ঈশান RSS feed

আর কিছুদিন পরেই টিনকাল গিয়ে যৌবনকাল আসবে। :-)

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের দুর্গা পূজা
    ছোটবেলায় হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন আসছি্ল সব প্রতিমার মুখ দক্ষিন মুখি হয় কেন? সমবয়সী যাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম সে উত্তর দিয়েছিল এটা নিয়ম, তোদের যেমন নামাজ পড়তে হয় পশ্চিম মুখি হয়ে এটাও তেমন। ওর জ্ঞান বিতরন শেষ হলো না, বলল খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করে পুব মুখি হয়ে আর ...
  • দেশভাগঃ ফিরে দেখা
    রাত বারোটা পেরিয়ে যাওয়ার পর সোনালী পিং করল। "আধুনিক ভারতবর্ষের কোন পাঁচটা ঘটনা তোর ওপর সবচেয়ে বেশী ইমপ্যাক্ট ফেলেছে? "সোনালী কি সাংবাদিকতা ধরল? আমার ওপর সাক্ষাৎকার মক্সো করে হাত পাকাচ্ছে?আমি তানানা করি। এড়িয়ে যেতে চাই। তারপর মনে হয়, এটা একটা ছোট্ট খেলা। ...
  • সুর অ-সুর
    এখন কত কূটকচালি ! একদিকে এক ধর্মের লোক অন্যদের জন্য বিধিনিষেধ বাধাবিপত্তি আরোপ করে চলেছে তো অন্যদিকে একদিকে ধর্মের নামে ফতোয়া তো অন্যদিকে ধর্ম ছাঁটার নিদান। দুর্গাপুজোয় এগরোল খাওয়া চলবে কি চলবে না , পুজোয় মাতামাতি করা ভাল না খারাপ ,পুজোর মত ...
  • মানুষের গল্প
    এটা একটা গল্প। একটাই গল্প। একেবারে বানানো নয় - কাহিনীটি একটু অন্যরকম। কারো একান্ত সুগোপন ব্যক্তিগত দুঃখকে সকলের কাছে অনাবৃত করা কতদূর সমীচীন হচ্ছে জানি না, কতটুকু প্রকাশ করব তা নিজেই ঠিক করতে পারছি না। জন্মগত প্রকৃতিচিহ্নের বিপরীতমুখী মানুষদের অসহায় ...
  • পুজোর এচাল বেচাল
    পুজোর আর দশদিন বাকি, আজ শনিবার আর কাল বিশ্বকর্মা পুজো; ত্রহস্পর্শ যোগে রাস্তায় হাত মোছার ভারী সুবিধেজনক পরিস্থিতি। হাত মোছা মানে এই মিষ্টি খেয়ে রসটা বা আলুরচপ খেয়ে তেলটা মোছার কথা বলছি। শপিং মল গুলোতে মাইকে অনবরত ঘোষনা হয়ে চলেছে, 'এই অফার মিস করা মানে তা ...
  • ঘুম
    আগে খুব ঘুম পেয়ে যেতো। পড়তে বসলে তো কথাই নেই। ঢুলতে ঢুলতে লাল চোখ। কি পড়ছিস? সামনে ভূগোল বই, পড়ছি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। মা তো রেগে আগুন। ঘুম ছাড়া জীবনের কোন লক্ষ্য নেই মেয়ের। কি আক্ষেপ কি আক্ষেপ মায়ের। মা-রা ছিলেন আট বোন দুই ভাই, সর্বদাই কেউ না ...
  • 'এই ধ্বংসের দায়ভাগে': ভাবাদীঘি এবং আরও কিছু
    এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে ক্রমে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে সংকটের এক নতুন রুপরেখা তৈরি হচ্ছে। যে প্রগতিমুখর বেঁচে থাকায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি প্রতিনিয়ত, তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, "কোথায় লুকোবে ধু ধু করে মরুভূমি?"। এমন হতাশার উচ্চারণ যে আদৌ অমূলক নয়, তার ...
  • সেইসব দিনগুলি…
    সেইসব দিনগুলি…ঝুমা সমাদ্দার…...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন । মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'...
  • হরিপদ কেরানিরর বিদেশযাত্রা
    অনেকদিন আগে , প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে এই গেঁয়ো মহারাজ , তখন তিনি আরোই ক্যাবলা , আনস্মার্ট , ছড়ু ছিলেন , মানে এখনও কম না , যাই হোক সেই সময় দেশের বাইরে যাবার সুযোগ ঘটেছিলো নেহাত আর কেউ যেতে চায়নি বলেই । না হলে খামোখা আমার নামে একটা আস্ত ভিসা হবার চান্স নেই এ ...
  • দুর্গা-বিসর্জনঃ কৃষ্ণ প্রসাদ
    আউটলুকের প্রাক্তন এডিটর, কৃষ্ণ প্রসাদ গতকাল (সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭) একটি লেখা (https://www.faceboo...

আমার বন্ধু সুজয়

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার বাল্যবন্ধু সুজয় এখন কর্মসূত্রে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। রাজকার্যটা কী, কি কারণে এই পৃথিবীব্যাপী টহলদারী, জানতে চাইলে গম্ভীরমুখে বলে, "গরীব মানুষ,পাইপ বেচে খাই"। এই নিয়ে বন্ধুবান্ধবরা বহু ঠাট্টাতামাশা করে থাকে। লাল নীল ও মেরুন রঙের পাইপ হাতে নিয়ে সুজয় সিন নদীর পাড় ধরে নাগাড়ে পায়চারী করছে, আর জনে জনে জিজ্ঞাসা করছে, "আপনি কি দাদা ব্যাগপাইপার?" এমন দৃশ্য নাকি প্রতি মাসের প্রথম সোমবার দেখা যায়। স্টার থিয়েটারের সামনে শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে থিয়েটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় রত, শিশির ও সুজয় দুজনের হাতেই দুখানা পাইপ, সাদাকালো বলে পাইপের কালার বোঝা যাচ্ছেনা,এরকম ছবি নাকি শনিবারের চিঠিতে ছাপা হয়েছিল। প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ, যে গেছো দাদা নামক উত্তর আধুনিক চরিত্রটির সৃষ্টিই হয় সুজয়কে দেখে। জনগণ এও বলে থাকে, যে হাইসেনবার্গ যখন তাঁর আনসারটেন্টি প্রিন্সিপ্‌লের প্রথম খসড়া করেন, সুজয় তখন জার্মানিতে, সেই থেকেই তার অবস্থান নিয়ে আর সুনির্দিষ্ট কিছু বলা যায়না। সুজয় নাকি একই সঙ্গে কিছুটা ঝাড়গ্রামে, অনেকটা উত্তরবঙ্গে, অর্ধেকটা ফ্রান্সে আর বাকি অর্ধেক মালাইকা আরোরায় বিরাজ করে।

এসব জনগণের দাবী। জনগণ সম্পর্কে অবশ্য সুজয়ের সুনির্দিষ্ট মতামত আছে। জনগণ কে? এই দার্শনিক প্রশ্নের উত্তরে, বহুক্ষণ মাথা চুলকে সে বলে -- "সম্ভবতঃ মাথায় মাখার জিনিস নয়।" তবে কি খায়? অনেক ভেবে সে বলে -- "ঠিক জানিনা।" বহু বহুকাল আগে, কলেজ জীবনে, জনগণ সম্পর্কে আরও একখানি গোপণ কথা এক ঝড়ের রাতে সে আমাকে জানিয়েছিল। যে, পাঁচ জন মানুষ আসলে আট রকমের। তাদের প্রত্যেকে আবার নাকি দুই তিন রকমের। সেই সন্ধ্যায় কালবৈশাখী হয়েছিল। ঝড় যখন উঠল আমরা তখন গুটুর চায়ের দোকানে বসে আছি,খদ্দেররা সব অদ্ভুত দ্রুততায় হাওয়া হয়ে গেলে গুটু ঝাঁপ ফেলে দিল, আর সুজয়, তার গাঁজারক্তিম চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল "সব মিলিয়ে কজন হল তাহলে? পার মানুষ কতগুলো লোক?"

সেই সময়, সুজয় গল্প লিখত, এবং বলা বাহুল্য, তার লেখালিখিও এইসব আটভাট জিনিসেই ভর্তি থাকত। সে এক ভুতুড়ে জগৎ। সেখানে পুরুষ ও নারীর শয্যার মাঝখানে ক্রমশ বেড়ে উঠত এক অশরীরী অস্তিত্ব, যাকে আর অতিক্রম করা যায়না। শিশুরা বেড়ে উঠত ফেভিকলের কৌটোর মধ্যে। একটা গল্পের কথা মনে করতে পারি, যেখানে আর্ট কলেজের ছাত্র, তার নগ্নিকা বান্ধবীর সর্বাঙ্গ জুড়ে সযতনে সপ্রেমে এঁকে দেয় এক বিশাল সাপ। কেন সাপ? কারণ এই ছিল সুজয়ের জীবন ও প্রেম সম্পর্কে আল্টিমেট বক্তব্য, যেখানে ভারতীয় দন্ডবিধির ধারা উল্লেখ করে প্রেমিকাকে প্রেমিক চিঠিতে লেখে, "এই চিঠি লেখার জন্য তুমি আমাকে পুলিশে দিতে পার", যেখানে সমুদ্রে স্নান করতে নেমে প্রেমিকারা কখনই আর ফিরে আসেনা, যেখানে গল্পের শেষে ঘরে পড়ে থাকে শুধু খাট ও এক অশরীরী অস্তিত্ব, যেখানে নারীর নগ্ন শরীরে রঙ পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায়না।

এর কিছুদিন পরে সত্যি সত্যিই আমি এক রক্তমাংসের নগ্নিকার মুখোমুখি হই, এবং তা শরীর অবধি গড়ায়। সেই প্রথম আমি দেখি, শরীরে যা আছে তা অন্যকিছু, যাকে প্রেম বা মৃত্যু দিয়ে ছোঁয়া যায়না, বরং এই সেই রঙ্গমঞ্চ যেখানে কাম ক্রোধ লোভ দাসত্ব জীবন ও মৃত্যু একে অপরের সঙ্গে জায়গা পরিবর্তন করে চলে অবিরত, অনায়াসে। চাকের মৌমাছির মতো প্রেমের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসে লোভ, জীবনের জামা পরে নেয় দাসত্ব। জামা পাল্টাপাল্টির এই অভিজ্ঞতার পরে,শরীরে কোনো সাপ নেই, সুজয়কে আমি জানিয়েছিলাম। কিন্তু, কোনো গল্পের শেষাংশই তাতে পাল্টায়নি, শেষ পর্যন্ত, অন্তত যতদূর আমি জানি। সে দোষ আমার নয়। বয়সের। আহা বড়ো ভাল ছিল সেইসব নারীহীন বয়ঃসন্ধি উত্তর অযৌন জীবন যাপন।

নারীমহলে সুজয় কখনই খাপ খুলতে পারেনি, যদিও সেই সময়ে তার ছিল নিখুঁত মডেলশরীর -- ছয়ফুটিয়া মেদহীন ও নির্লোম। মেয়েদের অমনোযোগের কারণেই কিনা জানিনা, এল অ্যান্ড টি তে চাকরি করাকালীনই ভুঁড়ি হতে শুরু করে। তারপর, সেই চাকরি ছেড়ে ভূপর্যটনের প্রথম ট্রিপ দিল দুবাই। দুবাই থেকে বছর খানেক পরে ফিরল যখন, আস্ত একটি কুমড়োপটাশ। আমাদের গুটুর চায়ের দোকানের বেঞ্চে গুটু ওকে বসতে দিতে অস্বীকার করে, সেই সময়। বসলে নাকি বেঞ্চি ভেঙে পড়তে পারে। গুটুকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি শেষমেষ করা গেল ঠিকই, কিন্তু সুজয়ের ওজন আর একশ কেজির নিচে নামলনা। অবশ্য ওজন কমানোর কোনো চেষ্টা সুজয় আদপেই করেছে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ আজও প্রতি রাতেই সে এক ঝুড়ি আলুর চপ নিয়ে বাড়ি ফেরে, এবং, বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশ, মেয়ে বৌ বাবা মা এমনকি সহোদর ভাই, সকলেই রাত দশটায় সেই চপ খেতে রিফিউজ করে। সমবেত রিফিউজাল, দুবার জন্ডিসের আক্রমণ, কিছুই সুজয়কে দমাতে পারেনা। কোনো চপই ফেলা যায়না, সে কিছু চপ ভাতের সঙ্গে খায়, বাকিটা রাতে রাম দিয়ে। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ওর কোনো বাছবিচার আছে বলে শুনিনি। এই গুটুর দোকানেই, দিনের পর দিন জন্ডিসাক্রান্ত সুজয় আমার সঙ্গে বসে বিষাক্ত ঘুগনি এবং বাসি চা সাঁটিয়েছে, এবং কি আশ্‌চর্য আজও বেঁচে আছে।

গুটুর রহস্যময় দোকান সম্পর্কে এখানে দুচার কথা বলে নেওয়া দরকার,এই দোকানই ছিল আমাদের শেষ কৈশোর ও প্রথম যৌবনের ম্যাজিকাল বিচরণভূমি। দোকানের ভিতর ছিল অসহ্য গরম, ধোঁয়া এবং চারখানি বেঞ্চ, যাতে অবশ্যই সমস্ত আড্ডাধারীর জায়গা হতনা। সেই সব বাস্তুচ্যুত হতভাগ্যরা ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ত দূর দূরান্তে, কেউ কেউ বসে পড়ত রাস্তার ধারে পেতে রাখা এক্সট্রা বেঞ্চে, বাকিরা কখনও কখনও রাস্তা পার হয়ে অপার বেঞ্চিহীনতায়, অন্ধকার নেমে এলে তাদের আর দেখাও যেতনা, শুধু, মাধব চা দিয়ে যাও, অন্ধকারের আড়াল থেকে এই রহস্যময় ডাক শুনে বোঝা যেত গুটুর দোকান ক্রমশঃ বৃহত্তর গুটুর দোকান হয়ে চারিয়ে যাচ্ছে গোটা লোকালয়ে। মাধব অবশ্য কখনই একডাকে সাড়া দিতনা, ফলে কিছুক্ষণ পরে পরে বিভিন্ন দিক থেকে ভেসে আসত সেই ডাক, মাধব চা দাও, আর আমরা বুঝতে পারতাম গোটা লোকালয়ের শিরা ও ধমনীতে ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের আড্ডার বীজ। প্রসঙ্গতঃ মাধব গুটুর ছোটো ভাই। ওরা তিন ভাই মিলে দোকানটি চালালেও কি কারণে জানা যায়না বড়ো ভাই গুটুর নামেই দোকানের নাম গুটুর দোকান, যেমন একথাও কখনও জানা যাবেনা ছোটো দুই ভাইয়ের নাম রাধা ও মাধব হলেও বড়োজন গুটু কেন। ঘুগনি ছাড়াও গুটুর মেনুতে ছিল আলুর দম মুড়ি আর পাঁউরুটি। এছাড়াও দিনের বেলায় পাওয়া যেত পরোটা, সন্ধ্যায় চপ আর আগুন গরমের দিনে প্রাণজুড়ানো বরফ শীতল কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল। কোল্ড ড্রিঙ্ক শুধু গরমেই পাওয়া যায়, কারণ শীতে দোকানের এক ও একমাত্র ফ্রিজটি পরিণত হয় জামা কাপড়ের আলমারিতে।

এই গুটুর মায়াবী দোকানেই সুজয়ের মাথায় আসত নানা অপার্থিব আইডিয়া, যার অন্ততঃ একখানার বাস্তব প্রয়োগ ঘটানোর সুযোগ হয়েছিল আমাদের। দ্রাঘিমা ৮৮ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বার হয়েছিল সেবার, যার প্রথম সংখ্যা বেরোনোর আগেই প্রচারের দায়িত্ব ঘাড়ে নিই আমরা, মানে আমি ও সুজয়। বাজেট ছিল পঞ্চাশ টাকা। তার মধ্যেই ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে পত্রিকার নাম। সে প্রচার আবার সত্যেন্দ্র ছাতুর প্রচারের মতো বাজারি হলে হবেনা, তার মধ্যে থাকতে হবে যথেষ্ট পরিমান ইন্টেলেক্‌চুয়ালিটি। চ্যালেঞ্জ... বলে সুজয়, এই গুটুর দোকানে বসেই। পরদিন বিনাপয়সায় ওষুধের এক স্টকিস্টের কাছ থেকে চেয়ে আনা হয় বড়ো বড়ো পিজবোর্ডের পেটি, এবং আর দু এক দিনের মধ্যেই অফিসগামী নিত্যযাত্রীরা অবাক হয়ে আবিষ্কার করেন ডাউন প্লাটফর্মের একমাত্র শেড থেকে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে অজস্র বাক্স। আর সেই সব বাক্সের গায়ে সাঁটা আছে বিচিত্র সব হাতে লেখা পোস্টার, যথা "দাড়িওলা রবীন্দ্রনাথ নাকি বেগুন আর ঝোলভাত, কাকে বেছে নেবেন? পড়ুন দ্রাঘিমা ৮৮"। অথবা "প্রেমে আঘাত?পায়ে বাত? কোনোদিন সারবেনা। পড়ুন দ্রাঘিমা ৮৮" । শুধু কনটেন্টের কারণেই নয়, এমন ভাবে টাঙানো হয়েছিল সেই সব সুজয়ের হাতে আঁকা বিচিত্র গ্রাফিত্তি, যে না দেখে উপায় ছিলনা। পোস্টার টোস্টার তো নয়, যে না দেখলেও চলে। ভাত খেয়ে পান চিবোতে চিবোতে বাবু চলেছেন মশ মশ মশ, ঊর্ধ্বশ্বাসে ট্রেন ধরতে,হঠাৎই প্লাটফর্মের শেড থেকে দুলতে দুলতে নাকের ডগায় চলে এল এক ঝুলন্ত বাক্স, যার গায়ে ছবিসহ বড়ো বড়ো করে লেখা "আস্তে ছুটুন, কারণ আলোর গতিবেগ ক্রমশ কমছে। পড়ুন দ্রাঘিমা ৮৮"। এমন কোন মহাপ্রাণ আছেন, যার চৈতন্যের গভীরে ঘা দিয়ে যাবেনা এই অমৃতবাণী?

এইসব বাক্স আর গ্রাফিত্তি তিনচার দিনের বেশি ছিলনা প্লাটফর্মে, রেল কোম্পানি বা অন্য কেউ খুলে নিয়ে চলে যায়, কিন্তু প্রচার হয়েছিল ব্যাপক। সেবার পুজোয় নিজের হাতে একটা স্টল থেকে একদিনে পঁচিশ কপি দ্রাঘিমা বেচি আমি, যার প্রত্যেকটার দাম ছিল পঁচিশ টাকা। এবং এর কোনোটিই পুশ সেল নয়। দ্রাঘিমার, অন্ততঃ প্রথম সংখ্যাটা ভালই চলেছিল। এর পরেও অবশ্য আরও কয়েকটা সংখ্যা বার হয়, কিন্তু তার কোনোটাতেই সুজয়ের এইসব বীভৎস রসের চমকপ্রদ লেখার কোনোটাই ছাপার অক্ষর হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেনি শেষপর্যন্ত। কারণ পত্রিকায় আমরা ছাড়াও ছিলেন শিল্প সাহিত্যের কিছু স্থানীয় পুলিশম্যান, যৌনতা যাঁদের কাছে কুষ্ঠের অধিক ঘৃণ্য ব্যধি। এতো আর কলকাতা শহর নয়, যে তোমার স্তন নিয়ে দুই হাতে মাখামাখি করি লিখে হাততালি পাওয়া যাবে। মাঝে মাঝেই পত্রিকার সম্পাদকীয় মিটিংএ এইসব নিয়ে ফাটাফাটি হত আর এইসব অভিযোগের উত্তরে সুজয় যা বলত তাকে দুর্বোধ্য বললে কিছু কম বলা হয়। এইরকম এক ঘটনার পর, গুটুর চায়ের দোকানে বসে সুজয় এক সন্ধ্যেবেলায় প্রশ্ন করে, "সত্যি ই কি আমার লেখা কিছু বোঝা যায়না?" এদের অভিযোগ, সে অনেক ভেবে বলে, "অনেকটা আমার লেখার মতো, কিছুই বোঝা যায়না। আর বোঝা যদি নাই যায়, তাহলে অশ্লীল হয় কিকরে?" এরপর পকেট থেকে সে বার করছিল তার গোপণ পান্ডুলিপি, পড়ে শোনাবে বলে, কিন্তু এই মর্মান্তিক প্রশ্নের পরই হঠাৎ আলো নিভে যায় সেদিন, আমাদের ঐ মফঃস্বল শহরে যাকে লোডশেডিং বলে। ফলে সেই লেখা আর পড়া হয়নি। আড্ডায় হাপ্পাদাও ছিল সেদিন। খুব খচে গিয়ে হাপ্পাদা বলে, "তুই আলোটা খেলি তো? সুজয়?" সুজয় হাহা করে হাসে,বাকিরাও। হাপ্পাদা বলে, "যা ফর্মা দেখাচ্ছিস,জাস্ট গল্প লেখাটা বন্ধ কর, তাহলেই তোর নোবেল প্রাইজ বাঁধা", তারপর একটু থেমে, "বিশ্বশান্তিতে"।

সবাই হেসে ওঠে। সুজয়ও।

সুজয়ের প্রকাশভঙ্গী যে শুধু দুর্বোধ্য ছিল তাইই নয়, সন্ত্রাসের যথেষ্ট উপাদানও তাতে মজুদ ছিল। একবার, রাত্তির বারোটায় কোনো এক রাজকার্য সেরে ফিরছিলাম, রাস্তায় পড়ল আমাদের বন্ধু জয়ের বাড়ি। সুজয় কথা নেই বার্তা নেই পাড়া জাগিয়ে জয়, জয় বলে হাঁক পাড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ বাদে চোখ কচলাতে কচলাতে জয় বেরিয়ে আসে। এতো রাতে, কি ব্যাপার? সুজয় নির্বিকার চিত্তে বলে, "খিদে পেয়েছিল খুব, খুব কি রাত হয়ে গেছে?" স্ট্রীটস্মার্ট জয় বলে, "নাঃ ভালই করেছিস এই সময়ে এসে, এর আগে এলে তো আমাকে পেতিসনা"। জবাবে তার সমস্ত স্মার্টনেসকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সুজয় বলে, "আর আমরা? আমাদের কথা ভাব একবার। এতো রাতে গেলেও আমাদের বাড়িতে পাওয়া যাবেনা "। তারপর বিজয়গর্বে একখানা স্মাইল দেয়। এতো কিছুর পরেও জয় যে তারপর ভরপেট্টা খাইয়েছিল, সেতো নেহাৎই লোকে তখন বন্ধুত্বের দাম দিত বলে।

তারপর, দ্রাঘিমা যেবার প্রথম বেরোলো, সেবারই, স্থানীয় একটি পুজো কমিটি আমাদের একটি বুকস্টল বানিয়ে দেয়, যেখান থেকে আমি সেই একদিনে পঁচিশ কপি বই বেচেছিলাম(যেকথা আগেই লিখেছি)। পুজোর আগে কমিটির সেক্রেটারি একটি ফর্মাল চিঠি দিতে বলেছিলেন। কোনো কারণে সুজয়ই লেখে চিঠিখানা, এবং যা ছিল অবশ্যাম্ভাবী, তাইই হয়। ভদ্রলোক চিঠি পেয়ে জাস্ট ফায়ার হয়ে যান। চিঠিটি আমি নিজের চোখে দেখিনি, তবে ভদ্রলোকের মূলতঃ দুটি অভিযোগ ছিল। এক, চিঠি পড়ে কিছু বোঝা যায়না (এটা একটা চিঠি হয়েছে?)। দুই, চিঠি থেকে মোদ্দা কথা উনি যা বুঝেছিলেন, তা হল, সুজয় বিশ্ব সাহিত্যের জন্য একটি স্টল বানিয়ে দিয়ে তার জন্য ওনাকে গর্বিত হতে উপদেশ দিয়েছে।

এর পরেও ভদ্রলোক স্টল খানা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তবে সে শুধু স্নেহবশত। আহা, ভাবতেও ভালো লাগে, কি দিনকাল ছিল তখন, মাঠ ভরা ধান ছিল,গাছে গাছে পাখি ডাকত, বন্ধুত্বের দাম ছিল,আমাদের মতো বুড়ো দামড়া অকলকুষ্মান্ডকেও লোকে ফরনাথিং স্নেহ করত। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হত, বছরে দুটো বন্‌ধ হতো,পুজোয় ফাটত চকলেট বোম। ডাউন ২৯২ হরিপাল লোকালের শেষ কামরায় বসার জায়গা পাওয়া যেত, তরুণ বিদ্রোহী যুবকেরা পাঞ্জাবী জিন্‌স আর লম্বা দাড়ি রাখত, কেরিয়ার না থাকলেও মেয়েরা প্রেম না হোক খুচরো শরীরে রাজি হতো। তখন পেটেন্ট অফিসের কেরানিও কাজের ফাঁকে রিলেটিভিটি আবিষ্কার করে ফেলত, ঘরে ঘরে ফলত শেক্ষপিয়ার মিল্টন, বোলপুরের খোলা মাঠে খেলাচ্ছলে চলত মলত্যাগ ও বিদ্যার্জন, আপেল গাছে ফলে থাকত মাধ্যাকর্ষণ, শুধু পেড়ে নেবার অপেক্ষায়। ফিল্টার উইল্‌সের দাম ছিল পঞ্চাশ পয়সা,আলোর গতিবেগও ছিল সেকেন্ডে একলক্ষ মাইলের কম...

তো, এসব বহু বহুকাল আগের কথা। তারপর বহু ঘাটের জল টল খেয়ে সুজয় আর আমি এখন দুই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। আমাদের দুজনের মধ্যে ক্রমশ বেড়ে উঠেছে সেই অশরীরী অস্তিত্ব, যাকে আর অতিক্রম করা যায়না। সুজয়ের প্রায় কোনো লেখাই কোথাও ছাপা হয়নি,লেখালেখিও বন্ধ করে দিয়েছে সেই কবে, কিন্তু বিশ্বশান্তিতে নোবেল পুরষ্কার, আজও , হায় অধরাই থেকে গেছে। আমাদের ঐসব দুর্বোধ্য বাক্যালাপ, বন্দরের ঐসব সান্ধ্যভাষা,ঐসব ব্যকরণহীন জীবনধারণের ইতিবৃত্ত কেউ টুকে রাখেনি। ফুলস্কেপ কাগজে খুদে খুদে অক্ষরে লেখা সেই সব কাগজের বান্ডিল, সেসবও কেউ বাঁচিয়ে রাখেনি কোনো মহাফেজখানায়, আর যাই হোক কিছু ফ্রানৎস কাফকা তো নয়... সে নিয়ে সুজয়ের কোনো আফশোষ আছে বলেও মনে হয়না। জীবনের কতো জরুরী কথাই তো ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে গেল, এতো শুধু দুচারটে ছেঁড়া পাতা। এসব নিয়ে আমরা কেউই মনে কোনো মালিন্য রাখিনি।

সুজয় এখন দেশে বিদেশে পাইপ বেচে বেড়ায়, আর আমি বিদেশে বসে কি বেচি, ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু আসলে তো আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে আর কিছুই নিশ্‌চিত করে বলা যায়না। পৃথিবী ক্রমশ ছোটো হয়ে যাচ্ছে। কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরত্বে সবুজে ঢাকা আমাদের মফঃস্বল শহর এখন গাড়িতে রবীন্দ্রসদন থেকে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ। হৈ হৈ করে তৈরী হচ্ছে ফ্ল্যাটবাড়ি এবং লোকে সেখানে বসবাস করছে। হাতের কাছেই পাওয়া যাচ্ছে কোক পেপসি বিউটি পার্লার হাসপাতাল সাইবার ক্যাফে। লোকে মুড়ি মুড়কির মতো কিনছে মারুতি জেন আর রবিবারের পাঁঠা। আর সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে থাকা সাপের খোলসের মতই রয়ে গেছে স্টেশন থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে ঘিঞ্জি নোংরা আলোহীন মায়াবী রহস্যময় গুটুর দোকান। প্রতিটি সকাল ও সন্ধ্যে, নিয়ম করে আজও আমরা ওখানেই থাকি। আমরা মানে আমি আর সুজয়। ঝড় বৃষ্টি তুষারপাতে, কাঁদানে গ্যাস রাবার বুলেট রাষ্ট্রবিপ্লবে, আমাদের ওখানেই পাবেন। আজও।


পুরোনো লেখা। বাংলালাইভে কোনো এককালে বেরিয়েছিল। সে আর অনলাইনে পাওয়া যায়না। খুঁজে পেতে তুলে দিলাম।


Avatar: kc

Re: আমার বন্ধু সুজয়

সেই কোনকালে পড়া। আমার কাছে প্রিন্ট নেওয়া ছিল। খুব খুব ভাল লাগা একটা লেখা।
Avatar: Anirban-US

Re: আমার বন্ধু সুজয়

ঃ) ঃ) ঃ)
দারুন !
শুরু থেকে যদিও মনে হচ্ছিল আগে পরেছি কোথায় - এখনও খুব ভালো লাগলো ঃ)
Avatar: swarnendu

Re: আমার বন্ধু সুজয়

দারুণ, সত্যি দারুণ হয়েছে।
Avatar: শঙ্খ

Re: আমার বন্ধু সুজয়

বাঃ! মার্কেজ এবং সন্দীপন এর ছোঁয়া পেলুম।
খুবই ভালো লেখা।
Avatar: aranya

Re: আমার বন্ধু সুজয়

আগে পড়েছি। দারুণ লেখা
Avatar: ঈশান

Re: আমার বন্ধু সুজয়

আবারো অহো !
Avatar: pi

Re: আমার বন্ধু সুজয়

Test।
Avatar: ranjan roy

Re: আমার বন্ধু সুজয়

প্রথম বার পড়লাম। অসাঃ ;মামুর এরকম হারিয়ে যাওয়া লেখা আরও পড়তে চাই!!
Avatar: π

Re: আমার বন্ধু সুজয়

এটা তো আগেরবারের কাগুজে গুরুতেও ছিল, রঞ্জনদা।
Avatar: ranjan roy

Re: আমার বন্ধু সুজয়

সরি! পড়িনি, বা কাগুজে গুরু হাতে নিয়ে দেখা হয় নি। এবার থেকে খেয়াল রাখব।
Avatar: nina

Re: আমার বন্ধু সুজয়

সিগনেচার লেখা--মামু!
Avatar: I

Re: আমার বন্ধু সুজয়

লেখাটা বারবার পড়ি। বারবার মন খারাপ লাগে।
Avatar: san

Re: আমার বন্ধু সুজয়

এটা পড়লে আমারও মন খারাপ করে। অকারণেই।
Avatar: Lama

Re: আমার বন্ধু সুজয়

করেচিস কি!

খোরাক দূরে থাকুক। আগেও পড়েছিলাম। আবার পড়লাম। বারবার পড়ব। পড়াব। আর পাবলিককে বলব 'লেখক আর আমি একসঙ্গে পড়তাম'
Avatar: π

Re: আমার বন্ধু সুজয়

ঐসব ব্যাকরণবিহীন জীবনের ইতিবৃত্ত কেউ টুকে রাখেনি, একদিকে ভালোই হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার দুঃখ কিম্বা না-দুঃখ থাকলে এরকম লেখাও তো পেতাম না।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন