Suddha Satya RSS feed

অযত্নে যা ফোটে, যত্ন করলে অলঙ্কার হয়!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম
    পর্ব ১: আমরাভণিতা করার বিশেষ সময় নেই আজ্ঞে। যা হওয়ার ছিল, হয়ে গেছে আর তারপর যা হওয়ার ছিল সেটাও শুরু হয়ে গেছে। কাজেই সোজা আসল কথায় ঢুকে যাওয়াই ভালো। ভোটের রেজাল্টের দিন সকালে একজন আমাকে বললো "আজ একটু সাবধানে থেকো"। আমি বললাম, "কেন? কেউ আমায় ক্যালাবে বলেছে ...
  • ঔদ্ধত্যের খতিয়ান
    সবাই বলছেন বাম ভোট রামে গেছে বলেই নাকি বিজেপির এত বাড়বাড়ন্ত। হবেও বা - আমি পলিটিক্স বুঝিনা একথাটা অন্ততঃ ২৩শে মের পরে বুঝেছি - যদিও এটা বুঝিনি যে যে বাম ভোট বামেদেরই ২ টোর বেশী আসন দিতে পারেনি, তারা "শিফট" করে রামেদের ১৮টা কিভাবে দিল। সে আর বুঝবও না হয়তো ...
  • ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনঃ আদার ব্যাপারির জাহাজের খবর নেওয়া...
    ভারতের নির্বাচনে কে জিতল তা নিয়ে আমরা বাংলাদেশিরা খুব একটা মাথা না ঘামালেও পারি। আমাদের তেমন কিসছু আসে যায় না আসলে। মোদি সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক বেশ উষ্ণ, অন্য দিকে কংগ্রেস বহু পুরানা বন্ধু আমাদের। কাজেই আমাদের অত চিন্তা না করলেও সমস্যা নেই ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৪
    আম তেলবিয়ের পরে সবুজ রঙের একটা ট্রেনে করে ইন্দুবালা যখন শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছিলেন তখন তাঁর কাছে ইন্ডিয়া দেশটা নতুন। খুলনার কলাপোতা গ্রামের বাড়ির উঠোনে নিভু নিভু আঁচের সামনে ঠাম্মা, বাবার কাছে শোনা গল্পের সাথে তার ঢের অমিল। এতো বড় স্টেশন আগে কোনদিন দেখেননি ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-৯
    আমি যে গান গেয়েছিলেম, মনে রেখো…। '.... আমাদের সময়কার কথা আলাদা। তখন কে ছিলো? ঐ তো গুণে গুণে চারজন। জর্জ, কণিকা, হেমন্ত, আমি। কম্পিটিশনের কোনও প্রশ্নই নেই। ' (একটি সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা মিত্র) https://www.youtube....
  • ডক্টর্স ডাইলেমা : হোসেন আলির গল্প
    ডক্টর্স ডাইলেমা : হোসেন আলির গল্পবিষাণ বসুচলতি শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি। তখন মেডিকেল কলেজে। ছাত্র, অর্থাৎ পিজিটি, মানে পোস্ট-গ্র‍্যাজুয়েট ট্রেনি। ক্যানসারের চিকিৎসা বিষয়ে কিছুটা জানাচেনার চেষ্টা করছি। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, এইসব। সেই সময়ে যাঁদের ...
  • ঈদ শপিং
    টিভিটা অন করতেই দেখি অফিসের বসকে টিভিতে দেখাচ্ছে। সাংবাদিক তার মুখের সামনে মাইক ধরে বলছে, কতদূর হলো ঈদের শপিং? বস হাসিহাসি মুখ করে বলছেন,এইতো! মাত্র ছেলের পাঞ্জাবী আমার স্যুট আর স্ত্রীর শাড়ি কেনা হয়েছে। এখনো সব‌ই বাকি।সাংবাদিক:কত টাকার শপিং হলো এ ...
  • বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা
    ‘কেন? আমরা ভাষাটা, হেসে ছেড়ে দেবো?যে ভাষা চাপাবে, চাপে শিখে নেবো?আমি কি ময়না?যে ভাষা শেখাবে শিখে শোভা হবো পিঞ্জরের?’ — করুণারঞ্জন ভট্টাচার্যস্বাধীনতা-...
  • ফেসবুক সেলিব্রিটি
    দুইবার এস‌এসসি ফেইল আর ইন্টারে ইংরেজি আর আইসিটিতে পরপর তিনবার ফেইল করার পর আব্বু হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, "এই মেয়ে আমার চোখে মরে গেছে।" আত্নীয় স্বজন,পাড়া প্রতিবেশী,বন্ধুবান্ধ...
  • বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা
    ‘কেন? আমরা ভাষাটা, হেসে ছেড়ে দেবো?যে ভাষা চাপাবে, চাপে শিখে নেবো?আমি কি ময়না?যে ভাষা শেখাবে শিখে শোভা হবো পিঞ্জরের?’ — করুণারঞ্জন ভট্টাচার্য স্বাধীনতা-পূর্ব সরকারি লোকগণনা অনুযায়ী অসমের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন বাঙালি। দেশভাগের পরেও অসমে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কাঙাল নামা ২

Suddha Satya



।।সভ্যতা মানেই রোম।।

খ্রীষ্ট জন্মাতে তখনো দেরী ৫৪ বছর। জুলিয়াস সিজারের জাহাজ থামল ব্রিটেনের উপকূলে। ব্রিটেন দেশটি রহস্যময়। এখানে সৌভাগ্য না এলে রোমে তার ফেরা মুশকিল, আর রোমে ফিরতে না পারলে তার এই নাম-খ্যাতি এসব মূল্যহীন। কবে কোন বাহিনী তাকে ‘ইম্পারেটার’ বা কম্যান্ডার বলে স্বতস্ফূর্ত খেতাব দিয়েছে এ সবে সিজারের চলবে না। এদিকে রোমে সিজারের অবস্থা কঠিন। প্রচুর ঋণ, প্রচুর শত্রু, প্রচুর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। একটার পর একটা নির্বাচন জিততে অনেক অনেক টাকা লেগেছে। রোমান তেলেন্ত-এর ভার জমে আছে তার উপরে। সেই তেলেন্তের সূত্র ধরে তাকে ক্রাসাস আর পম্পেই-এর সঙ্গে মৈত্রী করতে হয়েছে।

কোথা থেকে শুরু এর? সেই যে সিজার বিখ্যাত হতে চেয়েছিল। রোমের ধর্মের প্রধান পুরোহিত হতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। অনেক ঋণ হয়ে গেছিল। বাড়িতে বলে গিয়েছিল হয় সে প্রধান পুরোহিত হয়ে ফিরবে, না হয় ফিরবেনা! এই ভাবে কতকাল জুয়া খেলা যায়? ক্রাসাসের থেকে তেলেন্ত নিয়ে শোধ করতে হয়েছে ঋণ! তারপরে? বাকী যা থেকেছে তার জিম্মেদার ক্রাসাস থেকেছে, তাই তাকে ছুঁতে সাহস করেনি কেউ এখনো। সময় মত বন্ধু বানাবার জন্যে তার খ্যাতি আছে বটে। কিন্তু রোমে ফিরতে গেলে বন্ধুরাও যথেষ্ট নয়। তাকে উন্মাদনা তৈরী করতে হবে। রোমের জনগণের জন্যে উন্মাদনা। সে তাদের জন্যে বাঁচে আর তাদেরই জন্যে মরে। এইটা তারা শুনতে চায় বারবার। শুনে আশ্বস্ত হয়।আসলে এ ছাড়া তারা কি বা করতে পারে? নিজেদের জোর বলে কিছুই নেই, সবটা এখন সিনেটের হাতে।আবার সিনেটে চলছে টাকার খেলা। ঐ যে মার্কাস কাটো, যাঁর সততা নিয়ে কেউ কোনোদিন প্রশ্ন তুলতে পারেনি, তিনিও কিনা সিজারকে হারাতে ঘুষও দিয়েছেন! ভাবা যায়?

যায়। বেশ ভাবা যায়। রোম মানেই অর্থ নয়। রোম মানে সেই চাষীর দল-ও যাদের ভাল করে চাষ করার উপায় নেই। সেচের ব্যবস্থা ভাল নয়। রোম মানে দাস, জলপাই তেল কারখানার শ্রমিক, যুদ্ধ না থাকলে রাস্তায় রাস্তায় মদ খেয়ে হল্লা করে বেড়ানো সৈন্যরাও। ছোট ছোট ব্যবসায়ী যারা রোমের চৌহদ্দির বাইরে ব্যবসা করেনা। কারণ তাদের সেই অর্থবল বা বাহুবল নেই, তবে স্বপ্ন দ্যাখে যে একদিন তাদের জাহাজ ভাসবে, সে জাহাজ যাবে সিরিয়া, লিডিয়া, মিশর,এ মনকি গঙ্গারিডি। এসব নিয়েই রোম। এই রোমকে সন্তুষ্ট রাখা চারটি খানি কথা? তাই সবাইকে ভোটে দাঁড়াবার সময় মনে রাখতে হয় এদের কথা। এর মধ্যে একমাত্র দাসেরা কোনো বিষয় নয়। একমাত্র তারা যতক্ষণ বিদ্রোহ না করছে ততক্ষণ তাদের হিসেবে রাখতে হয়না। বাকীদের কিন্তু লুঠের ভাগ দিতে হয় অথবা বলতে হয় ভাগ দেব।নইলে বেজায় মুশকিল। ভোট বদলে যাবে। কন্সাল বা প্রো-কন্সাল পদ থেকে নেমে যেতে হবে।

সাধারণভাবে সিনেটে জোর বেশী থাকে অর্থবানদের। তবে রোমের গোটা ইতিহাস জুড়ে তাদের সঙ্গে জনগণপন্থী বলে যারা পরিচিত তাদের বিরোধ চলছে। সিজার এই বিরোধ জানেন। জানেন বলেই ঋণগ্রস্ত হয়েও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পেরেছেন। তার চাপ কত সেটা সেনেট হাতে-নাতে দেখেছেও। সিজারকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেও সে ফিরে আসে। রোমের রাস্তায় তার জন্যে যে হিংস্র জনতা নেমে পড়ে তাকে ঠেকানো অসম্ভব। একটা গৃহযুদ্ধ না বাঁধিয়ে সেটা হবেনা, আর তার দায় নেবে কে? কাজেই সিজার এখনো বেঁচে। নইলে যে ক’বছর কন্সাল থেকেছেন, প্রো-কন্সাল হয়েছেন সেই সময়ে তার পদের অপব্যবহার সবাই জানে। কিন্তু তার সঙ্গেই এটাও সত্যি যে সেই ভূমিসংস্কারে উদ্যোগি ছিল সবচেয়ে বেশী। প্রথমে ক্রাসাসের সঙ্গে তারপরে তার সঙ্গেই ক্রাসাসের বিরোধি পম্পেইকে জুড়ে নিয়ে যে ট্রিয়াম্ভিরেট সে বানিয়েছিল তার একটা জনপ্রিয়তার চাল ছিল তার। ভূমি সংস্কার করা। দরকারে তার বিরোধ করলে সেনাবাহিনী নামিয়ে বিরোধিদের মোকাবিলার হুমকি সে আর পম্পেই দুজনেই দিয়েছিল। সিজারের সঙ্গে যে কন্সাল ছিল সেই লিসিয়াসকে ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছিল সিজারের লোকেরা। মজা করে বলা হত দুজনের কন্সালশিপ চলছে রোমে। জুলিয়াস আর সিজারের। গণতন্ত্র কত অবধি যেতে পারে এ নিয়ে সিজারের কোন ভুল ধারণা ছিলনা কখনোই। তাকে কোথায় ভাঙ্গতে হবে, কোথায় তাকেই মহান করতে হবে এই ধারণা সিজারের থেকে শিক্ষণীয়।ব্রিটেনের উপকূলে জাহাজ ভিড়িয়ে অপেক্ষা এবার ভাগ্যের দেবীটির সঙ্গে মোলাকাতের।

গণতন্ত্র আজকের যুগে সত্যি অচল। কঠিন কোন শাসক না থাকলে সমস্যা। গলিক, নর্ডিক, কেল্টিকদের অসংখ্য উপজাতীরা, পার্থিয়ানরা-যাদের হাতে বন্ধু ক্রাসাসের পরাজয় আর মৃত্যু ট্রিয়াম্ভিরেট খতম করে দিয়েছে। মিশরিয়রা, গ্রীকদের প্রবল বিদ্রোহী মন, দাসেদের মৃত আত্মাগুলোর অপেক্ষা এসব থেকে রোম কোথায় নিরাপদে থাকবে, কিভাবে? কিছুদিন আগে স্পার্টাকাসকে শুইয়ে দেওয়া গ্যাছে, কিন্তু তাতে কি? এই তো সেদিন আবারো জার্মানগুলো আক্রমণ করেছিল। সিজার তাদের পিছু ধাওয়া করে তাদের রাইন পেরিয়েছিল। ব্রীজ বানিয়ে দেখিয়ে এসেছিল রোমানরা কেন শ্রেষ্ঠ! সেই ব্রীজ আসার পথে ভেঙ্গে দিয়ে এসেছে। তারপরে ভেনেট্টিরা? তারা তাদের নৌবহর নিয়ে কম ভুগিয়েছে সিজারকে? বিদ্রোহীকে শাস্তি না দিলে হবেনা। ব্রিটেনেও সেই কারণেই আসা। শক্তি নিয়ে কোনো ভুল ধারণা থাকতে দেওয়া যাবেনা। মানুষ শক্তিকেই একমাত্র ভয় করে। আর শক্তি না থাকলে শাসন একটা অর্বাচীন ভাবনা মাত্র। সিজার দুর্বল একথা যেন কবরে শুয়ে থাকা লোকটাও না ভাবতে পারে। তারও এ ভাবনা এলে মনে পড়ে যেন সিজার মৃত্যুর থেকেও কঠিন এবং নির্মম! আগেরবার ব্রিটেন থেকে জাহাজগুলোর দুরবস্থার জন্যে ফিরে যেতে হয়েছে। সিসেরোকে সেই অভিযানের রোমহর্ষক বর্ণণা সিজার দিয়েছে, কিন্তু সাফল্যের কাহিনী বিস্তারিত বলতে পারেনি ।এবারে সঙ্গে বণিকদের নিয়ে এসেছে।সাফল্য অর্জন না করে ফেরা যাবেনা। সিজার ফিরবে, কিন্তু গল-এ নয়, রোমে।

।। জন মার্শাল রাত্রে লেখেন ।।

সবাই যখন ঘুমোচ্ছে তখন মার্শাল লেখেন। অসম্ভব এক নৈঃশব্দের মধ্যে বসে। দেশে থাকলে অনেকেই এই সময়ে পার্টিতে যেতে, নাচতে বা মহিলাদের সঙ্গে রসালো আলাপ করতে পছন্দ করেন। নিদেনপক্ষে মদটা জমিয়ে খেতে। কিন্তু মার্শাল লিখতে চান। লিখলে তিনি যে উন্মাদনা অনুভব করেন তার সঙ্গে কোনকিছুই তুলনীয় নয়। এমনকি সঙ্গমেও এত সুখ নেই। কি লেখেন? কিভাবে লেখেন? এই প্রশ্নগুলোতেই জড়িয়ে আছে সবটা। নিজেকে লেখেন।

নিজেকে? কথাটার মানে কি? প্রত্নতত্ত্ববিদের ‘নিজে’ মানে কি? কোনো একটা মানুষ, নাকি অনেক অসংখ্য? একটি নিজের মধ্যে অনেককে ধারণ? বলাই যায় কারোর মধ্যেই এক থাকেনা শুধু। ‘মনের মধ্যে বসত করে কয়জনা মন জানোনা’! তাহলে মার্শালের ক্ষেত্রে কি ব্যাতিক্রম? একটা পাথরের টুকরো জুলিয়াস সিজারের কাহিনী বলে। বলে হরপ্পা-মহেঞ্জোদাঢ়োর কাহিনী। ব্রিটেনে সিজারের স্মৃতিতে যে পাথরটা স্তম্ভ করেছে সেটা তিনি বাল্যকালে দেখেছেন। এখন এই মধ্যবয়সে দেখছেন অন্য কিছু পাথর, যাদের কাছে সিজারের স্মৃতি ফলকটি নেহাতি শিশু। কিন্তু এর আগেও তিনি দেখতে পারতেন পাথরগুলো। সেই তেরোক্রোশ ব্যাপী নগরটা যে নেই আর তার পিছনে তাঁর দুই স্বদেশীয়র অবদান তিনি জানেন। কি মূর্খামি, ভাবা যায়?

সিজারের স্মরণে স্তম্ভটা তাঁদের দেশের ইতিহাসের অংশ। তাঁদের সভ্যতার সঙ্গে পরিচয়ের শুরু। এখানে এই পাথরগুলোও একটা সভ্যতার শুরুর কথা বলছে। সেই সভ্যতা শুধু এদের নয়, গোটা পৃথিবীর সভ্যতাকেই এক ঠেলায় অনেক পিছিয়ে দিতে পারলো। খ্রীষ্টের জন্মের ৩৩০০ বছর আগে এই সভ্যতাটি তৈরী হয়। রোম যখন ব্রিটেনে হাজির হয় তখনও সেখানে চলছিল লোহার যুগ। তখনো সেখানে অন্যান্য সভ্যতার তুল্য নগর গড়ে ওঠেনি। পাহাড় এবং পাথর কেটে বানানো সভ্যতার উপর রোমের হামলা বেশ ভারী ছিল। কিন্তু এই যে নগর তিনি দেখছেন তার অনেক গোছানো ব্যবস্থা। তাহলে কে একে ভাঙ্গলো? কে একে ভাসিয়ে দিল? কে একে ঘুম পাড়িয়ে দিল? কবে?

রোমের গণতন্ত্রের স্বাদ তিনি পেয়েছেন ব্রিটিশ হিসেবে, কিন্তু এরা কি গণতন্ত্রী ছিল? সে কি গ্রীসের আথেন্সের মত না রোমের মত? নাকি তিনি যে মিনোয়ান সভ্যতার নোসসের ল্যাবিরিন্থ খুঁড়ে ছিলেন সেই মিনোয়ানদের মত রাজতন্ত্রী? ক্রীট দ্বীপের দিনগুলি তিনি ভোলেননি আজও। তাঁর কাছে গ্রীকদের থেকেও ক্রীটানরা অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ! হোমারের জয়ী যোদ্ধারা আসলে নিজের থেকে বেশীকে ধ্বংস করেছিল বলেই তাঁর আজো মনে হয়, যদি সেই কাহিনীর মত সত্যি ক্রীটের ট্রয় ধ্বংস হয়ে থাকে গ্রীকদের হাতে।

।। সভ্যতা মানে হিসাব-নিকাশ ।।

উইলিয়ামের হাতে বন্দুক যাতে না পৌঁছয় তার জন্যে সতর্ক থাকতে হয়েছিল জনকে। তাঁবুর বাইরে বেড়িয়ে দেখে একটি বৃদ্ধ একটু ঝোঁকা শরীর নিয়ে টিলার আড়ালে বেঁকে যাচ্ছে আর উইলিয়াম তরপে যাচ্ছে। একবার করে ছুটে যাচ্ছে, একবার পিছিয়ে আসছে তাঁবুর দিকে।এ কাজটা একটা কুকুর সাধারণত করে থাকে। কুকুরটি যদি নিশ্চিত না হয় যাকে দেখে সে চিৎকার করছে তার শক্তি কত তাহলে সে এমনি করে থাকে। উইলিয়াম কুকুর না হতে পারে কিন্তু জন্তু বটেই। তার নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে তার যথেষ্ট পরিষ্কার ধারণা আছে। এই জায়গাটা এমনই যে এখানে কয়েক কিলোমিটার অন্তর লোকবসতি। তাও কাছাকাছি জলের উৎস থাকলে তবেই।

জল যে কোনো বসতি স্থাপনের প্রাথমিক শর্ত। এককালে এখানে জল ছিল বটে। সরস্বতী বলে একটি নদী বইত এখান দিয়ে। সে কবে হেজে মরে গ্যাছে। জল ছিল আর জল নেই-এর মধ্যে কতটা তফাৎ তা জলে অভ্যস্ত লোকই জানে শুধু। জায়গাটা রূক্ষ! শুধু এটাই নয়। গোটা বালুচিস্তানে বা সিন্ধের পশ্চিমে একই অবস্থা। একটা অদ্ভুত জায়গা এটা। একদিকে মরুভূমি তো অন্যদিকে সমুদ্র। আবার পাহাড়ের সারি আলাদা করে দিয়ে গ্যাছে দুটোকেই। সিন্ধ, বালুচদের দেশ পেরিয়ে রেলপথ যাবে লাহোর। হাজার কিলোমিটারেরও বেশী রাস্তা। এখানে জনশ্রুতি বলে এককালে নাকি অনেক শহর ছিল, সঙ্গে গ্রাম। আজ সে সব কিছুই নেই।

উইলিয়াম শুনেছে সে সব। কিন্তু আজ যা আছে তা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। অভাবে স্বভাব নষ্ট বলে ছোটবেলায় শুনেছিল। কিন্তু তার থেকেও বড় হল এখানকার লোকজনের স্বভাব ।এরা অনেকেই স্বভাবেই কঠোর। ঘুরে বেড়ানো ছাড়া কাজ নেই, আর যা আছে তা হল কারোর কিছু আছে দেখলেই তা হরপ করে নেওয়ার চেষ্টা। খুব নৃশংস এরা। কথায় কথায় হত্যা করতে হাত কাঁপেনা এদের। এসব তাদের আগের লোকেরা বলে গ্যাছে। তারা এ অঞ্চল দখল করতে গিয়ে এসব দেখেছে। সেই জন্যেই ওই বুড়োকে এককথায় অনুসরণ করেনি সে। বন্দুকের জন্যে অপেক্ষা করছিল। কোম্পানি তাদের যে কাজ দিয়ে পাঠিয়েছে সেই কাজে প্রাণের ঝুঁকি আছেই। কারণ এখানে এই সব উপজাতীরা মোটেই কোম্পানির লোকেদের ভাল চোখে দেখেনা। তাদের কাছে এই সব ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য হল তাদের যা আছে সেটা শুষে ছিবড়ে করে দেওয়া। সেকাজেই লাগে রেলপথ। জন যখন নিজের হাতে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে এল তখন বুড়ো হারিয়ে গ্যাছে টিলার ওপারে।

উইলিয়াম মাটিতে তার পা-টা ঠুকলো যেন বেপরোয়া ঘোড়া সে একটি। এতক্ষণ যে কুলি-কামিনগুলো কাজ ছেড়ে তার দিকে চেয়ে ছিল তারা এবারে চোখ সরিয়ে নিয়ে হাতের কাজে মন দিল। এমনকি কুলিদের সর্দারটাও তাকে দেখছিল। হারামীর দল! গালি দেয় উইলিয়াম। জন এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। তাই সে কারোকে লাথিটা মারার সুযোগ পেলোনা। জন এ বিষয়ে সতর্ক থাকে। এই সব কুলিরা বেগার খাটছে কোম্পানির হয়ে। কারণ কোম্পানির সৈন্যদের এরা সমঝে চলে! শুধু খেতে পায় দুবেলা, ব্যাস! কোম্পানি এদেরকে প্রায় ক্রীতদাস করে রেখেছে বন্দুক দিয়েই। তবু সাবধানের মার নেই। পালিয়ে যাতে না যায়, বা বিক্ষুব্ধ হয়ে কাজ না আটকায় সেটা দেখা দরকার। কাজ বন্ধ হলেই বিপদ। রেল লাইনে অনেক হিসেব জড়িয়ে আছে যা উইলিয়াম বোঝেনা, বুঝতে চায়ওনা!

।। সিজারের শিক্ষা রোমেই হয় ।।

ক্রাসাস সোজা রোমের অনুমতি ছাড়াই বাহিনী নিয়ে চলে গিয়েছিল এবং যুদ্ধে সাময়িক জয়ের পরে তাকে পারসিকদের হাতে প্রাণ দিয়েই শেষ করতে হয়েছিল খেলাটা। শত্রুর সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য তার হাতে ছিলনা, তবুও গোঁয়ার্তুমির শখ ছিল তার! সিজারের নেই। ব্রিটেনের আগে সে ভেনেট্টিদের মোকাবিলা করেছে। সেখানে বেশ ঝামেলা হয়েছিল। ভেনেট্টিরা তাদের অনেক নগর-বন্দরে বেশ নিরাপদ ছিল। নগরগুলো সমুদ্রের জল থেকে খাড়াই উঠেছে পাহাড়ের গা বেয়ে, সেদিক থেকে আক্রমণ করার উপায় কম। ভেনিস যাদের দেশ তাদের জলপথে কাবু করা খুব সহজ কাজ নয়। অনেক কষ্ট করে বন্দর নগরগুলো যাও বা দখলে আসত, তাও দখলের পরে দেখা যেত যে তারা নগর ছেড়ে পালিয়েছে অন্য কোনো বন্দরে। আবার খাড়া পাহাড়, অবিশ্রান্ত আক্রমণ পেরিয়ে আরেকটা বন্দর নগর দখল। এভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল রোমানরা। একটাই রাস্তা ছিল, সরাসরি ওদের নৌবহরকে আক্রমণ করা।

ভেনেট্টিরা যদি এভাবে রোমকে কলা দেখাতে পারে তাহলে সমগ্র গলের দখল নিয়ে ঝামেলা হবে। ফাঁকতালে জার্মান অষ্ট্রোগথ, ভিসিগথরা, বেলজি-রা, কেল্টিকদের সমস্ত উপজাতীরাও বিদ্রোহ করতে পারে। তাই আক্রমণ করতেই হয় ওদের নৌবহর। কিন্তু ভেনেট্টিদের জাহাজ রোমানদের থেকে শক্তপোক্ত অনেক। কাজেই জাহাজে জাহাজে ধাক্কা দিয়ে কাবু করা যায়না, উল্টে ক্ষতি রোমানদের। এর সঙ্গে আছে উঁচু জাহাজ হবার সুবিধে। রোমানদের থেকে বেশী উচ্চতায় ওরা থাকে বলে আক্রমণ করতে সুবিধে বেশী পায়। তার সমাধান বার করতে হল। জাহাজের সামনের ধাক্কা মারার জন্যে যে অংশটা তৈরী সেই অংশটাকেই আরেকটু বাড়িয়ে নিয়ে আরেকটা নতুন জিনিস জোড়া হল। একটা সিঁড়ির মত অংশ এটা, যেটা জাহাজে জাহাজে ধাক্কা হলেই ঘুরিয়ে অন্য জাহাজে লাগিয়ে দেওয়া যাবে এবং হুকের মত আটকে যাবে সেটা। ফলে অন্য জাহাজ আর সেটাকে খুলতে পারবেনা। এবারে স্থলপথের যুদ্ধের মত হয়ে যাবে বিষয়টা। আর ধাক্কা মারার জায়গায় লোহার খোঁচা ব্যবহার করা হল। সেটা গিয়ে ধাক্কা মেরে ফুঁটো করে দেবে শত্রুর জাহাজ। এবারে রোমানদের ঠেকানো গেলনা। এই হল সিজার। তার এক সেনাপতির মাথাকে কাজে লাগিয়ে ভেনেট্টিদের মত জলের পোকাকেও শায়েস্তা করে ফেলেছে।

জল? গ্রীক জলদস্যুরা তাকে যখন অপহরণ করেছিল তখনো সে ভয় পায়নি, আর আজ পাবে? প্রাকৃতিক একটি সৈকতে গতবার অবতরণের প্রথম চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এবারে নয়! এবারে এক্কেবারে একটি বন্দরেই নামবে তারা। এবারে বাহিনী বড়, আর সবচেয়ে বড় কথা হল সিজার অভিজ্ঞতা থেকে শেখেন বটেই। ক্রমাগত জাহাজ থেকে পাথর আর তীর বর্ষণের মধ্যে নামল রোমের বাহিনী। সিজার জাহাজে আছে। সিজারের বাহিনী আগেরবারের মত ভয় পেলে গর্দান যাবে। এটা সবাই পরিষ্কার করে জানে।

-জয়-পরাজয়ের কারণ কি?

বাহিনী নিশ্চুপ ছিল।সেনাপতিরাও। এ প্রশ্নের অর্থই অর্ধেকের কাছে পরিষ্কার নয়, তায় উত্তর! এই অভিযান শুরুর আগে সিজার হাঁটছিলেন বাহিনীর মধ্যে দিয়ে। রোমের একটা অংশ কত কত বার তাঁর পতন চেয়ছে। তাতে কি? তিনি নেই? সেই যে অভিযোগ এলো যখন, যখন সিজার প্রিটর, তখন ব্যবস্থাকে পালটে দেবার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার দায়ে সিনেটে অধিবেশনে বিচার চলছে একজনের। সেই সময়ে সিজার একটি হাতচিঠি ষড়যন্ত্রকারীকে দেন। মার্কাস কাটো, সিজারের সবচেয়ে কঠিন শত্রু, সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করেন সিজার ষড়যন্ত্রীদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করছে বলে। ব্যাস! সেই চিরকূট খুলে ফেলা হল এবং জানা গেল কাটোরই সৎ বোন ওই চিঠি লিখেছেন অভিযুক্তকে। সেটা একটি প্রেমপত্র। হাস্যকর হয়ে দাঁড়ালো গোটাটা। কিন্তু সেবার সিজার হারলেন। তাঁর প্রবল বাগ্মীতাও ফাঁসির দড়ি থেকে অভিযুক্তদের বাঁচাতে পারলোনা। বেশ! কিন্তু একই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে যখন পরের বছর তাঁর আবার বিচার চায় শত্রুরা, তখন স্বয়ং সিসেরো তাঁর হয়ে স্বাক্ষে বলেন সিজার সব যথাসময়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন। সিসেরো তখন কন্সাল। শত্রুদের মধ্যে একজন, যে সিজারের বিচারের জন্যে নিযুক্ত পরিষদে ছিল, তাকে ফাঁসিতে যেতে হয়। সিজার অক্ষত। বস্তুত অক্ষত থাকতে পারাই তো সিজারকে সিজার করেছে। নীরব সৈন্য আর সেনাপতিদের মধ্যে সিজার দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন,

-পরাজয় শব্দটা একমাত্র পরাজিতদের অভিধানে থাকে একথা না জানা!

(ক্রমশঃ)

350 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: b

Re: কাঙাল নামা ২

ফাতাফাতি।
Avatar: নিরমাল্লো

Re: কাঙাল নামা ২

পরেরটার অপেক্ষা। সিজারের সঙ্গে হরপ্পার সম্পর্কটা এখনো ধরতে পারছি না। কতো কি যে জানা বাকি।
Avatar: শুদ্ধ

Re: কাঙাল নামা ২

ধন্যবাদ দুজনকেই। :)
Avatar: আর্য

Re: কাঙাল নামা ২

খুব ভালো গদ্য।একদম ঝরঝরে।আর সবথেকে ভাল লাগছে এই দেখে যে ইতিহাস,বিজ্ঞান,পরিবেশ এত সুন্দর ভাবে পরিবেশিত,কোন একঘেঁয়েমি নেই।ভারি সুন্দর।এবার যাই পরের কিস্তিতে।
Avatar: প্রলয়

Re: কাঙাল নামা ২

পড়ছি, আশ্চর্য দক্ষতায় দুটো ঘটনা একই গতিতে চলছে।
মনে হচ্ছে একই সাথে উইলিয়াম আর সিজার পাশাপাশি হাঁটছে।
Avatar: Blank

Re: কাঙাল নামা ২

খুব ই ভালো লাগছে
Avatar: শুদ্ধ

Re: কাঙাল নামা ২

যদি আপনাদের আগ্রহ ধরে রেখেও এই নতুন ফর্মটিকে চালিয়ে যেতে পারি তাহলেই আমার পরীক্ষা সফল! অশেষ ধন্যবাদ।
Avatar: সুজন পান্থ

Re: কাঙাল নামা ২

অসম্ভব দক্ষতায় বাগ্মীতাকে ঝর ঝরে করে রেখেছেন, শুভেচ্ছা
Avatar: b

Re: কাঙাল নামা ২

চলুক চলুক।
Avatar: ranjan roy

Re: কাঙাল নামা ২

অপেক্ষায় আছি। চলুক!! অসা!!
Avatar: দ

Re: কাঙাল নামা ২

যাব্বাবা! এইটা তো ৬ নং পর্ব অবধি চলেফিরে শেষ হয়ে গেছে।
শুদ্ধসত্ত্ব'র নামের ওপরে ক্লিকালেই বাকী পর্বগুলো পাবেন খনে।
Avatar: ranjan roy

Re: কাঙাল নামা ২

থ্যাংক ইয়ু, দমু!
আমাদের মত লোকজনের একটু কম্প্যুটারওয়ালাদের সাহায্য না ঃ(((হলে--
Avatar: Ishani

Re: কাঙাল নামা ২

বা: , খুব অন্যরকম ভালো |


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন