3CFh7
Avatar: Blank.

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

খুব ভালো লেখা
Avatar: Rit

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

খুব ভালো। জ্যোতি দাদা কে নিয়ে ভালো লেখা পাওয়াই যায় না। এতো ট্যালেন্টেড একজন মানুষ এভাবে হারিয়ে গেলেন!
Avatar: b

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

এ কি? হারাবেন কেন? বার্লিন দেওয়াল ভাঙার আগেই আমাদের গেঁয়ো ইস্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনে 'অলীক বাবু' অভিনীত হয়েছিলো।
Avatar: সিকি

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

সালটা ভুলে গেছি, সে বছর প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশন হবে কলকাতায়। স্থানীয় কংগ্রেসীরা রবীন্দ্রনাথকে ধরে বসলেন উদ্বোধনী সঙ্গীত লেখার জন্য। রবি বঙ্কিমের লেখা বন্দেমাতরম প্রপোজ করেছিলেন, কিন্তু লোকে চাইছিল শুদ্ধ বাংলায় লেখা একটি গান।

এই সময়ে রবি প্রপোজ করেন জ্যোতিদাদার লেখা আরেকটি গান - চল রে চল সবে ভারতসন্তান।

গানটি প্রায় সিলেক্ট হয়ে গেছিল, এই সময়ে উদ্যোক্তারা পছন্দ করে ফেললেন রবীন্দ্রনাথেরই সদ্যরচিত অন্য একটি গান। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের অধিবেশনে রবির গানটিই গাওয়া হয় - জনগণমন অধিনায়ক জয় হে।
Avatar: b

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

আরে না না। কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন হয়েছিলো ১৮৮৬ সালে। এর পরে ঘুরে ফিরে ছাব্বিশতম অধিবেশন হয় ১৯১১ সালে। জনগণমন তখনি রচনা।
Avatar: Aditi Kabir Kheya

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

আমি লেখাটা পড়ে মুগ্ধ! ভাইয়া, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি বইটা কীভাবে পেতে পারি? আমি ঢাকায় থাকি, কিন্তু যেভাবে হোক জোগাড় করে নেব। আমি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে জানতে অনেক উৎসুক।
Avatar: b

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

আচ্ছা, ইয়ে, শিরোনামে "রাগ পাহাড়ি" কেন?
Avatar: শিবাংশু

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

Blank, Rit, b, siki, aditi,

অনেক ধন্যবাদ,

অদিতি,
বসন্তবাবুর বইটি ছাপা নেই বলেই জানি। খুঁজতে গিয়ে দেখলুম বর্ধমান বি-বি'র বাংলা বিভাগের সংগ্রহে রয়েছে বইটি।

b,
জ্যোতিদাদার পাহাড়প্রবাস বা পাহাড়বাসই ছিলো এই লেখাটির মুখ্য বিষয়। তাঁর জীবনের পাহাড়পর্বের রাগ-অনুরাগ নিয়েই লিখতে চেয়েছিলুম। তিনিই ছিলেন বাংলাগানে প্রথম নোটেশন রচয়িতা। তার সঙ্গে হিন্দুস্তানি পাহাড়ি রাগিনীর কোনও সম্বন্ধ নেই।
Avatar: শিবাংশু

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

অদিতি,
মন্মথনাথ ঘোষ ১৯২৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটি জীবনকথা লিখেছিলেন। মূল্যবান লেখা। লিংকটি এখানে রেখে দিলুম। পড়তে পারেন।

http://dspace.wbpublibnet.gov.in:8080/jspui/handle/10689/15328
Avatar: Harun Al Rashid

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

জ্যোতিরিন্দ্রের দুটো মূল্যবান সাহিত্য কর্মও আছে--

১) পিয়ের লোতির ভারত ভ্রমণের বাঙ্গালা অনুবাদ

২) তিলকের গীতা রহস্যের বাঙ্গালা অনুবাদ


Avatar: ranjan roy

Re: জ্যোতিদাদার পিয়ানো এবং রাগ পাহাড়ির নোটেশন

দামি লেখাটির জন্যে অকুন্ঠ প্রশংসা! লিং টির জন্যেও।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 7 -- 26


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন