Salil Biswas RSS feed

salil.biswas@facebook.com
Salil Biswasএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের শিক্ষা দিবস
    গত ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘শিক্ষা দিবস’ ছিল। না, অফিশিয়ালি এই দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বটে, কিন্তু দিনটি শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেদিনই এটা নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ১৭ আর ১৯ তারিখ পরপর দুটো পরীক্ষার জন্য কিছু লেখা ...
  • বহু যুগের ওপার হতে
    কেলেভূতকে (আমার কন্যা) ঘুড়ির কর (কল ও বলেন কেউ কেউ) কি করে বাঁধতে হয় দেখাচ্ছিলাম। প্রথম শেখার জন্য বেশ জটিল প্রক্রিয়া, কাঁপকাঠি আর পেটকাঠির ফুটোর সুতোটা থেকে কি ভাবে কতোটা মাপ হিসেবে করে ঘুড়ির ন্যাজের কাছের ফুটোটায় গিঁট বাঁধতে হবে - যাতে করে কর এর দুদিকের ...
  • ভাষা
    এত্তো ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করি আমরা যে তা আর বলার নয়। সর্বস্ব হারিয়ে বা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যে প্রাণপণ চিৎকার করছে, তাকে সপাটে বলে বসি - নাটক করবেন না তো মশাই। বর্ধমান স্টেশনের ঘটনায় হাহাকার করি - উফ একেবারে পাশবিক। ভুলে যাই পশুদের মধ্যে মা বোনের ...
  • মুজতবা
    আমার জীবনে, যে কোন কারণেই হোক, সেলিব্রিটি ক্যাংলাপনা অতি সীমিত। তিনজন তথাকথিত সেলিব্রিটি সংস্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা সেলিব্রিটি শব্দটাই শুনিনি। বিখ্যাত লোক বলেই জানতাম। সে তিনজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী। মুজতবা ...
  • সতী
    সতী : শেষ পর্বপ্ৰসেনজিৎ বসু[ ঠিক এই সময়েই, বাংলার ঘোরেই কিনা কে জানে, বিরু বলেই ফেলল কথাটা। "একবার চান্স নিয়ে দেখবি ?" ]-- "যাঃ ! পাগল নাকি শালা ! পাড়ার ব্যাপার। জানাজানি হলে কেলো হয়ে যাবে।"--"কেলো করতে আছেটা কে বে ? তিনকুলে কেউ আসে ? একা মাল। তিনজনের ঠাপ ...
  • মকবুল ফিদা হুসেন - জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য
    বিনোদবিহারী সখেদে বলেছিলেন, “শিল্পশিক্ষার প্রয়োজন সম্বন্ধে শিক্ষাব্রতীরা আজও উদাসীন। তাঁরা বোধহয় এই শিক্ষাকে সৌখিন শিক্ষারই অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। শিল্পবোধ-বর্জিত শিক্ষা দ্বারা কি সমাজের পূর্ণ বিকাশ হতে পারে?” (জনশিক্ষা ও শিল্প)কয়েক দশক পরেও, পরিস্থিতি ...
  • আমি সংখ্যা লঘুর দলে...
    মানব ইতিহাসের যত উত্থান পতন হয়েছে, যত বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তার মধ্যে বর্তমানেও যা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এমন কিছু সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শরণার্থী সমস্যা। হুট করে একদিন ভূমিহীন হয়ে যাওয়ার মত আতঙ্ক খুব কমই থাকার কথা। স্বাভাবিক একজন পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে ...
  • প্রহরী
    [মূল গল্প – Sentry, লেখক – Fredric Brown, প্রথম প্রকাশকাল - ১৯৫৪] .......................
  • ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস - একটি বইয়ের প্রেক্ষাপট, উপক্রমণিকা
    ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের তরফ থেকে, বেশ কিছু লেখালিখি একসাথে সাজিয়ে, একটা সঙ্কলন প্রকাশিত হলো।নাম, ইতিহাসের সঙ্কলন, সঙ্কলনের ইতিহাস।একটা উদবেগজনক আর দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে আমরা এই বই প্রকাশ করেছি। সত্যি বলতে কি, এই বইয়ের জন্মের কারণই আমাদের উদবেগ, ...
  • সতী
    সতী : প্রথম পর্বপ্রসেনজিৎ বসুমেয়েটা মাসতিনেক হল এসেছে এই পাড়ায়।মেয়ে ? এই হয়েছে শালা এক মুশকিল ! বিয়ের পর মেয়েরা বউ হয়, কিন্তু ডিভোর্সের পর তারা কি বউই থাকে ? নাকি ফের মেয়ে বনে যায় ? জল জমে বরফ হয়। বরফ গললে আবার জল। কিন্তু এক্ষেত্রে ? ডিভোর্সি মহিলারা ঠিক ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

হরির গল্প

Salil Biswas

এটা দ্বিতীয় বার দিচ্ছি। আগের পোস্টটা ভুলভাল। এখানে ঠিক করে দিলাম।
( আর একটি পূর্ব-প্রকাশিত গল্প। কমলাদি-র কথা বলতে গিয়ে বাস্তবের উপরে একটা আস্তরণ টেনেছিলাম। এই কাহিনীতে স্থান-কাল-পাত্রের নাম শুধু বদলানো হয়েছে। আর কিছু নয়। বাকি ঘটনা প্রায় অবিকৃত। আসুন, আমরা ভাবি, কেমন করে আমাদের সংস্পর্শে তথাকথিত “অপর”-গণকে কেমন করে পরিবর্তিত করে। যে সংস্কৃতি অন্তজ নয়, কেবল স্বতন্ত্র, তাকে বদলে দেবার, সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আছে কি আমাদের? জানি না। )

একটি ছেলে আর একটি লোকের কথা লিখব এখানে। এদের দু’জনের কেউই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নয়। এদের কথা না জানলে কারো কিছু আসবে যাবে না। এখানে একটা ঘটনার কথা বলা হবে। সে ঘটনার মধ্যে তেমন করে যে একটা ‘গল্প’ কিছু আছে তাও নয়। সুতরাং যাঁদের হাতে সময় কম তাঁদের এ লেখার বাকিটা না পড়লেও চলবে। যাঁদের হাতে অঢেল সময় তাঁরা এগোতে পারেন।
গল্প লিখতে বসলেই ঘটনাগুলিকে নাটকীয় করে সাজিয়ে নেওয়াটাই রীতি। তা না করে, সাদামাটা ভাবে কেবল ঘটনার বর্ণনাই দিচ্ছি। তবে, মাঝে মধ্যে দু’একটা মন্তব্য হয়ত করব।

ছেলেটি এই শহরেরই বাসিন্দা। অন্তত সে সময় ছেলেটি কলকাতাতেই থাকত। ছেলেটির নাম, ধরা যাক, হরি। পদবীটা কী তা মনে নেই। বোধহয় তখনও জানতাম না। ওর বাড়ি ছিল বাঘা যতীন রেল লাইনের আশেপাশে যে সমস্ত বস্তি আছে, তারই একটাতে। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক চোদ্দ পনের। রোজ সকালে ছ’টার সময়ে একটা কৌটোয় রাত্রে বানানো গোটা কতক রুটি, আধখানা পেঁয়াজ, অথবা কখনো একটু গুড় বা একটা বাতাসা, নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ত। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসত তিলজলা। সেখানে একটা কলমের কারখানায় তার চাকরি শুরু হত সাড়ে সাতটা থেকে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ সব ঋতুতেই তার এই ছিল, যাকে বলে, রুটিন। সে অর্থে ছুটি বলতে কিছু তার ছিলই না, কারণ, যেদিন কাজ নেই সেদিন মাইনেও নেই, তার চাকরির শর্তই তাই। হরির কাজটা যে খুব কঠিন বা কষ্টসাধ্য ছিল তা নয়। কলমের ঢাকনাতে যে একটা করে ক্লিপ লাগানো থাকে, সেটা তৈরি হয়ে গেলে তাতে কোম্পানির নামটা স্ট্যাম্পিং মেশিন দিয়ে খোদাই করে দেওয়া ছিল তার দায়িত্ব। এই কাজটা করতে হরির মোটেই ভাল লাগত না। সকালে কাজে আসার পথে হরি দেখত, তারই বয়সী অনেক ছেলে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের দেখে হরির বিশেষ কিছু মনে হত না। স্কুলে সে পড়তে পারবে না, এর মধ্যে কোনো ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্ন আছে কি নেই, সে বিষয়ে তার কোনো মতামত ছিল না। এই সব ছেলেদের পোশাকআশাক দেখে অবশ্য তার হিংসে হত। এই ভেবেও হিংসে হত যে এরা নিশ্চয় অনেক ভাল ভাল খাবার খায়। বর্ষার দিনে হরির ভিজতে ইচ্ছে করত না। কারণ সমস্ত দিন ভিজে কাপড়ে থাকতে বিশ্রি লাগে। শীতের দিনে বড় ঠাণ্ডা লাগত হরির। সব চাইতে কম কষ্ট হত গরমের সময়।
কলম কারখানার মালিক লোকটি যে খুব খারাপ লোক ছিল এমন নয়। কর্মচারীদের সঙ্গে সে ব্যবহারও খারাপ করত না। সে শুধু খেয়াল রাখত, কর্মচারীরা যাতে কাজে ফাঁকি না দেয়। তার ধারণা ছিল লোকে সুযোগ পেলেই ফাঁকি দেবে। তার অভিজ্ঞতা তাই শিখিয়েছিল তাকে। সে কখনো এমন কাউকে দেখেনি যে সব সময়ে নিজের কাজ বিশ্বস্ত ভাবে সম্পন্ন করে। কিন্তু কেন সকলেই ফাঁকি দেয়, এ নিয়ে সে কোনো দিনই ভেবে দেখেনি। ছোট ছেলে, কাজেই মাইনে কম পাবে, এটাই নিয়ম। সেই নিয়ম অনুযায়ী হরিকে সে কম মাইনে দিত। যে পরিমাণ কাজ হরি করত তার তুলনায় মাইনের অঙ্কটা যে বড় কম, এ কথাটাও মালিক লোকটি কখনো ভাবেনি। ন’দশ ঘন্টা ওই একঘেয়ে কাজ করতে করতে হরির মনে হত না যে এর চেয়ে ভাল কাজ সে কখনো পেতে পারে।
হরির ছুটি হত সন্ধ্যে ছ’টায়। দুপুরে আধ ঘন্টা টিফিন। ছুটির পর ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে আসত। কাজেই পথে কোনো কিছুই তার মনকে টানতে পারত না। কখনো কখনো ফিরতি পথে তার চোখে পড়ত দু’এক জন সেই সব ছেলেদের যারা সকালে স্কুলে যায়। তখন সেই সব ছেলেরা হয় খেলা সেরে ফিরছে অথবা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। এই সব সময়ে হরির শরীরের-চাইতে-বেশি-ক্লান্ত মনে হিংসে করার মত ক্ষমতাও থাকত না।
বাড়ি ফিরে স্নান করে কিছু খেয়ে হরি চলে আসত স্টেশনের ধারে একটা চায়ের দোকানে। সেই দোকানের উল্টো দিকে একটা পাঁচিলের উপরে বসে খানিকক্ষণ কথাবার্তা চলত সমবয়েসী এবং খানিক বেশি বয়েসী কিছু ছেলের সঙ্গে। বেশির ভাগ সময়েই তাদের কথার বিষয় থাকত সিনেমা। তখনও টিভি জিনিসটা এখনকার মত অতটা ছড়িয়ে পড়েনি বলে হরিকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিনেমার গল্প শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হত। এই ব্যাপারে সে বড় ছেলেদের খুবই হিংসে করত। একটু যারা বড়, তারা মেয়েদের নিয়ে নানা রকম কথা বলত। বস্তির অথবা অন্য জায়গার মেয়েদের সঙ্গে তাদের কী কী ধরণের সম্পর্ক হয়েছে বা হতে চলেছে, এ নিয়ে তারা অনেক কিছু বলত। তারা যে সমস্ত শব্দ এই সব গল্পের মধ্যে ব্যবহার করত তার বেশির ভাগই হরির কাছে কোনো অর্থ বহন করত না, যদিও কথাগুলি শুনে অন্য সকলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেও হাসত। কিন্তু এটুকু সে বুঝত যে এই শব্দগুলির দ্যোতনায় অশ্লীলতা আছে। অবশ্য হরি একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝে উঠতে পারত না। যে কাজগুলি করার মধ্যে শারীরিক আনন্দ আছে, বীরত্ব আছে এবং গর্ব আছে, সে কাজ এই ছেলেরা লুকিয়েচুরিয়ে কেন করে। সংশ্লিষ্ট শব্দগুলিকে গালাগালি হিসাবে ব্যবহার করাই বা হয় কেন। এই গল্পগুলি হরি বাড়িতে বা অন্য বড়দের কাছে কখনোই বলত না। মেয়ে পুরুষ বাচ্চা নির্বিশেষে মুখে মুখে গালিগালাজ ফিরলেও বস্তিতে নৈতিক স্পর্শকাতরতা অত্যন্ত বেশি। নৈতিকতা রক্ষা করে চলা বস্তি জীবনে খুবই মুশকিল বলেই হয়ত এমন হয়।
খুনজখম, মেয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া, যখনতখন পুলিশের হামলাবাজী, কোথাও কিছু হলেই বস্তির সমস্ত সমর্থ লোকজন নিয়ে টানাটানি করার অভ্যাস, জুয়া খেলা এবং তার ফলাফল নিয়ে মারামারি, চোলাই মদের কারবারীদের সঙ্গে পুলিশের আঁতাত, এসব নিয়েও ছেলেরা কথা বলত।
অন্য যে বিষয়টি নিয়ে এই ছেলের দল আলোচনা করত তা হল ‘পার্টি’। এই ‘পার্টি’ বস্তুটি যে কী তা হরির কাছে একেবারেই বোধগম্য ছিল না। ‘পার্টি’ মানে কি একদল ছেলে, যারা কথা দেয় অনেক রকম, কিন্তু পরে কিছু বলতে গেলে দু’টো বাজে কথা শোনায়, গন্ডগোল হলে যাদের কাছে যেতে হয়, যাদের ভয় পেতে হয়, যাদের চাঁদা দিতে হয়? অথচ, এই রকম ছেলে বা লোকের দল আরও আছে, তারা কিন্তু আবার ‘পার্টি’ নয়। ওদের সঙ্গে আবার আসল ‘পার্টি’ মাঝে মাঝে মারামারিও করে। অর্থাৎ , সবটাই খুব দুর্বোধ্য।
মনে পড়ছে আশা করি, শুরুতেই বলেছিলাম, এখানে একটি ছেলে এবং একটি লোকের কথা বলব। এই লোকটির পরিচয় দেওয়া যাক এবার।
সব দিক থেকে আলাদা হলেও, লোকটির সঙ্গে হরির একটা ব্যাপারে বেশ মিল ছিল। ‘পার্টি’ জিনিসটা সম্পর্কে এই লোকটিও বিশেষ কিছু বুঝত না। সব চাইতে আশ্চর্য, লোকটি কিন্তু এ বিষয়ে অনেক পড়াশুনা করেছিল। তবুও নানান ঘটনা, নানান কথাবার্তা, বিভিন্ন কাজকর্ম সে একেবারে কিছুই বুঝে উঠত না।
ধরা যাক, লোকটির নাম পার্থসারথী। পেশায় স্কুলশিক্ষক। বছর পঁয়ত্রিশেক বয়স। বিবাহিত। স্ত্রীও স্কুলে পড়ায়। কোনো কারণে তার ধারণা হয় যে দেশে শিক্ষার প্রসারের জন্য তার কিছু করণীয় আছে। কারণটা অনেকগুলি পরিস্থিতির সমাহারে তৈরি হয়েছিল। তার মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য ছিল সামাজিক চাপ। লোকটি এমনিতে কাজ করতে ভালবাসত না, কিন্তু সে যে শিক্ষক হিসাবে কর্তব্যপরায়ণ, এ কথা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করুক, এই লোভ সামলাতে না পেরে সে মাঝে মাঝে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলত যার জন্যে ভেতরে ভেতরে পস্তালেও তার আর কিছু করার থাকত না। ভালমানুষ হতে চাওয়ার অনেক অসুবিধা।
যাই হোক, পার্থর একটা অনস্বীকার্য গুণ ছিল। কোনো কাজের দায়িত্ব নিলে সে সেটা যথাসাধ্য মন দিয়ে করার চেষ্টা করত। কাজেই এক বন্ধুর সংগঠনের যোগাযোগের সূত্রে যেদিন থেকে সে বস্তির সান্ধ্য অবৈতনিক স্কুলে পড়াবার কাজ নিল, সেদিন থেকে মোটের উপর নিয়মিত ভাবেই সে মেটেবুরুজ অঞ্চলের একটা বস্তিতে সপ্তাহে দু’দিন করে যেতে শুরু করল। কখনো স্বীকার না করলেও (নিজের কাছেও নয়) ওই অঞ্চলে পড়াতে যেতে তার একটু ভয় ভয় করত। তার মনে নিজেরও অজান্তে সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা জমে ছিল। অবশ্য এ কথা না বললে পার্থর প্রতি অন্যায় করা হবে যে সে সচেতন ভাবে সর্বদা চেষ্টা করত এই ধরণের চিন্তাগুলিকে কাটিয়ে ওঠার।
বস্তি অঞ্চলে অবৈতনিক স্কুলের অভাব নেই। প্রায় সব বস্তিতেই কোনো না কোনো সময়ে এই ধরণের স্কুল তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলি উদ্যোগী হয়। সংগঠন গড়ে উঠবে এই আশা নিয়েও কিছু অন্য রাজনৈতিক দল স্কুল খুলতে আসে। বিদেশী টাকা খরচ করার জন্যে কিছু বেসরকারী সংগঠন স্কুল খোলে। এছাড়া, কিছু মানুষ নিতান্তই সদিচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ কাজে নামেন। এই সব প্রচেষ্টার নিশ্চয় অনেক সমাজতাত্ত্বিক কারণ আছে, কিন্তু সে সব নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই। হরি তো নয়ই, পার্থসারথীও সে সব নিয়ে বিশেষ ভাবেনি কখনো।
পার্থর বন্ধুদের স্কুলটি ছিল শেষোক্ত ধরণের। যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা সত্যিই শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যাপারে অনেক রকম চিন্তাভাবনা করত। অনেক কষ্ট করেই তারা স্কুলগুলি চালাত। তাদের সব চাইতে বড় সমস্যা ছিল পড়াবার লোকের অভাব। কাজেই, নতুন কোনো জায়গায় নতুন স্কুল চালু হলেই পুরোনো জায়গা থেকে সেখানে লোক নিয়ে যেতে হত। তাই, আশ্চর্যজনকভাবে হলেও স্থানীয় ‘পার্টি’র একটি ছেলের সহায়তায় বাঘা যতীন রেল স্টেশনের কাছে যখন স্কুল খোলা হল, তখন পার্থ সেখানে চলে যেতে পারল।
এখানেই হরির সঙ্গে পার্থসারথী লাহিড়ীর প্রথম দেখা।

যে কোনো কারণেই হোক, বস্তিগুলিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মহিলারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে বেশি উদ্যোগী। অন্যান্য সব জনকল্যাণমূলক কাজেও এরাই এগিয়ে আসে প্রথমে। বাঘা যতীনেও তাই হয়েছিল। পুরুষরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাবার পথে বরং বাধাই তৈরি করেছিল। যে সমস্ত মহিলা সন্তানদের প্রথমেই পড়তে যেতে উৎসাহ দিয়েছিল, হরির মা তাদের একজন।
স্কুলে আসতে হরির খুব আগ্রহ ছিল না। ওই পাঁচিলের আড্ডা তার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। তাছাড়া, সমস্ত দিন খাটনির পরে আবার আর এক ধরণের ‘কাজ’ নিয়ে বসতেও ইচ্ছে করত না। শরীরেও আর শক্তি থাকত না। কিন্তু মায়ের উৎসাহ এবং তাড়না ছেলেকে শেষ পযন্ত পড়তে আসতে বাধ্য করেছিল। হরির বাবা এই পড়তে আসা বা না আসাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। চাকরি বজায় রাখার পরে হরি কোথায় কী করছে সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। সন্ধ্যের পর মদের ঝোঁকে তার হুঁশই থাকত না বেশির ভাগ দিন। যে সামান্য অর্থ সে উপার্জন করত, তার সিংহভাগই সে সংসারে দিয়ে দিত। মদ খাওয়া ছাড়া কম পয়সায় আর কোনো বিনোদনের কথা সে জানতই না। হরির মা মানসিক ভাবে খুব সুস্থ ছিল না। বস্তি জীবনের জটিলতা, দারিদ্র্যের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই, শারীরিক ক্ষয়, মানসিকভাবে ভেঙে পরা নেশাগ্রস্ত স্বামীর অবহেলা, অজানা উন্নততর জীবনের জন্য অজ্ঞ আকুলতা, সব কিছুর সমাহার তার মনকে ভারসাম্য হারাতে সাহায্য করেছিল।
খালের ধারে সারি সারি ঝুপড়িগুলির মাঝামাঝি জায়গায় বস্তির লোকেরা মিলে ছাউনি দেওয়া একটা দাওয়া মত বানিয়েছিল। সেখানে সাধারণত বস্তির মধ্যবয়স্ক ও বৃদ্ধ লোকেরা সন্ধ্যেবেলা এসে বসত। খালের পচা গন্ধ ও মশার কামড় সত্ত্বেও ওখানে বসে তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলত এবং পারস্পরিক সুখদুঃখের খবরের বিনিময়ে নৈকট্যের সন্ধান করত। হয়ত কিছুটা সফলও হত। রাত্রের সামগ্রিক অন্ধকার ভেদ করে খালের নোংরা জলে ঝুপড়িগুলোয় জ্বলে ওঠা কেরোসিন আর মোমের আলোর প্রতিফলন তাদের তখন হয়ত সুন্দর লাগত।
‘পার্টি’র যে ছেলেটি স্কুল তৈরির কাজে পার্থর বন্ধুদের সহায়তা করেছিল, তারই উদ্যোগে এই চালাঘরটাতে সপ্তাহে দু’দিন স্কুল বসবে ঠিক হয়। ওই দু’দিন ছ’টা-সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে আটটা-ন’টা পযন্ত ছেলেমেয়েরা পড়তে আসবে। পার্থ প্রতি শুক্রবার ওখানে পড়াবে। মঙ্গলবার পড়াবার দায়িত্ব নিয়েছিল সুনন্দা নামে একটি মেয়ে।
ঘটনাচক্রে এক শুক্রবারেই হরির মা ছেলেকে নিয়ে স্কুলে এসেছিল। তখনো ছাত্রসংখ্যা বেশ কম। খুশি হয়েই পার্থ হরির নাম খাতায় লিখে নিল। কথা ছিল, যারা পড়াবে তারা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে ছেলেমেয়েদের পড়তে আসতে উৎসাহিত করবে। বাবা-মায়েদের বোঝাবে কেন পড়তে পাঠানো দরকার। এ ব্যাপারে সুনন্দা বেশ দক্ষ ছিল। পার্থ কিছুতেই সংকোচ কাটিয়ে উঠতে পারত না। তাই, নিজে থেকে ছাত্র পেয়ে সে বেশ খুশি হল। এমন হলে যা হয়, এর পর থেকে হরির প্রতি সে বেশ পক্ষপাতিত্বই দেখাত। সব মিলিয়ে তখন ছাত্রসংখ্যা জনা দশেক।
কিছুদিনের মধ্যে অবশ্য দেখা গেল, যত পক্ষপাতিত্বই দেখানো হোক না কেন, অন্য ছাত্রদের তুলনায় হরি বেশ পিছিয়ে থাকছে। তার মনে রাখার ক্ষমতা যেমন কম, শেখার ইচ্ছা প্রায় নেই বললেই চলে। তার বুদ্ধি বা ধরতে পারার শক্তি যে কম নয়, তার পরিচয় পাওয়া গেল নানা ভাবে। আসলে, ওই চায়ের দোকানের আড্ডার টান, পড়া নিয়ে কয়েকজন বন্ধুর বিদ্রুপ, শারীরিক ক্লান্তি, এই সব হরি কাটিয়ে উঠতেই পারছিল না। তার প্রতি পার্থর বিশেষ মনোযোগও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল।
মূল সংগঠনের সদস্যরা স্কুলগুলি চালানোর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মাসে একদিন আলোচনায় বসত। সেই মাসের আলোচনা বসেছিল রবিবার কফি হাউসে। প্রচণ্ড গরমে সকলেই সেদিন সকাল থেকেই ক্লান্ত। সকলেই তাড়াতাড়ি কথা সেরে বাড়ি ফিরতে চাইছিল।
আলোচনায় ঠিক হল, বাঘা যতীন স্কুলে ছোটদের আকৃষ্ট করতে কিছু অন্য ধরণের কর্মসূচী নেওয়া হবে। তাদের একজন ফটোগ্রাফার বন্ধু একটি চিনা গল্পের ছবিওয়ালা বই থেকে স্লাইড তৈরি করে দিয়েছিল। গল্পটি ছিল সাত বা আট বছর বয়সের একটি চিনা ছেলেকে নিয়ে। দরিদ্র কৃষক বাবার ঋণ শোধ করার জন্য জোতদারের বাড়িতে বেগার খাটতে গিয়ে কীভাবে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেল স্কুলে সহৃদয় শিক্ষকের চেষ্টা সত্ত্বেও, তিরিশটা ছবিতে তারই গল্প বলা হয়েছে।
ছবিতে এই গল্পটি বিভিন্ন স্কুলে দেখিয়ে ভাল ফল পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ছবিগুলো প্রোজেকট্‌র দিয়ে দেখান এবং মুখে মুখে গল্পটি বলেন।
পার্থর অন্য একটি গুণের কথা বলা হয়নি আগে। তার কণ্ঠস্বর ছিল অতি সুন্দর এবং ইচ্ছে করলে সে খুব চমৎকার উচ্চারণে আবৃত্তি করতে পারত। বাঘা যতীনের স্কুলে ছবি দেখিয়ে গল্প বলার দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়েছিল। খুব খুশি মনে না হলেও, সে অরাজী হয়নি। নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে সকলেরই ভাল লাগে, বিশেষ করে সে কণ্ঠস্বর যদি সত্যিই শ্রবণসুখকর হয়।
সুনন্দা ব্যাপারটা ভালই সংগঠিত করেছিল। সেই বুধবার কী কারণে যেন একটা ছুটি ছিল। পার্টি’র ছেলেটি কাকে যেন ধমকে লম্বা তার জোগাড় করে খালের ওপারের একটি দোকান থেকে ‘কারেন্ট’ এনে দিয়েছিল। বস্তিতে বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ তৈরি হল। আসল অনুষ্ঠানের আগে স্থানীয় স্কুলে পড়তে যায় এমন কয়েকটি বাচ্চা কবিতা বলল। একটি ছেলে গান গাইতে উঠে তারস্বরে হিন্দি গান গেয়ে গেল ঈষৎ মত্ত অবস্থায়। তারপরে পার্থ তার গল্প বলা শুরু করল।
চিনা ছবিগুলো আঁকা যেমন ভাল, গল্পটাও তেমনই মনোগ্রাহী। বস্তির সকলেরই গল্পটা বিশেষ করে ভাল লাগবে, সংগঠকদের এই আশা পূর্ণ হল ষোলো আনা। পার্থর বলার গুণেই হোক, দরিদ্র মানুষের প্রতি সহমর্মিতার জন্যেই হোক, অথবা, সাধারণ ভাবালুতার কারণেই হোক, বস্তির সকলেই গল্পটা শুনে এবং দেখে একেবারে মুগ্ধ হল। অনেককে কাঁদতেও দেখা গেল।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বেশ রাত হয়ে গেল। পার্থ তাড়াতাড়ি যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি রওনা হল। পরের দিন এ নিয়ে কথা হবে, কাজ হয়েছে কিনা বোঝা যাবে পরের শুক্রবারেই।

খালের ধার দিয়ে হেঁটে বেশ খানিকটা গেলে তবে স্টেশনের পথে ওঠা যায়। বড় একটা ঝোলায় প্রোজেকট্‌র ইত্যাদি নিয়ে সেই রাস্তা ধরে চলল পার্থ। তাড়াতাড়ি গেলে ট্রেনটা ধরে ফেলা যাবে।
ফাঁকা অন্ধকার রাস্তা। উঁচুনিচু। ভারী প্রোজেকট্‌র নিয়ে হাঁটতে কষ্টই হচ্ছে। হঠাৎ পিছন থেকে কে ডাকল, ‘মাস্টারমশাই!’
‘কে?’ ফিরে দাঁড়াল পার্থ।
‘আমি, মাস্টারমশাই, হরি।’
‘কী রে হরি? কিছু বলবি?’
‘ব্যাগটা দাও আমাকে। তোমার অসুবিধা হচ্ছে।’
‘না, না, ঠিক আছে, অসুবিধা হচ্ছে না। তা তুই কোথায় যাচ্ছিস এই রাতের বেলা?’
‘কোথাও না। তুমি যাচ্ছো দেখে পিছন পিছন চলে এলাম।’ বলতে বলতে পার্থর কাঁধ থেকে ঝোলাটা নিয়ে নেয় হরি। ‘চলো, তোমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসি।’
‘না, না, কোনো দরকার নেই রে! আমি একাই চলে যেতে পারব। রোজই তো যাই।’
কোনো উচ্চবাচ্য না করে হরি পার্থর সঙ্গে হাঁটতে থাকে। খানিকটা চলার পর পার্থ জিগ্যেস করে, ‘কিছু বলবি নাকি রে হরি? কিছু দরকার আছে?’
তাড়াতাড়ি না গেলে ট্রেনটা চলে যাবে। এমনিই দেরি হয়ে গেছে।
কেমন যেন বিস্ময়ভরা কণ্ঠে হরি প্রশ্ন করে, ‘মাস্টারমশাই, যে ভিডিওটা দেখালে সেটা সত্যি?’
‘ভিডিও? ভিডিও আবার কোথায় দেখালাম?’
‘ওই যে গল্প বলছিলে, ওটা ভিডিও নয়?’
‘না রে, প্রথমেই বললাম না, যেগুলো দেখাচ্ছি, সেগুলোকে বলে ‘স্লাইড’, যে যন্ত্রটা দিয়ে দেখাচ্ছি,’ ব্যাগটা দেখায় পার্থ, ‘সেটাকে বলে ‘প্রোজেকটর’, ভুলে গেলি?’
কথাগুলো যেন কানেই যায় না হরির। ‘বল না, মাস্টারমশাই, গল্পটা সত্যি?’
বিপদে পড়ে পার্থ। এই অচতুর বালককে সে কী বোঝাবে! কাকে গল্প বলে, আর কাকে বলে সত্যি, তা কি সে নিজেও জানে? তবু, উত্তর তো দিতেই হবে একটা!
‘দেখ, গল্প এমনিতে মন থেকে বানানো হয়, আবার কিছু গল্প থাকে যেগুলো একটা সত্যি ঘটনা অথবা অনেকগুলো সত্যি ঘটনা দেখে তার সঙ্গে মিলিয়ে বানানো হয়। যেটা তোদের দেখালাম সেটা অনেকগুলো ছেলেকে দেখে তবে লেখা হয়েছে।’
হরি ঠিক বোঝে না। একটু চুপ করে থেকে আবার বলে, ‘চিন দেশটা কোথায় মাস্টারমশাই?’
‘শুক্রবার ম্যাপ নিয়ে এসে দেখিয়ে দেব।’ আরও দ্রুত পা চালায় পার্থ। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
‘ওখানকার লোকেরা কি আমাদেরই মতন, মানে, আমাদের মতই গরিব?’
‘অতটা নয়।’
‘তাহলে ওরাও পড়তে যেতে পারে না কেন?’
‘আসলে এই গল্পটা যখনকার, তখন ও দেশের লোক আমাদের মতই, বা আমাদের চাইতেও গরিব ছিল। তাই সবাই পড়তে যেতে পারত না। এখন ওদের দেশে সকলেই পড়তে যেতে পারে।’
‘আমাদের দেশে পারে না কেন?’
উত্তর খুঁজে পায় না পার্থ। শুধোয়, ‘গল্পটা তোর খুব ভাল লেগেছে, না?’
‘হ্যাঁ, মাস্টারমশাই,’ হরির গলায় খুশির না দুঃখের সুর ঠিক বোঝা যায় না। কৌতূহল হয় পার্থর। স্লাইডগুলি দেখানোর ফল তাহলে ভালই হবে।
‘কেন এত ভাল লাগল রে?’
‘ছেলেটা ঠিক আমার মত যে!’
পার্থ দাঁড়িয়ে পড়ে। যা মনে হয়েছিল তার চাইতে বেশি কিছু যেন জড়িয়ে আছে ঘটনাটার মধ্যে!
হরি দাঁড়ায় না। বলে, ‘চলুন মাস্টারমশাই, আপনার ট্রেন এসে পড়বে।’
আবার হাঁটতে থাকে দু’জনে।
‘ঠিক তোর মত কী রকম?’
‘আমিও তো গ্রামের স্কুলে যেতাম। আমরা এখানে এলাম তো পালিয়ে!’
‘পালিয়ে মানে?’
‘পরে বলব মাস্টারমশাই, শুক্কুরবারে। আপনার ট্রেন এসে গেছে।’
খেয়াল করেনি পার্থ, তারা স্টেশনে পৌঁছে গেছে। ট্রেনটাও আসছে। দৌড়ে প্ল্যাটফর্মে উঠে পড়ে সে। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে পার্থ দেখে, হরির অপসৃয়মান চেহারা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
পরের শুক্রবার এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে পার্থ বিদেশী একটা খুব নাম করা ছবি দেখতে গিয়ে স্কুল কামাই করতে বাধ্য হল। তার পরের শুক্রবারটা পার্থর স্কুল ছুটি থাকায় সারা দিন বাড়ি থেকে বেরোনোই হল না। ফলে দু’দিনই বাঘা যতীনের স্কুলেও তার যাওয়া হল না। মাঝে মাঝে তার না আসায় স্কুলের সকলেই অভ্যস্ত। কেউ কিছু বলল না। কেবল, হরি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল পার্থর জন্য।

তার পরের শুক্রবার স্কুলে এল পার্থ। হরির কথা তার মনে ছিল না। তাকে দেখে পার্থর মনে পড়ল, ও যেন কী বলবে বলেছিল। সমস্ত সন্ধ্যেটা হরি ওর প্রায় গায়ের উপরে বসে রইল। বোঝাই যাচ্ছিল, কিছু বলার জন্যে ও আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। সেটা বুঝে সময় হওয়ার প্রায় আধ ঘন্টা আগে পড়ানো বন্ধ করে দিল পার্থ।
প্রচলিত ধারণা হল, ছোটরা পড়তে ভালোবাসে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে কথাটা হয়ত অনেকটাই সত্যি। কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে এই ধরণের স্কুলগুলোতে, প্রায় সব সময়ে উল্টোটাই ঠিক। এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করে পার্থ খুবই অবাক হত। তবে স্কুলে আসার তাগিদটা যে সব সময় শিক্ষায় আগ্রহের কারণে নয়, তা বোঝাই যেত। অন্য পরিবেশ, অন্য কথা, অন্য মুখ, অন্য পোশাক, ছেলেমেয়েদের চোখে অন্যতর কোনো পৃথিবীর একটা আবছা রূপ এনে দিত বলেই হয়ত তারা স্কুলে এসে বসতে চাইত। এটা বুঝতে পেরে পার্থ কোনো বিচিত্র কারণে খানিকটা নিশ্চিন্ত বোধ করত, নিজেরও অজ্ঞাতসারে। তবে এ নিয়ে পার্থ যে খুব আত্মবিশ্লেষণ কখনো করেছিল তা নয়।
একটা ব্যাপারে অবশ্য পার্থ কিছুটা গ্লানি অনুভব করত। সুনন্দা যেমন খুব সহজে বস্তির যে কোনো বাড়িতে ঢুকে যেতে পারত, সকলের সঙ্গে বসে খেতে পারত, যে কোনো বাচ্চাকে কোলে তুলে নিতে পারত, পার্থ তা কিছুতেই পারত না। অনেক চেষ্টা করেও সে সুনন্দার মত সহজ হতে পারেনি। আসলে, পার্থ বস্তির নোংরা পরিবেশে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করত। সত্যি বলতে কি, তার রীতিমত ঘেন্নাই করত। অথচ, আলাদা করে এক একজন ছাত্র বা ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পার্থর কোনো অসুবিধা হত না।
তবে এই একলা কারো নিকট হতে পারা আর দলের মধ্যে বা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে আদানপ্রদান করতে না পারা পার্থর স্বভাবই ছিল। কোথাওই সে এইভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারত না। সুতরাং, বস্তিবাসীদের প্রতি তার কোনো রকম ঘৃণা বা অবহেলা ছিল, এমন কথা বলা যাবে না। নিজের চরিত্রের এই সমস্যার কথা পার্থ জানত। কিন্তু এবিষয়ে কিছু করা উচিত কি উচিত নয়, তা নিয়ে সে কখনো বিশেষ চিন্তা করেনি।
হাঁটতে হাঁটতে পার্থ আর হরি এসে বসেছে প্ল্যাটফর্মে একটা বেঞ্চে। খুব একটা বিশেষ লোকজন নেই আজ স্টেশনে। হরি দু’ভাঁড় চা নিয়ে এসেছে। দাম দিতে গেলে হরি বলেছে, আমি তো চাকরি করি, মাস্টারমশাই, এক ভাঁড় চা আপনাকে আমি খাওয়াতে পারব।
‘বল, কী বলবি বলছিলি বল।’
‘জানো, মাস্টারমশাই ’, বলে হঠাৎ চুপ করে যায় হরি। কেমন যেন লজ্জা তাকে চেপে ধরে।
পার্থ চুপ করে থাকে। বেশ কিছুদিন দু’ধরনের স্কুলে পড়াবার অভিজ্ঞতা তাকে একথা অন্তত বুঝিয়েছে যে ছোটদের জোর করে কিছু বলানো যায় না, তাদের নিজে থেকে বলতে দিতে হয়।
দু’এক মিনিট চুপ করে থেকে হরি তার গল্প বলতে লাগল। ঠিক এরকম গুছিয়ে ও কথাগুলো বলেনি। এখানে আমরা ওর কথাগুলো একটু সাজিয়ে নিচ্ছি। সাজিয়ে নেওয়াটা ঠিক কিনা, সে বিষয়ে আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, কিন্তু বাস্তব যেমন ঠিক তেমন করে গল্পে তার উপস্থাপনা করা তো প্রায় অসম্ভব। বা, আদৌ সম্ভব নয় হয়ত।
‘আমি একটা ইস্কুলে পড়তে যেতাম। আমাদের পাশের বাড়িতে বড় দিদিমণি থাকতেন, এক একদিন ওঁর পেছন পেছন হেঁটে যেতাম। পুকুরটার পাশে পৌঁছলেই এক ছুটে ওকে পেরিয়ে চলে যেতাম। মা খুব বকত, বলত ওরকম ছুটিস কেন, দিদিমণি রাগ করবেন। দিদিমণি একটুও রাগতেন না, মজা পেতেন আমার ভয় পাওয়া দেখে।
‘তারপর কী কী যেন হল, একদিন রাতে বাবা ছুটে এসে ঘরে ঢুকে রান্নাঘরের পিছনে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল, একদল লোক হুড়মুড় করে এসে বাড়িতে ঢুকল, মাকে খুব গালাগালি করতে লাগল, আমি মায়ের পিছনে ভয়ে শিটিয়ে রইলাম, মা-ও খুব ভয় পেয়েছিল, কিন্তু বাবা যে লুকিয়ে আছে তা বলল না কিছুতেই। যারা এসেছিল তার মধ্যে বাবার কয়েকজন বন্ধুও ছিল, তারাও একই রকম চিৎকার করে গাল দিচ্ছিল। শেষকালে বিছানাপত্র, বাসনকোসন উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে, ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়ে, মাকে একটা থাপ্পড় মেরে, আমার কান ধরে হিঁচড়ে টেনে ওরা চলে গেল। যাবার সময়ে বলে গেল, বাবা এলেই যেন ওদের অফিসে যায়, নাহলে ওরা বাড়ি জ্বালিয়ে দেবে আর মাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ন্যাংটো করে গাঁ ঘোরাবে আর আমার ছোট বোনটাকে বেচে দেবে। বাবাকে তো কেটে ফেলবেই।
‘বোনটা কাঁদছিল। অনেকক্ষণ মা ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। আমি বুঝতে পারছিলাম, মা ঠকঠক করে কাঁপছে। তারপরে কোন রকমে নড়েচড়ে উঠে মা জিনিস গোছাতে লাগল। আমিও হাত লাগালাম। বাবা আর আসে না। অনেকক্ষণ পরে, যখন আর কোনো লোকের সাড়াশব্দ নেই, তখন চুপি চুপি বাবা ঘরে ফিরে এল। আমরা খুব কাঁদছিলাম। বাবা বলল, কিছু করার নেই, এক্ষুনি এখান থেকে পালাতে হবে। মা বলল, কী হয়েছে? বাবা বলল, সে অনেক কথা, পরে বলব, এখন চল, যেতে হবে। মা বলল, কোথায় যাবে, সব ফেলে, কি করে যাবে এভাবে। বাবা হঠাৎ রেগে মাকে বিচ্ছিরি একটা গালাগাল দিল, আছেটা কী যে ফেলে যেতে হবে বলে কাঁদছিস, চল, চল, নাহলে মর এখানে।
‘এক ঘন্টার মধ্যে কয়েকটা পুঁটলিতে যা পারা যায় বেঁধে নিয়ে আমরা মাঠের মধ্যে দিয়ে অন্ধকারে লুকিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে স্টেশনে চলে এলাম। তখন অনেক রাত। কোনো ট্রেন নেই। স্টেশনের একপাশে একটা বেঞ্চির উপরে বসে কাঁপতে কাঁপতে ভোর অব্দি কাটলো। তারপরে একটা ট্রেন আসতেই সেটাতে আমরা উঠে পড়লাম। মা কোনো কথা না বলে চুপচাপ কাঁদছিল। বাবা ঘন ঘন বিড়ি টানছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম খুব খারাপ কিছু ঘটেছে, তাই একদম চুপ করে ছিলাম।
‘কতক্ষণ পরে তা মনে নেই, আমরা শিয়ালদা এসে নামলাম। প্রথম ক’দিন ওই প্ল্যাটফর্মেই আমাদের দিন কাটল। তারপর বালিগঞ্জে আমাদের এক কাকার ঘরে এলাম আমরা। সেখানে একটুও জায়গা ছিল না। রোজ সকালে বাবা কাকার সঙ্গে বেরিয়ে যেত। কাকিমা মাকে অনেক কিছু বলত। মাঝে মাঝে গালাগাল দিত। ভাল করে খেতে পেতাম না। আমরা অবশ্য সারা দিন খেলে বেড়াতাম। নতুন জায়গায় এসে আমাদের ভালই লাগছিল। ঘরের সামনের ট্রেন লাইনে সারা দিন বড় বড় ট্রেন যেত। ওই সময়গুলোতে মা আমাদের বাইরে যেতে মানা করত। প্রথম ক’দিন ভয় পেলেও তার পরে আমরা ট্রেন দেখতে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
‘বাবা তখন কাজ শিখছিল কাকার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে। মোজেইকের কাজ। কিছুদিন বাদে বাবা কাকারই চেষ্টায় কাজ পেয়ে গেল একটা সিংক তৈরির কারখানায়। মোজেইক ঘসে ঘসে সমান করার কাজ। খুব কম মাইনে। আমরা তারপরে একটা ঘর জোগাড় করে উঠে এলাম এখানে। কারখানাটা খুব বেশি দূরে নয় এখান থেকে। কাজটা প্রথম থেকেই বাবার ভাল লাগত না। সারা জীবন চাষের কাজ করেছে তো। কিন্তু কী করা যাবে। এই যে বাবা আজকাল এত মদ খায়, মাকে মারে, গাল দেয়, বাবা এমন ছিল না। যত দিন গেছে বাবা এমন হয়ে গেছে।
‘এভাবেই চলল কিছুদিন। আমি কিছুটা বড় হতেই আমারও একটা কাজ জুটে গেল। যে কলম কারখানায় এখন কাজ করি সেখানেই ঘর ঝাঁট দেবার কাজ। তারপর একসময় মালিকের নজরে পড়লাম, একটু একটু করে কাজ শিখলাম, এখন তো আমি ওখানে বেশ পুরোনো লোক।
‘আমার, জানেন মাস্টারমশাই, পড়তে খুব ভাল লাগত। ওই যে স্কুলে যেতাম, বড়দিমণির পিছন পিছন, সারাদিন দিদিমণিরা পড়াত, খুব ভাল লাগত। কিন্তু সব গেল। এখন আমার একদম পড়তে ইচ্ছে করে না। আর কী হবে বলুন পড়ে, এই তো একটা চাকরি করছি, কী দরকার আবার ঝুটঝামেলা। আপনি পড়ান, ভিডিও দেখান, এগুলো বেশ লাগে। কিন্তু কিচ্ছু আর পড়তে ভাল লাগে না।’
চুপ করল হরি। পার্থও চুপ। কীই বা বলবে।
‘একটা কথা বলবেন মাস্টারমশাই ’, হরি তাকায় পার্থর দিকে। ‘কেন এমন হয়েছিল আমাদের? আমাদের গাঁয়ে তো জোতদার ছিল না? ওই দেশে না হয় বদমাশ জমিদার ছিল, ওই ছেলেটাকে জোর করে চাকর করে নিল, কিন্তু আমাদের তো তেমন হবার কথা নয়, তাহলে? আমাদের কেন ওরকম করল ওরা?’
চুপ করেই রইল পার্থ। বলবে কী করে এই বালককে, আজ জোতদার জমিদারের জায়গায় জুড়ে বসেছে ক্ষুদে রাজামহারাজার দল, যারা ধান্ধাবাজী ছাড়া কিছু জানে না, যাদের লোভের কাছে, ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে ছাড়া, হয়ত বা নির্বাচনের প্রহসনের কাছে ছাড়া, কোথাও কোনো আনুগত্য নেই। কী করে বোঝাবে সচেতনভাবে প্রোথিত করে দেওয়া এই সামাজিক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশের চেহারা কেন এমন হয়ে উঠেছে। তার নিজের কাছেও তো সব কিছু স্পষ্ট নয়।
দুজনে চুপ করে বসে রইল। দুই প্রান্তে অবস্থানকারী দুটি মানুষ।
একটু পরে ট্রেন এসে পড়ল। দেরি হয়ে গেছে বেশ। পার্থ চলে এল।
সারা সপ্তাহ হরির কথাগুলো ঘুরতে থাকল পার্থর মাথায়। স্কুলে পড়ালেও এবং বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে কিছু ধারণা হয়ে থাকলেও, সামাজিক ন্যায়অন্যায় নিয়ে পার্থ যে খুব কিছু ভাবত তা নয়। যখন ছবি দেখিয়ে গল্প বলত, যখন ক্লাসে কিছু ঘটনা ব্যাখ্যা করত, তখন কিছুটা ভাবাবেগ, কিছুটা সহজাত সহানুভূতি তাকে নাড়া দিত। কিন্তু এবিষয়ে কিছু করা যেতে পারে ব্যক্তিগত স্তরে, এমন কথা প্রায় কখনই তার মাথায় আসেনি। তাছাড়া, বইয়ে যা পড়া যায় তার সঙ্গে বাস্তবের মিল কতটা থাকতে পারে অথবা আদৌ থাকতে পারে কিনা এবিষয়েও তাত্ত্বিক ধারণার বেশি কিছু পার্থর ছিল না। বলতে গেলে এই প্রথম সে বইয়ে পড়া একটি বিবরণের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার প্রত্যক্ষ মিল দেখতে পেল। স্বভাবতই, প্রকৃতিবিরুদ্ধভাবে হলেও, পার্থ খুবই বিচলিত বোধ করছিল। তাছাড়া, ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও, সে হরির প্রতি এক ধরনের টান অনুভব করতে শুরু করেছিল। যদিও কোনো ব্যক্তির প্রতিই তার মনে এর আগে প্রকৃত কোনো গভীর অনুভূতি তৈরি হয়নি। তার পরিবারের প্রতিও নয়। অথচ মানুষ হিসেবে সে নিজেকে যথেষ্টই সংবেদনশীল বলে মনে করত।
যত দিন গেল পার্থ ততই বিচলিত বোধ করতে লাগল। অনেক চেষ্টা করেও সে পুরো ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারছিল না। শেষে, একদিন স্কুলে বসে টিফিন খেতে খেতে তার মনে একটা পরিকল্পনা দানা বাঁধল। হরির ঘটনাটা সকলকে জানানো দরকার বলে মনে হল তার এবং জানাবার একটা উপায়ের কথাও সে ভেবে ফেলল। যদিও, জানিয়ে কী লাভ হবে অথবা লোকে জানতে আদৌ চাইবে কিনা, এবিষয়ে সে বিশেষ কিছু ভাবনাচিন্তা করতে পারল না। চাইলও না হয়ত।
পরিকল্পনাটা নিয়ে পার্থ প্রথম যার সঙ্গে আলোচনা করল, সে পার্থর এক ফটোগ্রাফার বন্ধু। এই লোকটিকে সে নিজের বন্ধু বলে কেন মনে করত তাও পার্থর কাছে খুব স্পষ্ট ছিল না। নিখিল খুব বুদ্ধিমান বা শিক্ষিত না হলেও বেশ চতুর ছিল এবং তার মন্তব্য ছিল রীতিমত বাস্তবসম্মত।
‘তুমি যা করতে চাইছ তা হল একটা সিনেমা তোলা। হরি হবে তার মূল চরিত্র, তাই না?’
‘তা বলতে পার।’
‘এই প্ল্যান ছাড়ো।’
‘কেন?’
‘এক তো এ তোমার কম্ম নয়, আর, এ কাজ করতে গেলে তুমি বিপদে পড়ে যাবে।’
নিখিল নিজে একটা ছোট কারখানার মালিক। এব্যাপারে তার অনেক অভিজ্ঞতা আছে, তা পার্থর জানা ছিল। কিন্তু, ‘এ তোমার কম্ম নয়’ এই মন্তব্য পার্থকে বিরক্ত করল। সে ঠিক করে ফেলল, কাজটা সে করবেই।

পরের দিন স্কুলে পৌঁছে হরির সঙ্গে দেখা হল না। আরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করার মত ধৈর্য ধরতে পারল না পার্থ। পরের দিন, একটু দেরি করে সে হরির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল। হরি বাড়িতেই ছিল। দুজনে এসে একটা চায়ের দোকানে কথা বলতে বসল।
একটু ইতস্তত করে পার্থর প্রস্তাবে হরি রাজী হয়ে গেল। প্রস্তাবটা হল, পার্থ হরির কারখানায় গিয়ে কিছু ছবি তুলবে, হরি এখন কী কাজ করে সেটা দেখাবার জন্যে। কোন পরিবেশে তাকে থাকতে হচ্ছে তা দেখাবার জন্যে। সেই সঙ্গে হরির বাড়ি, হরির বাড়ির লোকজন সকলের ছবি তোলা হবে। হরির ছোটবেলা দেখাবার জন্যে কিছু গ্রামের ছবিও তুলবে পার্থ। তারপর সেগুলোকে সাজিয়ে নিয়ে স্লাইড দেখিয়ে গল্প করে বলবে পার্থ সকলকে, সকলে জানবে কেমন করে হরি আর তার পরিবারকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছিল, কেমন করে হরির লেখাপড়া বন্ধ হয়েছিল।
ঠিকানা জেনে নিয়ে পরের সোমবার পার্থ গিয়ে উপস্থিত হল তিলজলার সেই কারখানায়। দিনটা সে ছুটি নিয়েছিল স্কুল থেকে।
মালিক লোকটি থাকে কারখানারই উপরে। সে পার্থকে দেখে বেশ অবাক হল। এই ধরনের লোক তার কাছে বড় একটা আসে না। তার ঘরের দরজাতে দাঁড়িয়েই সে কথা বলল পার্থর সঙ্গে। ভেতরে ঢুকতে বলার কথা তার মনেই এল না সম্ভবত।
পার্থর প্রস্তাব শুনে তার মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল।
‘আপনি কোন খবরের কাগজ থেকে এসেছেন?’
‘খবরের কাগজ কেন হবে, আমি হরির মাস্টারমশাই।’
‘মাস্টারমশাই? হরি আবার স্কুলে পড়ে নাকি?’
পার্থ তাকে বস্তির স্কুলের কথা বোঝাবার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কথা লোকটির মাথায় ঢুকল না। কথাটা শুনে তার মুখ আরও বিরক্ত ও গম্ভীর হয়ে উঠল। তার মনে হল, এধরনের কাজ করে নকশালরা এবং এই লোকটি নিশ্চয় কোনো মতলবে এসেছে। ইউনিয়ন-টিউনিয়ন করার উদ্দেশ্য আছে নিশ্চয়। অথবা হয়ত কোনো সরকারী দপ্তরের লোক, কিছু না কিছু খুঁত ধরতে এসেছে। তার খাতাপত্তর বা কাজের সময় এবং মাইনে দেওয়ার হার নিয়ে ফ্যাচাং বাধাতে এসেছে।
‘এখানে ওসব ছবি-টবি তোলা যাবে না।’
পার্থ তাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করল, তার কোনো মতলব নেই। ছবি ব্যবহার করা হবে খুব নির্দোষ কাজে। কথাগুলো লোকটি কিছুই বুঝল না, এবং ক্রমশ তার রাগ বাড়তে লাগল। পার্থর চেহারা ইত্যাদি দেখে সরাসরি কোনো অভদ্রতা না করলেও, সে বেশ রুক্ষ ভাবেই বলে দিল, সে ছবি তুলতে দেবে না এবং বেশি কথা বলার তার সময় নেই। এই কথা বলে পার্থর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল সে।
কী আর করা! নিচে নেমে এল পার্থ। ছবি তোলা তাহলে হল না। অন্য কোনো পদ্ধতি বার করতে হবে হরির গল্প সকলকে জানাবার। সারাটা দিন এখন কী করা যায়! ক্যামেরা ঘাড়েই পার্থ একটা সিনেমা দেখার জন্য তৈরি হল। আগামী কাল সন্ধ্যের সময় হরির সঙ্গে কথা বলতে হবে।
স্কুলের দাওয়ায় যখন পার্থ পৌঁছল, তখন সাতটা বাজে। কেউ তখনও সেখানে এসে বসেনি। আসার কথাও নয়। আজ স্কুল নেই। এখানকার লোকেরা এখানে আটটা সাড়ে আটটার আগে কেউ আসে না।
হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল একটা বাচ্চা ছেলে। ছেলেটি স্কুলে আসে, কিন্তু তার নামটা মনে নেই পার্থর।
‘মাস্টারমশাই, এক্ষুনি পালিয়ে যাও তুমি।’ ছেলেটার গলায় বেশ উদ্বেগ।
‘কেন রে?’ মজা লাগে পার্থর।
‘হরির বাবা না, ভীষণ মদ খেয়েছে, খেয়ে চেঁচাচ্ছিল, কোথায় গেল ওই মাস্টারটা, বেটাকে প্যাঁদাবো!’
‘সে কি রে! আমি আবার কী করলাম!’
‘ও! তুমি জানো না? তুমি নাকি কী করেছো, তাই হরির চাকরি গেছে, আর তাই তো ওরকম ক্ষেপে গেছে ওর বাবা! তাই তো মারবে তোমাকে!’
হঠাৎ যেন বুকের মধ্যেটা খালি হয়ে যায় পার্থর। এমন যে হতে পারে, তা তো তার মনেও আসেনি। মালিক লোকটি যে হরির কোনো ক্ষতি করতে পারে ভয় পেয়ে গিয়ে, তা তো ভেবে দেখেনি সে। লোকটা ভেবেছে, হরি কোনো গোলমাল পাকাবার জন্যে লোক ডেকে এনেছে, কাজেই হরিকে সে বরখাস্ত করেছে। এই সম্ভাবনার কথাই কি নিখিল বলতে চেয়েছিল?
কী হবে এখন? হরির চাকরির দাম ওর পরিবারের কাছে কতটা, সে সহজেই বোঝা যায়। ওর বাবার রাগ হওয়াটাও খুব স্বাভাবিক। এক্ষুনি তাহলে ওঁর সঙ্গে কথা বলা দরকার।
ইতিমধ্যে বাচ্চা ছেলেটা পালিয়েছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না পার্থ। হরির বাড়িটাও সে চেনে না। তবু, একবার চেষ্টা করা যাক খুঁজে বার করার।
উঠে দাঁড়ায় পার্থ। এগোতে যাবে, পেছন থেকে হরির গলা পাওয়া যায়, ‘মাস্টারমশাই!’
‘হরি ’, কি বলবে ভেবে পায় না পার্থ। হরির মুখে অবশ্য বিশেষ হেলদোল নেই। ‘শোনো, হরি, চলো, একবার তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলে আসি। উনি খুব রেগে আছেন।’
‘আপনি ক্ষেপেছেন নাকি! এখন বাবার সঙ্গে দেখা করে কী হবে? সে কি এখন জ্ঞানে আছে? কেবল বাজে বকছে!’
‘না, মানে, আমার জন্যেই তো এমন হলো, আমার কিছু বলা উচিত ওঁকে।’
‘না, না, কিচ্ছু বলতে হবে না। এখন আপনাকে দেখলে এক গাদা ভালমন্দ বলবে বাবা, সে আমার সহ্য হবে না।’
‘তবুও !’
‘ছাড়ুন তো! আর ওই চাকরি? ওরকম চাকরি আমি আবার কালই পেয়ে যাব। সারাক্ষণই তো আমাদের চাকরি যাচ্ছে! ও কিছু নয়।’ হরির গলায় কিসের সুর ঠিক বুঝতে পারে না পার্থ। এতই কি সহজ চাকরি পেয়ে যাওয়া! পার্থ খুব ভাল করেই বোঝে, হরি তাকে আগলাবার চেষ্টা করছে, অপমানের হাত থেকে, নিজের কাছে দোষী হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে।
‘ভাববেন না, মাস্টারমশাই, ও কিছু নয়।’ একটু যেন কেঁপে যায় কিশোরের কণ্ঠস্বর।
অন্ধকার রাস্তা। খালের পাড়ে এই মুহূর্তে লোক চলাচল নেই। পার্থ এগোয় স্টেশনের দিকে। অন্য একটা পৃথিবীর অচেনা ছবি তাকে বিভ্রান্ত করে তুলতে থাকে। তার পরিচিত জগতের সঙ্গে সে-পৃথিবীর কোনো মিল নেই। কোথাও কি কোনো যোগসূত্র নেই! এবড়োখেবড়ো অন্ধকার রাস্তা দিয়ে সন্তর্পণে চলতে চলতে পার্থ বড়ই বিভ্রান্ত বোধ করে। কী করবে সে এখন?


1 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Ishan

Re: হরির গল্প

কোন লেখাটা মুছতে হবে একটু জানাবেন। মানে, যদি আদৌ মুছতে হয়।
Avatar: salil biswas

Re: হরির গল্প

Eta not. Er obbobohito agerta. Chokh bolalei bujhte parben. Khapchhara. Ar ei ta te jemon bola achhe. Eta dwitiobar deoa, Ota te ta mei.
Avatar: Salil Biswas

Re: হরির গল্প

Avatar: দ

Re: হরির গল্প

পড়লাম।
হরির এরপর আর কোনও খবর জানেন? বড় হওয়ার পর?
Avatar: aranya

Re: হরির গল্প

কষ্টের গল্প
Avatar: Salil

Re: হরির গল্প

না, সে খবর জানি না ... আর কখনো দেখা হয়নি। পরে যে কয় বার ওখানে গেছি, ওর সঙ্গে দেখা হয়নি ...


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন