উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম
    পর্ব ১: আমরাভণিতা করার বিশেষ সময় নেই আজ্ঞে। যা হওয়ার ছিল, হয়ে গেছে আর তারপর যা হওয়ার ছিল সেটাও শুরু হয়ে গেছে। কাজেই সোজা আসল কথায় ঢুকে যাওয়াই ভালো। ভোটের রেজাল্টের দিন সকালে একজন আমাকে বললো "আজ একটু সাবধানে থেকো"। আমি বললাম, "কেন? কেউ আমায় ক্যালাবে বলেছে ...
  • ঔদ্ধত্যের খতিয়ান
    সবাই বলছেন বাম ভোট রামে গেছে বলেই নাকি বিজেপির এত বাড়বাড়ন্ত। হবেও বা - আমি পলিটিক্স বুঝিনা একথাটা অন্ততঃ ২৩শে মের পরে বুঝেছি - যদিও এটা বুঝিনি যে যে বাম ভোট বামেদেরই ২ টোর বেশী আসন দিতে পারেনি, তারা "শিফট" করে রামেদের ১৮টা কিভাবে দিল। সে আর বুঝবও না হয়তো ...
  • ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনঃ আদার ব্যাপারির জাহাজের খবর নেওয়া...
    ভারতের নির্বাচনে কে জিতল তা নিয়ে আমরা বাংলাদেশিরা খুব একটা মাথা না ঘামালেও পারি। আমাদের তেমন কিসছু আসে যায় না আসলে। মোদি সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক বেশ উষ্ণ, অন্য দিকে কংগ্রেস বহু পুরানা বন্ধু আমাদের। কাজেই আমাদের অত চিন্তা না করলেও সমস্যা নেই ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৪
    আম তেলবিয়ের পরে সবুজ রঙের একটা ট্রেনে করে ইন্দুবালা যখন শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছিলেন তখন তাঁর কাছে ইন্ডিয়া দেশটা নতুন। খুলনার কলাপোতা গ্রামের বাড়ির উঠোনে নিভু নিভু আঁচের সামনে ঠাম্মা, বাবার কাছে শোনা গল্পের সাথে তার ঢের অমিল। এতো বড় স্টেশন আগে কোনদিন দেখেননি ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-৯
    আমি যে গান গেয়েছিলেম, মনে রেখো…। '.... আমাদের সময়কার কথা আলাদা। তখন কে ছিলো? ঐ তো গুণে গুণে চারজন। জর্জ, কণিকা, হেমন্ত, আমি। কম্পিটিশনের কোনও প্রশ্নই নেই। ' (একটি সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা মিত্র) https://www.youtube....
  • ডক্টর্স ডাইলেমা : হোসেন আলির গল্প
    ডক্টর্স ডাইলেমা : হোসেন আলির গল্পবিষাণ বসুচলতি শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি। তখন মেডিকেল কলেজে। ছাত্র, অর্থাৎ পিজিটি, মানে পোস্ট-গ্র‍্যাজুয়েট ট্রেনি। ক্যানসারের চিকিৎসা বিষয়ে কিছুটা জানাচেনার চেষ্টা করছি। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, এইসব। সেই সময়ে যাঁদের ...
  • ঈদ শপিং
    টিভিটা অন করতেই দেখি অফিসের বসকে টিভিতে দেখাচ্ছে। সাংবাদিক তার মুখের সামনে মাইক ধরে বলছে, কতদূর হলো ঈদের শপিং? বস হাসিহাসি মুখ করে বলছেন,এইতো! মাত্র ছেলের পাঞ্জাবী আমার স্যুট আর স্ত্রীর শাড়ি কেনা হয়েছে। এখনো সব‌ই বাকি।সাংবাদিক:কত টাকার শপিং হলো এ ...
  • বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা
    ‘কেন? আমরা ভাষাটা, হেসে ছেড়ে দেবো?যে ভাষা চাপাবে, চাপে শিখে নেবো?আমি কি ময়না?যে ভাষা শেখাবে শিখে শোভা হবো পিঞ্জরের?’ — করুণারঞ্জন ভট্টাচার্যস্বাধীনতা-...
  • ফেসবুক সেলিব্রিটি
    দুইবার এস‌এসসি ফেইল আর ইন্টারে ইংরেজি আর আইসিটিতে পরপর তিনবার ফেইল করার পর আব্বু হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, "এই মেয়ে আমার চোখে মরে গেছে।" আত্নীয় স্বজন,পাড়া প্রতিবেশী,বন্ধুবান্ধ...
  • বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা
    ‘কেন? আমরা ভাষাটা, হেসে ছেড়ে দেবো?যে ভাষা চাপাবে, চাপে শিখে নেবো?আমি কি ময়না?যে ভাষা শেখাবে শিখে শোভা হবো পিঞ্জরের?’ — করুণারঞ্জন ভট্টাচার্য স্বাধীনতা-পূর্ব সরকারি লোকগণনা অনুযায়ী অসমের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন বাঙালি। দেশভাগের পরেও অসমে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রূপ-রুবারু (১)

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

বন্ধুগুলোই জুটেছে সর্বনেশে! বছরে মিনিমাম বারতিনেক পাহাড় বা জঙ্গল। পাড়ার লোকেদের কানাকানি, ওরা না কি বাড়ি ফেরে জামা কাচার জন্যে! শুকিয়ে গেলেই ফের ফুড়ুৎ! পেটের দায়ে নানান শহরে আমি তো নিজেকেই গুঁজে রাখতে ব্যস্ত। অম্বল হাঁপানি ল্যাদচূড়ামণি আমি লোকাল ট্রেনে কোথাও যেতে হলে একসপ্তা ভাবি। তবে হ্যাঁ, হাঁটতে ভালবাসি। খানকতক হাইকিং করা আছে। যা জোটে, খেয়ে ফেলতে পারি। ও, টানা পাঁচদিন হেঁটে অমরনাথ মেরে দিয়েছিলাম বছরদেড়েক আগে। সুতরাং গর্বে আমার বাঙালি-খাঁচা ধকাসপকাস। ২০১২-য় বাপি যেদিন ফোনে বলল, এবারে সুন্দরডোঙা ট্রেকিং – আমিও হুমড়ি দিলাম নেটে। নাঃ, কোথথাও কোনও সলিড ইনফো পেলাম না। রুটটাই এমন। বেশ কঠিন। খুবই কম লোক যায়। নেভার-লেট-ডাউন অরিজিৎদা উৎসাহ দিল, আমরা কেউই নই তেনজিং নোরগে - যতটা পারা যায়, যাওয়া হবে। অনেকটা যেন ‘কাজ নেই, তাই শপিং মলে হাঁটছি’ অ্যাটিটিউড। সেটাই বা মন্দ কি! নির্দিষ্ট মঞ্জিলে গিয়ে পতাকা গাড়তেই হবে, এমন দিব্যি কোনও গাড়ল দ্যায়নি! বরং এই ফাঁকে দেখে নেওয়া যেতে পারে কুমায়নি হিমালয়ের গ্রাম লোকজন খাওয়াদাওয়া।



অবশেষে সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি। টিকিট কেটে ব্যাগ বেঁধে রেডি। ওরা আসছে হাওড়া থেকে ‘বাঘ এক্সপ্রেসে’। আমি বম্বে থেকে দিল্লি হয়ে রাতের ‘রানিখেত’ ধরে ভোর পাঁচটায় কুয়াশামাখা কাঠগোদাম। সিমলার সবুজ আপেল আর চা খেয়ে রেস্ট করছি - ‘বাঘ’ ঢুকে পড়ল হৈহৈ করে। মুহূর্তে জায়গাটা ক্যালব্যালে কলকাতা। কেউ কেউ এরই মধ্যে জড়িয়েছে মাফলার মোজা। বেড়ানো উপলক্ষ্যে সদ্য-কেনা স্পেশাল বেঢপ জিন্স। লগবগে হিলজুতো। ভারতীয় রেল কতটা নরক – তার মূল্যায়ন। আর বগির গায়েই হেলে-পড়ে আনকোরা যুগলের ভান-করা পোজ। এদিকে হোটেল ও গাড়িয়ালারা দে ঝপাং। প্রত্যেকেই জানাচ্ছে, এই ভূখণ্ডে তার লজিং কতটা লজিকাল। কয়েকজনকে শুনে মনে হল, বিবেকানন্দ আলমোরা এসে বুঝি ওই হোটেলেই থাকতেন। আমার সহজাতিরা পইপই বলে নিচ্ছে ব্রেকফাস্টে কাঁচালঙ্কা চিরে সাদা আলুর চচ্চড়ি, দুপুরে ভাতের পাশে ডাঁটাপোস্ত, রাত্তিরে বেশি কিছু না – গরম মশলা দিয়ে মুরগির পাতলা ঝোল! লিপস্টিক লাগিয়েছে-না-খেয়েছে বোঝা-টাফ মহিলাটি জানছে জানলা খুললে মাউন্টেন ভিউ থাকবে কি না, নৈনিতালের অলটিটিউড কেটু থেকে কতটা নিচে, মান্তুছোনার পোশাকে আরও লেয়ার মারা দরকার না কি! বেচারিদের কাছে টুরিস্ট ঈশ্বর – নইলে, দুয়েকটা খুন বিচিত্র নয়। আমরা সাতজন – অরিজিৎ সিনহা (ক্যাপ্টেন), গৌতম চক্রবর্তী (ক্যাশিয়ার), শীর্ষেন্দু নন্দী (ম্যানেজার), বাপি রায়, বাবাই ওরফে অভিজিৎ সেন, চন্দ্রানী ঘোষ আর অধম – অদ্ভুত পোশাক গাম্বাট রুকস্যাক আর তাঁবুর বোঝা ঘাড়ে বেশ বিসদৃশ। পাবলিক খুব একটা ছায়া ঘেঁষছে না। আমরাও নিশ্চিন্তে লেবুচা-জিলিপি সাঁটিয়ে একটা সুমো ধরে বাঘেশ্বরের দিকে। সেখানে সিদ্ধার্থ হোটেলে আমাদের অপেক্ষায় গাইড বলওন্ত সিং।



মাঝরাস্তায় কাঁচীধামে লাঞ্চ সেরে শেষবিকেলে ঢুকলাম সরযূ আর গোমতী নদী-ঘেরা বাঘেশ্বরে। সহাস্য অভ্যর্থনা বলওন্তজির। সঙ্গে ওনার ছোট মেয়ে ও ছেলে। মেয়েটি বছর সতের, দেখে আরও কম মনে হয়। ছেলেটি আরও ছোট। বাবা তাকে র‍্যাকেট ও কর্ক কিনে দিয়েছে। ফুর্তিতে সে দাঁড়াচ্ছেই না। ল্যাকপেকে মেয়েটির চোখে সস্তার ফটোক্রোমাটিক চশমা। দ্যাখা হওয়া মাত্রই দূর থেকে আমাদের ‘নমস্তে’ জানাল। কেমন যেন মনে হল, ওর ছটফটানির সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না দৃষ্টির উচ্ছাস। চুলোয় যাক, কিশোরী নিয়ে ন্যাকামির বয়েস আমার আর নেই। বরং একপ্রস্থ কফির পর ঝরঝরে স্নান। এদিকে সামনের পাহাড়ে বাঘনাথের মন্দিরে, শুনলাম, চিতা বেড়িয়েছে। একটু ঘাবড়েই গেলাম। দুতিনশো ফুট নিচেই রাস্তা বাজার জনপদ। লোকজন বাঘ দ্যাখার চেষ্টায় নানা পাটেকর স্টাইলে ঘাড় উঁচিয়ে। অখণ্ড মনোযোগে বাবাই-ও হাঁ। হটাৎই সকলে উল্লাসে খলবল ‘ওই ওই’! আঁতার মতন আমি ‘কই কই?’ বাবাই দ্যাখাতে থাকে ‘ওই ওপর থেকে লাফিয়ে বাঁদিক ঘেঁষে ডানদিকে’। প্রায়সন্ধ্যার আলোতে কিছুই ঠাহর হয় না। উল্টে বাবাইকেই মেপে নিই, সিরিয়াসলি ঠাট্টায় ওর আন্তর্জাতিক অনার্স। বলওন্তজির সঙ্গে এবার যাওয়া হল বাজারে। পাহাড়ে যা যা পাওয়া যাবে না, অথচ আমাদের ঘোরতর দরকারি, সেইসব জিনিসপত্র কেনাকাটায়। ওঃ, বলতে ভুলেছি, কদিন আগেই মেঘ ফেটে ওপরের বহু জায়গায় সাংঘাতিক ধস ও রাস্তা বন্ধ। (অচানক মেঘ ফাটার হরেক কারণের মাঝে, মনে থাকবে গৌতমদার সন্দেহ, ধুরন্ধর চৈনিক হাত। চীনারা না কি প্রযুক্তিতে দুরন্ত দস্তুর হয়ে ভারতের ওপর ফাটকা খেলছে। আহা, এমন প্লট পেলে সুনীল গাঙ্গুলি শেষবয়েসে একটা মারকাটারি কাকাবাবু নামিয়ে ফেলতেন।) রাস্তা ধসে যাওয়ায় ওপরে কোনও মাল উঠছে না। নিজেদেরই নিয়ে যেতে হবে সব, মায় কেরোসিন-ও। বেশ কিছু খাবারদাবার কলকাতা থেকেই এসেছে। বাকিটাও নিয়ে ফ্যালা হল। মোটঘাট বেঁধে খেয়েদেয়ে অরিজিৎদা ক্যাপ্টেনীয় গাম্ভীর্যে স্বল্প ভাষণ দিল, ট্রেকিঙে কি কি করা উচিৎ অনুচিত ইত্যাদি। আমার বেশ পছন্দের পয়েন্ট ছিল, যখন ক্যাপ্টেন বলল, ট্রেক শুরু হলে স্নান ও প্রয়োজনে দাঁত-মাজাও মানা। অবশ্য ভাষণ শেষের আগেই কয়েকজনের নাক ডাকা শোনা যাচ্ছিল।



যদিও কথা ছিল, পুরোটা গাড়িতে যাওয়ার কথা - জানলাম, ধসের জন্যে গাড়ি রিঠাবগড়ের আগে যাবে না। রিঠাবগড় থেকে খচ্চরে মাল চাপিয়ে পরদিন সকালে শুরু হল আমাদের হাঁটা। এখান থেকে যাব সঙ। আজ রাত সেখানেই বিশ্রাম। বলওন্তজির একটি ভাড়া-নেওয়া ঘর আছে সেখানে। চন্দ্রানী পারিবারিক সিরিয়ালের কায়দায় ভাব জমিয়ে ফেলেছে বলওন্তজির মেয়ের সঙ্গে। আমরাও জেনে ফেলেছি, ওর নাম হংসী। কোঁকড়ানো চুল। অসম্ভব রোগা। ছোট ভাইকে নিয়ে সেই ঘরে ও একা থাকে। করেসপণ্ডেন্সে গ্র্যাজুয়েশন করছে। স্থানীয় একটি স্কুলেও পড়ায়। ভবিষ্যতে বিএড করে পাকাপাকি মাস্টারি করতে চায়। অনন্তন্যাকা জায়গা থেকে উঠে-আসা আমি, যেখানে মায়েরা তিরিশ-পেরনো ছেলেমেয়েদের জাঙিয়া ধুয়ে দ্যায়, আতুপুতু বাঙালিপুঙ্গব তো তাজ্জব! সব্বার আগে তুমুল বকবকিয়ে হংসী চলল। তার উত্তেজনা টগবগাচ্ছে। এতগুলো মাননীয় মেহমান তার ঘরে থাকবে খাবে – সে কি আর ইয়ার্কি! বাবাকে বলে ভরারি বাজার থেকে তুলে নিল কিলোদুয়েক মাংস। অনেকটা গ্যাপ রেখে সকলের পেছনে চলেছি আমি আর বাপি। ধসের জায়গাগুলোয় ক্যামেরা টেরিয়ে স্পেশাল ছবি নিচ্ছে বাপি, যাতে দেখে ওগুলো আরও ভয়াল মনে হয়। আমাকেই গিনিপিগ বানিয়ে দাঁড় করাচ্ছে এক্সট্রা-ঝুরো পাথরের ওপর। তারপর তুলছে আমার ছায়াটা, অনেকটা পান্তোভূতের জ্যান্তছানার মত। আর দৌড়ে গিয়ে সেই বিশ্বজনীন ফটো দ্যাখাচ্ছে অরিজিৎদাকে। অরিজিৎদা যেন টাইমস ম্যাগের আর্ট ডিরেক্টর, এমন মুখ করে বলছে ‘বাঃ! অসাধারণ!’ (প্রসঙ্গত, ইহজীবজগতে কোনওকিছুই মানুষটির কাছে ‘সাধারণ’ নয়।)



বেলা আড়াইটেয় সঙে পৌঁছে দেখি হুলুস্থুলু। গ্রামের কয়েকটি মেয়ে-বৌ ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। হংসী ইতিমধ্যেই ভাতের আয়োজন বসিয়ে ফেলেছে। মাংস কষতে দিয়ে চন্দ্রানী লালচা’র গেলাস নিয়ে সকলকে সেধে বেড়াচ্ছে। মেয়েকে ও চন্দ্রানীকে ধমকেধামকে সরিয়ে বলওন্তজি নিজেই লেগে পড়ল হেঁসেলে। একটাই ঘর ও রান্নাঘর – হংসী পোক্তগিন্নির মত প্ল্যান ছকে ফেলল কে কোথায় শোবে। ঘরটা বেশ খানিক উচ্চতায় হওয়ার দরুন বাথরুমে জল আসে না। মেয়েটি একাই ঢলান বেয়ে নেমে নিচের ঝর্না থেকে তুলে ফেলল সকলের জল। একটু সাহায্য করতে পারি কি না জানতে চাইলে, সে রীতিমত দাবড়ে দিল। এদিকে একঘণ্টা পেরনোর আগেই জনা দশেকের খাবার রেডি। সন্ধ্যের নামখানা লোকাল শিয়ালদায় ঢুকলে মানুষ যেভাবে ঝাঁপায়, গৌতমদা সেই কায়দায় থালার সামনে। বুভুক্ষুর খাওয়া শেষ করে সকলে জিভ এলিয়ে বেরল আশেপাশে ঘুরতে। একাই ল্যাদাড়ু আমি জানলা দিয়ে সামনের পাহাড় দেখতে দেখতে টুক করে ঘুমিয়ে পড়লাম।



লাইট কানেকশন থাকলেও তা শুধু নামেই। প্রায়ই থাকে না, থাকলেও ভোল্টেজ চোখের পোকা মেরে দ্যায়। তাই নিজস্ব প্রয়োজনে টর্চের আলো। বলওন্তজি লম্ফের রোশনিতে বানাল ডিনারের বাঁধাকপি। সঙ্গে বিটনুন-মাখানো পাহাড়ি শসা, যার সাইজ এখানের চালকুমড়োর মতই। ফটাফট রুটি বানাল হংসী। সমস্ত কাজের সময়টা আমরা সকলেই গড়াগড়ি খেলাম। শীর্ষেন্দু ও বাপি পাড়া কাঁপিয়ে দেশোয়ালি গান ধরল। রেহাই পেতে বেচারি বলওন্তজি তাড়াতাড়ি খেতে দিয়ে দিল। ‘অর লিজিয়ে আঙ্কলজি’ হংসী এগিয়ে দিল আরও দুটো রুটি। চমকে দেখি, কখন কে জানে, চশমাটা খুলে রেখেছে ও। বাঁ চোখটা সম্পূর্ণ বোজা। বোঝাই যাচ্ছে, কোটরে কিছুই নেই। ডানচোখে হাসছে মেয়েটা। বুঝলাম, চশমাটা নিতান্তই ছদ্মবেশ। নিজেকে লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।



আমার পেট ভরে গেছিল। খাওয়া-শেষে যে যার জায়গায় শুয়ে পড়লে দরজা খুলে বাইরে এলাম। আহা, কতযুগ এভাবে শরীরে নক্ষত্র ডোবাইনি! হিমজড়ানো হাওয়া। দ্বাদশীর অনাবিল চাঁদ। জ্যোৎস্নার অসংকোচ দুধ যেন কেউ ঢেলে দিয়েছে বিস্তৃত উপুড়স্তন প্রান্তরে। আর ওই দূরতর পাথরের স্তব্ধঊরুখাঁজে, যে যে কৌণিক প্রকাশ চকচক করছে, তা যেন এক জন্মান্ধ তরুণীর জলপোড়াদাগ।

(ক্রমশ)



194 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: ঐশিক

Re: রূপ-রুবারু (১)

সাবলীল লেখা
Avatar: dd

Re: রূপ-রুবারু (১)

ভালো হচ্ছে। তা ছবি টবি নেই ?
Avatar: নির

Re: রূপ-রুবারু (১)

সুন্দর লেখা
Avatar: ranjan roy

Re: রূপ-রুবারু (১)

"আহা, কতযুগ এভাবে শরীরে নক্ষত্র ডোবাইনি! -----------------যে যে কৌণিক প্রকাশ চকচক করছে, তা যেন এক জন্মান্ধ তরুণীর জলপোড়াদাগ।''
এ'রম দুটো লাইন লিখতে পারলে গর্বিত হতাম।
চলুক।
আচ্ছা, ওই 'রুবারু' বোধহয় হিন্দি (ঊর্দূ) 'রু-বরূ' অর্থাৎ 'মুখোমুখি' শব্দটির বঙ্গীকরণ, তাই না?

Avatar: উদয়ন

Re: রূপ-রুবারু (১)

রঞ্জনবাবু,

সত্যি বলতে শব্দটার ঠিকঠাক মানে আমি জানি না। নামকরণ খানিকটা 'রুবারু রোশনি' গানটা থেকে প্রাণিত।

উত্তরের বিলম্ব মার্জনীয়।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন