ফরিদা RSS feed

প্রচ্ছন্ন পায়রাগুলি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • চম
    চমসিরিয়ে লিওন - ২০১৬, ১ ডিসেম্বর************...
  • সম্পর্ক
    চিরকালই আমার মনে হয়েছে মৃত্যু কোন সীমারেখা, ভেদাভেদের পরোয়া করেনা। আর যে মৃত তার ওপর এই পৃথিবীর কোন লেনদেন, সম্পর্ক,লিঙ্গ,ধর্ম, সমাজ সংস্কৃতির কোন নিয়ম খাটে না। কারণ সে আর কোথাও নেই। আঙুলের ফাঁকে গলে পড়া জল যেমন, শুধু স্মৃতির আর্দ্রতা অনুভব করা যায়। এমন ...
  • অমৃতকুম্ভের সন্ধানে'
    অমৃতকুম্ভের সন্ধানে' ঝুমা সমাদ্দার ১"বিরিয়ানি ? সেটা কি বস্তু হে দেবরাজ ?" "আরে, 'পলান্ন' রে, 'পলান্ন', পুরনো বোতলে নতুন মদ ।"ইন্দ্রের রাজসভায় মেনকার প্রশ্ন শুনে শুরুতেই এক দাবড়ানিতে থামিয়ে দিলেন দেবাদিদেব মহাদেব । অমনি ...
  • ম্যাচ পয়েন্ট
    ম্যাচ পয়েন্টসরিৎ চট্টোপাধ্যায় / অণুগল্প: খবরদার, টাচ করবে না তুমি আমাকে!ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে তুতুল। সুন্দর মুখটা রাগে অভিমানে কাশ্মিরি আপেলের মতো লাল হয়ে আছে। পলাশ কিছুক্ষণ নিজের মনেই হাসল। তারপর জোর করে তুতলকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, রাগটা কি আমার ওপর, ...
  • সুরের ভুবনে
    সুরের ভুবনেসরিৎ চট্টোপাধ্যায় / অণুগল্পদশইঞ্চির স্কার্টটা হাঁটুর চার আঙুল ওপরেই শেষ হয়ে গেছে। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল পরমার। কোনরকমে হাঁটুতে হাঁটু চেপে মেক-আপ রুমে দাঁড়িয়েছিল সে। দীপ্তি ওকে বোঝাচ্ছিল।: দ্যাখ, আমাদের কাছে এই একটাই মূলধন, আমাদের গান। এই ...
  • আমেরিকা, আমি এসে গেছি
    আমেরিকা, আমি এসে গেছিআসলে কী --------------অ্যাকচ...
  • আতঙ্কিত ভীমরতি
    আতঙ্কিত ভীমরতিঝুমা সমাদ্দারপরিস্কার দেখতে পাচ্ছি দু' দু'খানা ইন্ডিয়া। দেশের ভিতর দেশ ।একখানা দেশ শপিংমলে গিয়ে খুঁজে খুঁজে ঢেঁকিছাঁটা চাল ( না হে , দিশী নাম নয় , নাম তার ‘ব্রাউন রাইস’), কিউয়ি-স্ট্রবেরীর মতো সাত-বাসী বিদেশী ফল(গাছ-পাকা পেয়ারা-কামরাঙায় ...
  • হালাল বইমেলায় হঠাৎ~
    অফিস থেকে দুঘণ্টা আগে ছাড়া পেয়েই ছুট। ঠিক দুবছর পর একুশের বইমেলায়। বলবেন, কেন? সে এক মেলা উত্তর, না হয় এইবেলা থাক। আপাত কারণ একটাই, অভিজিৎ নাই!ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেই মধুর কেন্টিনের কথা মনে পড়ে। অরুনের চায়ের কাপে চুমুক দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেখানে ...
  • নিলামওয়ালা ছ'আনা
    নিলামওয়ালা ছ'আনাসরিৎ চট্টোপাধ্যায় / ছোটগল্পপাঁচতারা হোটেলটাকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিল সুদর্শন ছিপছিপে লম্বা ছেলেটা। আইপিএল-এর অকশান হবে এই হোটেলেই দুদিন পর। তারকাদের পাশাপাশিই সেদিন ভাগ্যনির্ণয় হবে ওর মতো কয়েকজন প্রায় নাম না জানা খেলোয়াড়ের। পাঁচতারায় ঢোকার ...
  • এক যে ছিল
    ১অমাবস্যা-পূর্ণিমা নয়, বছরের এপ্রিল-মে মাস এলেই জয়েন্টের ব্যথায় কাবু হয়ে পড়ে হরেরাম। গত তিন বছর ধরে এটি হচ্ছে। ক্রনিক রোগ বাঁধলো নাকি! হরেরামের চিন্তা হয়। অথচ চিকিৎসার তো কোনো ত্রুটি নেই। ...

ধুলোবেলা - ২

Suman Manna

২ - - “ফুল বলে”

“ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া” উনি আসেন নি কখনো নিজে ফুল কিনতে। তাঁর বাড়ি থেকে সোজা রাস্তায় দক্ষিণ দিকে মিনিট দশেক হাঁটলেই তো সার দেওয়া ফুলের দোকান সব। তাই ফুলের দোকানেরা বুঝি বড় আবর্জনাময়। কিন্তু হাওড়া হাটের পাইকারি বাজারের তুলনায় তা নস্যি। সে এক নরককুণ্ড, গোড়ালি অবধি কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে রজনীগন্ধার ডাঁটি, এক গোছা গোলাপফুলের নিচের ডালগুলো পাতা কাঁটা সমেত যা কিনা এখনো সুতো দিয়ে বাঁধা অকারণ। পচে যাওয়া কুঁচোফুল বেশিরভাগই যারা দোপাটি কাদামাটি মেখে একশা হয়ে শুয়ে আছে। আর সেই একফালি জায়গায় এর কাপড়ের গাঁটরি, ওর প্লাস্টিকের প্যাকেট, তার বিশাল ঝুড়ি মিলে মিশে মহা কোন্দল বাধিয়েছে। তার মধ্যেই পথ করে নিতে হয় ক্রেতাদের। তারা তো পরনের ধুতি কিম্বা প্যান্ট গুটিয়ে মাল (ফুলকে এই বাজারে মাল বলা হয়, একটুও বেমানানও লাগে না) কিনে খালাস, এবার বাজারের মুটের দল সেইসব গাঁটরি ঝুড়ি মাথায় করে দাপিয়ে চলাচল করে যাবে, যতক্ষণ বাজার চলছে।


খবর থাকবে কিছু, কিছু বা অচেনা হবে ক্রমে। যেন জলছবি কাগজের ওপর রেখে আধুলি ঘষে ঘষে আস্তে ফুটে উঠবে সব। তারপর রঙ লাগবে – কিছু পরে নাড়াচাড়া করে উঠবে ঠিক। জানি। যেমন দেখি সেইসব গাঁটরি ভরা দু একটা ফুলের গাঁটরি চুয়াল্লিশ নম্বর বাসে উঠে গেল – কণ্ডাক্টর গজগজ করবে খানিক তবে বেলা বারটা বেজে গেছে তো – বাসেও তেমন ভিড় হবে না তাই কিছু পরে চুপ করে যাবে সে তার প্রাপ্যটুকু টুক করে শুনিয়ে দিয়ে আলগোছে। তা নিয়ে মৃদু ফের চাপান উতোর – গলা নামিয়ে।

সেই ময়লা কাপড়ের গাঁটরি যতক্ষণে বাড়ি এল ততক্ষণে এ বাড়ির মহিলাদের রান্নাবাটি খেলা শেষ দুপুরের মতো। এখন কয়লার নিভু আঁচে কাপড় সেদ্ধ হচ্ছে নয়ত সব্জির খোসা শাক ডাঁটা বা নিখাদ কিছু চুনো মাছের বাটি চচ্চরি বাড়ির বাইরের অল্প জমিতে বেড়ে উঠছে আগাছার মতো অবহেলায়। ঠাকুর ঘরের দালানে সেই গাঁটরি খুলতেই ম ম করে উঠবে দেখ – বর্ষায় বেল কুঁড়ি, জুঁই নয়ত সম্বৎসরের রজনীগন্ধারা। এ বাড়ির মহিলাদের আলাদা আলাদা ছুঁচ থাকে ফুল গাঁথার। ছোটরা যারা দুপুরের ঘুম কামাই দিল তাদের জন্যও বাতিল হয়ে যাওয়া ছুঁচ সুতো পড়ে নিল।

যেমন যেমন অর্ডার থাকে সেই অনুযায়ী গাঁথা হয় অভ্যস্ত হাতে। বোঁটা ভাঙা রজনীগন্ধা আড়াআড়ি গেঁথে গেঁথে গোরের মালা হয়। মোটা মালাতে বোঁটা ভাঙা হয় একটু বেশি। সেটাতে আবার গোলাপের লকেট থাকবে। বোঁটা মুড়েও আড়াআড়ি গাঁথা হয় পুজোর মালা।

বিয়ের সীজনে আবার বিরাট চাহিদা বোঁটা অল্প ভাঙা লম্বালম্বি ভাঙা রজনীগন্ধার। সেই রজনীগন্ধার ‘নর’ ফুলশয্যার খাট সাজাতে বা দামী বিয়ের গাড়ি সাজাতে। সেইসব রজনীগন্ধার বোঁটা ভাঙার কাজ পেত ছোটরা। খুব তাড়াতাড়ি তারা সেসব করত আর বারবার তাদের, মা, দিদা, দাদু, পিসিদের জিজ্ঞেস করে চলত – ‘ঠিক হচ্ছে না? – দেখ আমিও শিখে গেছি, তা না?’
তারাও হাতের কাজ না থামিয়ে বলে দিত ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, খুবই ভালো হচ্ছে তো – দেখ ত একবার ভাইকে - আবার ফুল ছড়াতে লেগেছে’।

তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল জুঁই গাঁথা। ওই সরু সরু কাঠির মতো জুঁই কুঁড়ি বিকেল তিনটের মধ্যে গেঁথে নিতে হবে আড়াআড়ি। গাঁথার পরেও সেই জুঁইমালা কাঠির মতো লাগবে। তারপর সন্ধেবেলাতেই তারা ফুটে যাবে ঠিক – ভরে দেবে সব ফাঁক। বাড়ির ছোটরা সেইসব দেখবে বড় বয়েসে।

হাতে ছুঁচ ফুটে যাবে দু একবার। সেই প্রথমবার নিজের রক্ত দেখা হবে – লাল। প্রত্যেকবার মালা শেষ করার পর দিদার ছুঁচে সুতো পরিয়ে দেবে ওরা। দাদু কিন্তু নিজেই পারে সেটা। রজনীগন্ধার হালকা সবুজ বোঁটা এক জায়গায় জরো হবে সব। তাকে দেখে আর রজনীগন্ধার অংশ মনে হবে না। তার গন্ধ অন্যরকম। সে মোটেও অত সুন্দর নয়।

বিকেলের মধ্যে আবার সেই গাঁথা ফুল নিয়ে চলে যাবে সেই ফুল দিয়ে যাওয়া ছেলেটা বা অন্য কেউ। তখন ছোটরা ছাতে গিয়ে বল থাকলে ফুটবল খেলবে কিম্বা দোকান দোকান খেলতে থাকবে। আর শুধু শুধু বাবা কাকাদের মতো ঘন ঘন বেড়াতে যাবে ট্রেনে গিরিডি, মধুপুর, গৌহাটি দেওঘর এইসব জায়গায়।

আর এইসব খেলার জন্যই সেই প্যাচপ্যাচে দোকানে যাওয়ার মজাও থাকে ছোটদের। সারি সারি ফুলের দোকান রাস্তার একপাশে। মাঝের সেই মস্ত বিছে হ্যারিসন রোড ট্রামলাইন বুকে নিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে ট্রামের তারে লম্বালম্বি কাটা আকাশ একফালি। সেই রাস্তা রোদ্দুর দেখে দিনের মাত্র ঘন্টা খানেক। আর দেখে প্রচুর মানুষ কাজে অকাজে এপাশ থেকে ওপাশ বিভিন্ন গতিতে চলাফেরা করে। গাড়ি বাস, ঠেলা টেম্পো ট্যাক্সি এদের সবার গতিও প্রায় মানুষের পায়ে হাঁটার মতো, কখনো কখনো তার চেয়েও কম। তখনও এই রাস্তায় ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক হয়ে যায়নি। দোকানে বসে এইসব দেখে সেইসব ছোটরা। মাঝে মধ্যে দেখে বলে এইসব তাদের বড় ভালো লাগে। এদের দোকানটা সেই সারির একদম শেষমাথায়- তার পাশেই একটা দুধের দোকান- সেখানে বিশাল উনুনে সারাদিন শুধু দুধ জ্বাল দেওয়া হয় বিরাট কালো কড়াইতে। মাঝে মাঝে একটা চ্যাপ্টা কড়াইতে গাঢ় দুধ ঢিমে আঁচে থাকে একজন খুন্তি নেড়ে নেড়ে সরগুলো কড়াইয়ের পাশে তুলে তুলে রাখে, রাবড়ির জন্য। দোকানের সামনে মাটির বড় গামলায় দই থাকে। বরফ আর সেই দই চিনি দিয়ে এক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রেখে মন্থন করে করে অমৃতসম লস্যি উৎপন্ন করে – তা দেওয়া হয় মাটির ভাঁড়ে – পরিবেশনের আগে তার ওপর দইয়ের মাথার সর ভাসিয়ে দেওয়া হয় আলগোছে। সেই সরটা আগে খাওয়া ভালো নাকি লস্যি ফুরিয়ে গেলে সেটা ভাঁড়ের থেকে চেটে খাওয়া ভালো সেই সমস্যার সমাধান এখনো অবধি পাওয়া যায় না।

পরেশনাথের শোভাযাত্রা বেরোলে ছোটরা যায়। সেই শোভাযাত্রা বেরোনর আগে দোকানের ভিতরের ঘরেও অনেক মজা থাকে তাদের। সেখানে কিবা দিন কিবা রাত হলদে ডুমের আলো জ্বলে। বিভিন্ন রকমের ফুলের গন্ধ সেই ঘরে ডাঁই হয়ে থাকে বেরোনর জায়গা না পেয়ে। তার সঙ্গে থাকে পান আর জর্দার গন্ধ – দোকানের কারিগর আআর বাবা কাকাদের সৌজন্যে। সেখানের মেঝে কী ঠান্ডা। ফুল গাঁথা হচ্ছে ঝড়ের গতিতে প্রায়। কিন্তু এই ঘরের প্রধান আকর্ষণ ওই ঠান্ডা কালো ভারি টেলিফোন। রিসিভার কানে নিলে গভীর কিরকিরে ডায়াল টোন কী এক সংকেতের মতো বাজে। ছোটরা তো সেই দোকানের ছাড়া আর কোনো ফোন নম্বর জানে না – তারা আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক থেকে শূন্য অবধি ডায়াল করে হাতের আঙুল ব্যথা করে ফেলে যতক্ষণ না পরেশনাথ আসছে বলে তাদের বাইরে ডাকা হয়।

ধুলোবেলা ৩

এখন বৃষ্টি নিয়ে কী করব আমি? কোথায় রাখব এত এলোমেলো হাওয়া – এত জলের ছাট আর কত গুছিয়ে তুলব ভাঙা তোরঙ্গময় হাড় জিরজিরে অক্ষর পড়ে আছে এতদিন হল। এই জলের ছাট, এত হাওয়া তাদের মাতাল করে তুলবে – মেরে ফেলবে একেবারে। নষ্ট হতে দি, তাহলে? মুখ ঘুরিয়ে রাখি পাতার থেকে ঝরে পড়া জলের ফোঁটাকে বলি - আর আসতে হবে না তোমায় কাল থেকে – তোলা জলেই বাসন মেজে নেব – একটু টানাটানি যাচ্ছে বলে।

না বৃষ্টি, না হক আর পাগল দামসানো ঘর। না আসুক ভিজে সোঁদা গন্ধরা হাড়ের কুঠুরিময় এত। পাগল তবু ঝরে যায়। বুকের খাঁচা ভরে ওঠে স্রোত – এতখানি ঘোলাজল সর সর করে মাটিতে অক্ষর লিখে লিখে নেমে গেল দাওয়া থেকে – এভাবে একের পর এক দাওয়া থেকে অন্য অন্য অক্ষর লিখে রাখা ধারাদের সঙ্গে পরিচিত হবে ক্রমে – কথা হবে কিছু, কিছু বা অব্যক্ত শব্দেরা চিরকালীন প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত হয়ে শোভা বাড়াবে দেখ। হাওয়া দেবে কত। খবর ছড়াবে হাওয়ায়। গন্ধ ছড়াবে তার এইভাবে অকারণ। ডুবে যাবে যাবে করে দেখতে দেবে না আর জানলা খুলে রাখতে দেবে না আর, জানি, সেইখানে ভেসে গেছে কথা, চায়ের গেলাস দেখ ধুয়ে গেল জলেই একাকী।




সাতকাহন করতে বসে সকাল কলতলায়। কাজকামের তেমন জুত নেই আজকাল। আলাপ চলে অনেকক্ষণ ধরে খবরের কাগজের সাথে। কপাল ভালো থাকলে সাড়ে নটা দশটার মধ্যেই জলখাবার জুটে যায়, পাউরুটি ডিম বা রুটি তরকারি কিছু একটা হলেই হল। তেমন সুবিধা যেদিন হয় না তখন অন্য খেলা – হয় না মানে সেদিন হয়ত হেব্বি বাওয়াল হয়ে গেছে আমি ঘুম ভাঙার আগেই। ছুতো তো কিছু লাগে না, বস্তা বস্তা বারুদ ঘর পিঠোপিঠি, তুষের বাড়ি, সামান্য ফুলকি হলেই দাউ দাউ। তারপর ধিকি ধিকি ধিকি। বেঁচে আছে তো, তাই।

এইজন্যই, এখানে বৃষ্টি শুরু হলে শেষ হয় না। গরম পড়লে চলে লাগাতার। এমনকি লোডশেডিং হলেও তিন চার ঘন্টার ধাক্কা। সূর্য ডুবলে একফালি ছাতে চলে যাওয়া যায়। চৌকো পাথর বসানো ছাত, তেতে থাকে কিছুক্ষণ। তবে মানুষ নয় বলে ঠান্ডাও হয়ে যায় আটটার মধ্যেই।

পড়াশোনা থাকে। লোডশেডিঙের সময় হারিকেন জ্বেলে ছাতে কিছু একটা পেতে পড়াশোনার চেষ্টা থাকে। মাঝ আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডলের অনন্ত জিজ্ঞাসা থাকে। ঘরের স্থল-ফোন ঠিক থাকলে আচমকা ফোন আসার প্রত্যাশা থাকে। যদি সেই ফোন এসেও যায় তবে সাবধানে অন্ধকারের মধ্যে নীচে নামা থাকে, শব্দ শুনে শুনে ফোনের কাছে আসাও মনে থাকে শুধু।

এসব তেমন কিছু নয়। যা বলা যায় তোমাকে, যা শোনানো যায় – এ যেন স্বগতোক্তি ধরণ। না হলে দেখ ঘটনাপ্রবাহ তো আর বলে কয়ে আসেনা এখানে। যখন আসবে দেখো, কথার পিঠে কথাও আসবে এত – আমি ভুলে যাব কিছু ফেলে আসব হয়ত আসল ঘটনার খেই মাঝরাস্তায়। আপাততঃ এত কাছাকাছি থাকে সবাই যে চিঠিও আসেনা প্রায়ই। ‘প্রায়ই’ শব্দটি পরে হয়ত কাজে লাগবে ভেবে এখানে রইল যেন।

তবে ফোন আসে। ফোন করে কথা বলার ইচ্ছেরাও আসে। কিন্তু যে নম্বরের ইচ্ছে সে নম্বরের সময় তো আর তখন থাকে না। শুধু ইচ্ছেরা থাকে। কাছেপিঠের ছোট খাটো ইচ্ছেরা যেন বাসে উঠে এদিক ওদিক যায়, আসে, কখনো একা একা ঘুরে বেড়ায় চেনা রাস্তায়।

চেনা রাস্তার সুবিধা আছে বইকি। পা চেনে এইসব রাস্তা, রাস্তা সংলগ্ন কৃষ্ণচূড়া বা অশ্বথ গাছের শিকড় বহুলতায় গড়ে ওঠা ফুটপাথের ফাটল, এর প্রতিটি বাঁক চেনে পা। ঘাড় চেনে চেনা মানুষদের এখানে খুব, মুখোমুখি হলে অজান্তেই হেলে পড়ে সে। তাই চিন্তা ভাবনা ছুটে যায় অনায়াসে – যেন মাঝরাত্তিরে ট্রেন পেরোচ্ছে এক বিরাট নদী গুম গুম শব্দে – যাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় আর ফেরার উপায় নেই – আর কেউ চেনা থাকবে না অন্ততঃ এই জায়গায়।

তাই মেতে ওঠা থাকে। মৌতাত ছুটে গেলে থাকে ফেরার চিন্তা। তবে তার আগে রাস্তা নদী হয়ে যাবে। নোঙর আটকে ঠিক দাঁড়িয়ে থাকব, তবে ঢেউ এত এলে মাঝে মাঝে কি দুলে উঠব না? বাড়ি ফেরার ভাড়াটাও গেলাসে ডুবে গেছে বলে সেই নদী বেয়ে বেয়ে সন্ধে উঠে এল, গায়ে লাগে চাপ চাপ অন্ধকার। অজান্তে অনেক অনেক রাস্তা এসে পথ আটকে দাঁড়াল বুঝি নিঝুম জলের কাছে।

ঘুম পায়। ঘুমের কাছে যেন নিম গাছ শুয়ে আছে বেঁকে চুরে। জানলার পাশেই বিছানা। বসে থাকলে পথ চলতি মানুষ চোখে পড়ে। পাড়ার মধ্যে হেঁটে যাওয়া মানুষ। এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া চলাচল করা মানুষ দল বেঁধে, মাঝে মাঝে একা। বেশির ভাগ সময়ে অকাজেই অকেজো মানুষ মাঝে মাঝে কাজেও চলাচল করে। তাই দেখা হয়, বোঝা যায় না। শুয়ে শুয়ে বরং দেখা যায় নিম গাছের ডাল পাতা সমেত ঝিম মেরে আটকে আছে চিপচিপে আকাশে। ঘুম পায়, পায় বুঝি।

চকচকে কাগজের মোহর এসে ধরা দেয় একফাঁকে। স্ব উপার্জিত। সোম থেকে শুক্র দুটো ভারি বেয়াদপ কিন্তু মিষ্টি অবাঙালী বাচ্চাদের সঙ্গে পড়া পড়া খেলতে হয়। সারা মাস যখন মনে হল আর যেন শেষ হবেনা তখন ই হঠাৎ একদিন মোহর এল হাতে। কত কী না করা যায় দুশো টাকায় ছশো মজার মতলব এসে মাথায় গিজগিজ করে। যাকে খুশি করব বলে ভাবি অন্যরা ভারি বাগড়া দেয়। যেমন চলছি তেমন ই চলতে থাকে কাজেই – সেই একটাকার বিড়ি, সেই বাসে উঠলেই টিকিট না কেটে নেমে যাওয়ার ছক – সেই আর দুটো স্টপ পরে বাসে উঠব – সেই স্টপ এসে গেলে – এইত আর একটুখানি – এটুকুর জন্য বাসে উঠতে গায়ে লাগে না বুঝি? সেই অভিমানী মোহরগুলোয় শেষ অবধি আলু পটল চারাপোনায় খরচা হয়ে যায়।

প্রেম হয়। খুব প্রেম হয় তখন। চকিতে দেখেই ওই ন্যানো সেকেন্ডেই ঝাঁপ দিয়ে ফেলি প্রায়শই। তারপর বেশ কিছুক্ষণ রাস্তার দুপাশে ফোয়ারা, গান ভেসে আসে দূর থেকে সলিল চৌধুরি বা রবীন্দ্রসঙ্গীত। গরমকাল হলে হঠাৎ মেঘ করে আসে তখন বৃষ্টিছাট আসে। আকাশে চোখ বন্ধ করে তাকালে বৃষ্টিপান করা যায়। ব্যস। আর ফিরে দেখা হয় না তাদের। পরের প্রেম অন্য। তাতে অন্য কিছু হয়। সব কিছু বলা যায় না সহজে।

একটা ঝুলবারান্দা থাকে বাজার যাওয়া আসা রাস্তায়। বছরে তিনশোবার বাজার গেলে ওই ছশো বারের মধ্যে বার দুয়েক তাকে বারান্দায় পাওয়া যাবেই। নিশ্চিত। যেদিন দেখা যায়, সেদিন আর তাকাতে হয় না। তার অপলক তাকিয়ে থাকা টের পাই যেন। সেদিন রাস্তার সব নুড়ি পাথর মায় কাগজের টুকরো, উড়ে যাওয়া প্লাস্টিকের প্যাকেট সব কিছু কত মনোযোগ দিয়ে দেখি। এর আগে যিনি বাজারের ব্যাগ নিয়ে চলে গেছে, তার ব্যাগ থেকে লাল শাকের পাতা ছিঁড়ে পড়ে থাকে বেওয়ারিশ। মাড়াই না আর। সেদিন আর সাইজমতো নুড়িতে শট মারাও যায় না – এটাই যা একটু সমস্যার।

তবু মাঝে মাঝে বইয়ের পাতা উলটে যায়। অনুমতি মেলে গুরুজনরহিত বেড়াতে যাওয়ার – প্রথমবার। যদিও গরম নেহাৎ কম নয় জুনের শুরুতে। তবুও রেস্ত অনুযায়ী ছোটনাগপুর অঞ্চলের নদীবাঁধ সংলগ্ন মুকুটমণিপুরই সব্যস্ত হল। ওখানে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে পৌছন যায় আর ইয়ুথ হোস্টেলে মাথাপিছ ছ’টাকায় ডর্মিটারির বিছানা মেলে বলে। ট্রেন হাওড়া ছাড়তেই চোখের আড়ালে চলে যান ওঁরা। উত্তেজনায় সারারাত কাটে জানলার লোহার গরাদে গাল ঠেকিয়ে – ফুরফুরে হাওয়া খেলে যায় চোখে মুখে। রাতের ট্রেনে দূর দুরান্তের মন কেমন করা আলোরা কী যে সব ছাইপাঁশ ইশারা করে, বলতে চায় বুঝতে পারি না। মধ্যরাতের নিঝুম স্টেশনে ট্রেন থামে – যেখানে মালবোঝাই ট্রলিতে ঠেস দিয়ে বড় নিরাপদ ঘুমে তলিয়ে যায় দেহাতী মানুষ। ওই মাঝরাতে “গরম চা” চলাচল করে খোলা জানলা ধরে ধরে। মাঝে মাঝে থামে।

ক্রমে ক্রমে সাদাকালো ঝাপসা ছবির অবয়বে ফুটে ওঠে গাছেরা। তখন হলদে আলোর ফুটকিরা মৃদু হয়ে গেছে। আলাদা করে আকাশ বোঝা যায়, দিগন্তরেখা খুঁজে পাওয়া গেল সহসা। তারপর সেইসব গাছপালা, ধুলোপথ, মাঠ শুন্য চাষের জমি যে যার মতো রঙ খুঁজে পেয়ে মেখে নেয়। ট্রেন ছেড়ে আসি। বাসে ওঠার আগে বাসস্ট্যান্ডের টিউকল থেকে গণ দাঁতমাজা বড় আমোদের।

নগদে সওদারা এভাবেই আসে যায়। এভাবেই খরচা হয় ব্যাঙের আধুলিময় এক ধুলোবেলা। এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে একসঙ্গে উঠে পড়ি আমরা – যেন সিনেমা দেখতে বেড়িয়ে বাসে উঠছি। মাঝরাস্তায় কেউ যেন নেমে পড়ে – বোধ হয় অন্য কোথাও যাবে। তাড়া আছে। এক স্টপেজ এলে আমাকেও নেমে যেতে হয়। আবার অন্য বাস। অন্য অন্য কড়িবরগা, কী পুরনো বিরাট বিল্ডিং, কী বিরাট মাঠ, মাঝখানে আবার খাটো বাঁশে ঘেরা একটা জায়গা – ওখানে সত্যিকারের ক্রিকেটের পিচ আছে।

এখানে দেদার র্যা গিং হয় কিন্তু। একটু চেপেচুপে থাকা, আর কি। কি দরকার খামোখা বাওয়াল দেওয়ার। চেনাজানা হয়, ট্রেনে রোজ রোজ চাপা যাবে এবার থেকে – কম কি। হোক না লোকাল ট্রেন, নাই বা থাক দিগন্তরেখা পর্যন্ত চষা জমি আর মাঝে মাঝে বিরাট বটগাছ যার তলা বাঁধানো আর পাশে একটা রাস্তা খলবল খলবল করে এগিয়ে দুটো পাশাপাশি টিনের চালের সামনে গিয়ে ফেড আউট করে যায়।

ক্লাসে জানলার পাশে জায়গা পেলে শুধু মাঠে চোখ পড়ে যাবে। আর নয়ত ফার্স্টবেঞ্চে ছটফটে রোগা মেয়েটার কানের পিছন থেকে উঁকি মারা চশমার ডাঁটিতে। কিছুদিন পরে জানা যাবে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের তোমাকে চাই এর পরের ক্যাসেটগুলো (যেগুলো চাকরি পেয়ে কেনার প্ল্যান ছিল আমার, ক্যাসেটের দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছি) তার বাড়িতেই রয়েছে। আর আছে একগাদা বই। যেগুলো চুরি ডাকাতি করলেও পাপ লাগে না আমার।

চুরি করতে হয় এবার। সময় চুরি করে পুরনো বাসাতেও যেতে হয় – সেখানের কথাবার্তা ভরে নিতে হয় ঝোলায়। শিকড় চুপচুপ করে টেনে নিতে হয় পরিচিত রসস্রোত। নতুন জায়গা খারাপ নয়, তবে এখানে জলের স্বাদ আলাদা। কত কত আলাদা আড্ডা, নানা রঙের, নানান ঢঙের। দূর থেকে দেখে নক্সীকাঁথা মনে হয় বটে তবে তাতে মিশতে গেলেই দেখি আর মেলে না।

ধুলোরঙ বড় সাধারণ যে।

এতে ফাঁক বাড়ে। মনে হয়েছিল এক বাস থেকে অন্য বাসে ওঠা মানেই ব্যস। আর কিছু করার নেই এবার জানলার ধারের সীট নিয়ে মাঠ ঘাট কুকুর ছাগল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাওয়া যায় আর সেই বাস নিজে নিজে চলে আমাকে একটা দারুণ ছিমছাম অফিসে এনে পৌছে দেবে আর টুপ করে তখন কি একটা প্রেমও জুটে যাবে না?

মাঠেরা এখন বড় হয়ে গেছে বর্ষার পরে, রাস্তা ভেঙে ভেঙে এবড়োখেবড়ো সবুজ রাস্তার বুকে বুকে আঁক কষে গেল – বুড়ো হাড় জিরজিরে ঝিলপাড়ের রাস্তা তাকে আশকারাই দেয়। নিজের সৌষ্ঠবে তার আর মন নেই। তারা সারা গায়ে গলায় মাথায় সবুজ ছিটের দাগ লেগে থাকে। সেই রাস্তার পাশেই ঝিল আর তার ওপাড় বলে কিছু নেই সোজা পাঁচিল ঊঠে গেছে। রাস্তার শাসন না থাক অবস্থান আছে বলে এখনো তাকে খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু ঝিলের পাড়ে সেসব কোনো বাধানিষেধ নেই বলে ঝোপ জঙ্গল বেড়ে গেছে অনেক। ঘাটের সিঁড়ি কিছু কিছু ভেঙেছে আর বেশিরভাগেরা গেছে ডুবে। সেখানেই কাদা মাখামাখি ফুটবলের পর সাফ সুতরো হতে আসে ছেলেরা। বেলা ছোট হয়ে যাচ্ছে আজকাল, মোটামুটি চান সেরে ফের সেই চটা জিনস আর টি শার্ট চাপাতে চাপাতেই সন্ধে হয়ে গেল আর তারপরেই পেল খিদে।

সে খিদের হাত পা মাথা মুখ কিছু নেই শুধু দাঁত। কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে সে কিছু না পেয়ে পেটের খোঁদল থেকে খুঁড়ে বের করতে থাকে কিছু মিছু – মুখে জল কাটে ওর। এসব কথা তো আর বাকিদের বলা যায় না। পকেটের সবটা খুচরো পয়সা, ছোট দু একটা নোট তার মনে থাকে। তার মধ্যে থেকে সবচেয়ে সস্তায় কিসে পেট ভরে সে জানে, কিন্তু তার আগে বাকিদের চলে যেতে দেয় সে। একটা বিড়ি জ্বালায়, গা গুলিয়ে ওঠে এতে। বিরাট মাঠটা এখন আলো বুকে নিয়ে জেগে পাশের রাস্তায় আলো নিভু নিভু। চুপিচুপি ক্যান্টিনে যায় সে, পিঠে ব্যাগ, আঙুলে ঝুলছে ভিজে শর্টস আর গেঞ্জী ভরা প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট। কোয়ার্টার পাউরুটি আর চা নিয়ে বসে বসে রাত হয়ে যায়।


ধুলোবেলা ৪

লেখারা কোথা থেকে আসে? তার জন্য কি অপেক্ষা থাকে, নাকি জোগাড় যন্ত্র করে সামনে যাকে পাওয়া যায় তাকে দিয়ে শুরু করা যায়? আর যদি সে আসে সে কি অবস্থায় আসবে কতদূর থেকে আসতে হয় তাকে। সেই কোন ভোররাতে নাকে মুখে কিছু গুঁজে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে সে। আলো তখনও ফোটেনি ঠিক করে। পাতলা সরের মতো কুয়াশার ছাত ঢাকা পুকুরের পাশ দিয়ে – কোনকালে সেই ইঁট পাতা হয়েছিল সেই ভাঙাচোরা রাস্তায় গ্যাটিস লাগানো টায়ার হাঁফিয়ে উঠতে উঠতে সে পৌছবে স্টেশনে – ফার্স্ট প্যাসেঞ্জার আসার দু নম্বর ঘন্টা হয়ে গেছে ততক্ষণে।
তারপর – যাবতীয় সব্জীওয়ালার পসরা, স্কুল কলেজের ছেলেপিলে, কল কারাখানায় খাটতে যাওয়া মানুষের সঙ্গে সে যখন এসে দাঁড়াবে – তাকে কি লেখা যাবে – তখনি? একটু জিরোতে দেওয়া যায় না?

তুমি জানতে ....

সে থাক। আমি সেই অন্য ছেলেটার গল্পতে আসি। তার হাঁটার অভ্যেস হয়ে গেল দাদুর সঙ্গে দোকান থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে। ইলাপিসির বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে। স্কুলে তো অর্ধেক দিন ছুটিই থাকে গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, ডিসেম্বরের অ্যানুয়াল পরীক্ষার পরের ছুটি এসব ছাড়াও ছিল মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার হাফছুটিগুলো। সেইসব দিনে বাজার যাওয়া হত আর সেই বাজার করার ফাঁকে অঙ্ক শেখা হত – সাতটাকা কিলো বেগুন হলে সাড়ে সাতশোর দাম কত হবে হিসেব শেখা হল।

সবুজ আনাজ নিয়ে চেক লুঙী আর সাদা ময়ালাটে হাফহাতা গেঞ্জী পরে বসা ক্ষয়াটে চেহারার লোকটাকে দাদু বলছে – পরী, সেদিনের বেগুন তোর কানা ছিল – আজ আর কিছু নোবো না তোর থেকে – বলে পাশের গোবিন্দর দোকানে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। গোবিন্দর স্বাস্থ্য ভালো, সে অল্প হাসছে আর সেই পরী তার আনাজপাতির পসরা প্রায় উড়ে গিয়ে পার হয়ে সোজা দাদুর সামনে – আমি কি বেছে দিলাম – সেদিন তো সব নিজে নিজে বেছে নিলে। দাদু – তা বলে তুই ওজন করার সময় দেখবি না? -

গোবিন্দর দোকানে তাও দাদু যাবে না জানি। তার অল্প হেসে ওঠার মানেটাও জানা হয়।

মুদীর দোকানে ডালনুনতেলমশলার মেলানো মেশানো এক তেলচিটে গন্ধ। দাদু এখন নন্দীর দোকানে। তার সারা মুখে গুটিবসন্তের দাগ। তার পদবীর আগের নাম আজ অব্ধি জানা হল না – কিন্তু এখনো নন্দী শব্দটায় সেই তেলচিটে মশলার দোকানের গন্ধ আর গুটিবসন্তের দাগ মিশে থাকে।

একটা পাঁইট মাপের চ্যাপ্টা তেলের শিশি ঝোলা থেকে বের হত। তিনশো গ্রাম সর্ষের তেল দৈনিক বরাদ্দ ছিল সেই সাড়ে ষোলোবর্তি পরিবারটির। বাকি সব ডাল মশলা পোস্ত।

আনাজ, মুদীর দোকানের শেষে মাছের বাজার। তার দুটো অংশ। পাকা উঁচু দোকানের লাল দালান। তার ওপর কলাপাতায় সাজানো মাছ। জোরালো আলো পড়ছে মাছের ওপর। বড় বড় পোনা মাছ – তাছাড়াও ভেটকি ইলিশ এইসব কুলীন মাছ। দাদু এই বাজারে একবার ঘুরে যাবে। এখান থেকে মাঝে মাঝে কেনা হয়, বড় মাছের তেল, ডিম কিম্বা মাথা। তখন ওবেলা কেউ এসে আর একটু তেল কিনে নিয়ে যাবে।

দাদু যেখান থেকে মাছ কেনে – সেটা সত্যিকারের মেছোবাজার – জলে কাদায় চিরপিছল চত্ত্বর। সরপুঁটি, খয়রা, কই (তখনো কুলীন শ্রেণীতে জায়গা পায়নি) ট্যাংরা, বাটা, পার্শে, বাণ, গুলে, মৌরলা, পায়রাচাঁদা, ভোলা দেদার মাছ। রোজ কেনা হত বলে একরকম ই বেশিরভাগ দিন। বাড়ি ফেরার পর মাছ কাটা হবে।

মাছের ব্যাগ আমার হাতে। ফেরার পথে বাজারের গেট থেকে কুমড়ো ফুল বা অল্প নটে শাক পাট শাক নেওয়া হল কোনো কোনো দিন।

এইসব রোজকার ব্যাপার। উৎসব হল সেইদিন যেদিন ফুলবাগানে যাব বিকেলের দিকে মাংস আনতে। মজিদ দাদুকে দেখে গল্প শুরু করে দেবে আর তার এক চেলা ঝুলন্ত খাসি থেকে মাংস কেটে কেটে ওজনে চাপাবে। একটু মেটে নেওয়া হবে শেষকালে। তারপর উর্দু খবরের কাগজে সেটা মোড়া হবে সিলিন্ড্রিক্যাল চেহারায়। সেটা সোজা ব্যাগে চালান। এক কিলো আড়াইশো বা দেড়কিলো বলতে কতটা ওজন বোঝায় শেখা হবে আমার।

এর চেয়েও বড় উৎসবও ছিল। প্রায় সাড়ে আটটা নটা নাগাদ বাবা হয়ত বাড়ি ফিরল একটা বড় ইলিশ নিয়ে। বছরের প্রথম ইলিশ হলে তাকে পুজো করা হবে তেল সিঁদুর দিয়ে, মুখে পান গুঁজে। তারপর কাটা হবে সেটা। সেই মাছ কাটা দেখব আমরা কয়েকটা কুঁচোকাঁচা। ডিম পাওয়া গেলে খুব খুশি। ওতে কাঁটা নেই বলে আমরাই পাবো মাছের ডিমের সবটা। অতিরিক্ত। মাছের পিস ছাড়াও।

সেই মাছ ভাজা হতেই অপেক্ষাকৃত ছোটোদের খেতে দেওয়া হল। আমরা তো বড়। ঝালের মাছ খেতে পারি। ভাতের সঙ্গে কাঁচালঙ্কা চিবিয়ে খেতে একবার চেষ্টা করে নালেঝোলে হয়েছি সবে।
ছোটরা খেতে বসলে কাছাকাছি থাকা যাবে না। মুখের ভেতর জল কাটতে শুরু করেছে তখন। আমাদের ডাল ভাত মাছের ডিম ভাজা খেতে খেতেই রান্নাঘর থেকে মাছের ঝালের জায়গা এসে ম ম করে দেবে খাওয়ার ঘর।

ক্রমে ক্রমে স্কুলের ক্লাস বাড়বে। নম্বর কমতে থাকবে দ্রুত। কিছুদিন ধরে মা বলছিল বটে কোমরে ব্যথা কোমরে ব্যথা – হঠাৎ করে একদিন দেখা যাবে বিছানার ধারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে একটা একটা পা ধরে তুলে দিতে হয়। বিছানার ধারে পিছনে বালিশ দিয়ে মা বসে থাকে সারাদিন। পড়াশোনার পোয়াবারো আমাদের। নিজে নিজেই তো পড়াশোনা করে নেব আমরা।

এদিকে সদ্য টিভি এসেছে তখন। পাড়ায় আমাদের বাড়িতেই এল তিন নম্বর টিভিটা। কিন্তু আমাদের সেটটা নাকি সব চাইতে ভালো। ইসিটিভি – অপ্সরা। এক সোমবার সেটা লাগানো হল – তারপর সাড়ে ছটা যেন আর বাজতেই চায় না। ওই তো শুরু হল। অ্যান্টেনা আর একটু ঘোরাতে হবে না। একজন ছাতে চলে গেল। বাকিরা নিচে – আর একটু ...আর একটু ...। হ্যাঁ ... । ঠিক আছে। এই কি করলি ফের... চলে গেল ছবি। আগেরটাই তো ঠিক ছিল... এইসব। তারপরে পল্লীকথা টথা সব গোগ্রাসে গিলে নেব আমরা। একটু পরেই দেশ বিদেশের খেলা। ভাবলাম মোহনবাগানের বিদেশ খেলবে বোধ হয়। ওটাই তো বিদেশ। কিন্তু না। কোথাকার এক নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা দেখে দেখেই খাওয়ার সময় হয়ে গেল।

টের পাওয়া গেল হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার সময়। অঙ্ক খাতা বেরোলে মনে পড়ল পরীক্ষায় যে সংখ্যায় অঙ্কগুলো অর্ধেক করার পরেই আটকে যাচ্ছিল সেগুলোতে শুধু শূন্যই মিলেছে। খাতা সই করানর কথা ভাবতেই চাপ। অনেক সাহস করে নিয়ে গেলাম। এক ঝলক দেখেই বাবা দেখলাম বল্ল – “তেমন ভালো তো হয়নি, আরো ভালো করতে হবে।“

ভাবলাম কোথাও একটা গন্ডোগোল হচ্ছে। খাতাটা সোজা করে দিতেই “তেমন ভালো হয়নি” একাশি এক ঝটকায় একেবারে আঠেরো হয়ে পথে বসিয়ে দিল।

ধুলোবেলা ৫

ঘুড়ি ওড়ে, তুমি ভালো আছ বলে
ঠিকানা বদলে গিয়ে কানামাছি সাদাকালো ঘরে
নৌকা ভিড়েছে বলে হাতি ঘোড়া সৈন্যরা এল
জমকালো বাজনা বাজিয়ে – যদি মনে পড়ে –

শুধু অনন্ত রাস্তা ছিল এক। ভরপেট খিদে নিয়ে হেঁটে যাওয়া নেশা ছিল অত্যন্ত কাছের। সেটা একটু ঝুঁকে যেতে থাকল ক্রমে ক্রমে – রাস্তা আপন হলে খোয়া সাড়া দেয়, ছোটোবড় ইঁটের টুকরো, ধুলোবালি। রোদ্দুরে রাস্তায় অভ্রদানা চকচক করে – সিকি আধুলির মতো। সত্যিকারের দশ বিশ নয়া পাওয়াটুকু মনে থাকে খুব।

যাওয়ার জায়গা কি কম? পড়তে যাওয়া আছে, কাছেপিঠে বন্ধুর বাড়ি আসা যাওয়া আছে, বাজার করা রেশন যাওয়া কেরোসিন আনা আছে। অনেক্ষণ বই টই পড়ে সামনের পার্ক থেকে ঘুরে আসা আছে।

রাস্তাটি চেনা – তার মেজাজ মর্জি কিন্তু রুটিনমাফিক নয়। ইচ্ছে করে ফিচেল হাসি হাসবে পায়ের ডগায় হাজির করবে নিপাট গোলগাল নুড়ি, এক শটে সে কিছুটা গড়িয়ে যাবে – আবার এগিয়ে গিয়ে পরের শট। তার মেজাজ ঠিক না থাকলে সে বেঁকে গিয়ে এমন এক কোণে চলে যাবে আর তাকে শটের নাগালে পাওয়া যাবে না। তা বলে থেমে যাওয়া তো যায় না – এক চ্যাপ্টা ইঁটের টুকরো সামনে এল তো সেও চলবে।

যা সামনে সহজে আসে নিজে থেকে তার তুলনা আর কিছুতে হল না। দূরে যা থাকে তা হয়ত দুরেই ভালো দেখায়। চাইলে ভালো দেখায় না, আসার নয় যা, চাইলে হয়ত অনিচ্ছায় এল – খুব বিড়ম্বনা। উৎসব যেমন। ক্যালেন্ডারে যতদূরেই থাকুক না কেন নিজে নিজেই সামনে আসবে। শুরুতে ধীরপায়ে, যেন গ্রীষ্ম আর যেতেই চাইবে না সেবারে। বৃষ্টি না হওয়া দিন যেমন দীর্ঘতর হয়। পাল্লা দিয়ে লোডশেডিং বেড়ে চলেছে। বিকেল থাকতে থাকতে হারিকেনের পলতে গোল করে কেটে, কাঁচ সাফ করে তেল ভরে রেডি রাখা থাকে। জুটমিলের ভোঁ বাজে পৌনে দশটায় তার আশেপাশেই হঠাৎই ঝুপ করে অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক মুহূর্তে সব ফ্রীজশট। হাতরে হাতরে রান্নাঘর থেকে দেশলাই খুঁজে নেওয়া হয়, লম্ফটা আগে জ্বলে – সেটা থেকে হারিকেন গুলো একে একে জ্বলে ওঠে।

পড়তে বসার সময় লোডশেডিং হল তো ছাতে চল, বগলে মাদুর হাতে বইখাতা কিছু। পরের খেপে জলের বোতল আর হারিকেন। তার আগেই মাদুর বিছনো হয়েছে। হাওয়া আসছে, শিখা কেঁপে কেঁপে বইয়ের লেখাগুলো নাচে। পড়া এগোয় না আর।

হাজার হাজার চিন্তা ভিড় করে আসে। সাইকেল চালানো তো শেখা হল – কিন্তু সাইকেল একটু গড়িয়ে দিয়ে চলন্ত সাইকেলে ওঠা শেখা হল না। এদিকে পাড়ার পার্কে ছোটো ভাইদের সঙ্গে ফুটবল তাও বা খেলি কিন্তু স্কুলের মাঠে ক্লাসের শেষের খেলায় কেউ টিমে নেয় না। হোমওয়ার্ক ভুলে যাই। ক্লাস টেস্ট মনে থাকে না। এত সমস্যা হয় আজকাল – বলব কাকে, শোনার সময় আছে কার। সময় থাকলেও এসব কেউ শুনতে চায় না কিছুতেই।

এইসবের মাঝেই হঠাৎ বইতে লেখা অক্ষরগুলো কেমন নাড়াচাড়া শুরু করে দেয়। বই থেকে উড়ে যাবে নয়ত, তাই বই বন্ধ করতে হয়। হারিকেন কম করে দিই, চিৎ হয়ে শুই মাদুরে – আকাশের তারাগুলো নেমে আসে ক্রমে আরো কাছে।

আর মনে পড়ে ঘুড়ি ওড়ানোটাও পারা গেল না।

হাওয়া থাকলে আর ঘুড়ি ফিট থাকলে ওড়াতে তাও বা পারা যায় – কিন্তু একটার অন্যথা হলেও গেল। এদিকে গরমের ছুটির শেষের থেকে আকাশে দু একটা উড়তে থাকে ঘুড়ি। আগের বছরের লাটাই বের হল, ঝুল ধুলো লাগা লাটাই, চার আনার একটা ঘুড়ি কিনলে এক বিকেল চলে যাবে। হয় উড়বেই না সে – সারা বিকেল হাওয়াই থাকল না, নয়ত যাও বা উড়ল, কিছুদুর উড়তে না উড়তেই পাখা গজালো তার, শুধু ঘুরতে থাকে, ঘুরতে থাকে, আর নেমে আসতে চায় – শেষে গাছে আটকে দফারফা। চার আনা বরবাদ। কষ্টের পয়সা।

কারণ সেই পয়সার জন্যও তদবির হয়েছে ঢের। দাদুর কাছে, দিদার কাছে আবদার চলছে। বাবা মাঝে মাঝে যেখানে খুচরো পয়সা রাখে সেখানেও খোঁজা গেছে । ঠাকুরের আসনেও খুচরো পড়ে থাকে কিছু, মানুষে না দিলে তবেই ঠাকুরের দোরে যাওয়া। মায়ের কাছে চাওয়া যায় না কিন্তু কিছুতেই। দেবে না।

ভাই পারে অনেক কিছু। ওর লাটাই আলাদা। ওর ঘুড়িও। সে সোজা উড়িয়ে দেয়। প্যাঁচট্যাচ ও খেলে – আমি দেখি না। তখন নিজের ছেঁড়া ঘুড়িতে হয়তো সকালের ভাতের জল দেওয়া হাঁড়ি থেকে ভাতের দানা এনে ঘুড়ি জুড়ছি আমি।

ঘুড়ির সেমিফাইনাল ১৫ই অগস্ট। তেরঙা চাপরাশ ঘুড়ি কেন জানিনা বেশ পাতলা কাপের হত। হালকা ঘুড়ি। এই একটা রহস্য এখনো উদ্ধার হয় নি। ঘুড়ির ধরণের সঙ্গে ঘুড়িগুলোর ভারি বা হালকা হওয়া। মুখপোড়া ঘুড়ি যেমন ভারী হবেই – বিশেষ করে যেগুলো কালো মুখপোড়া, সাদা মুখের। ভালো হাওয়া থাকলে হালকা ঘুড়ি সুবিধের – চটপট উড়ে যায় কিন্তু টান বেশি থাকে না। বেশি টানের ঘুড়ি সামলানো মুশকিল। বেশি টানের সবকিছুই।

মাঞ্জাসুতো কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর আগেই কেনা হবে। পাড়ার রামজীবনের দোকান থেকেই। দাদুর বয়সী মানুষটাকে নাম ধরেই উল্লেখ করতাম আমরা – ডাকতাম না বলে সম্বোধনের বালাই ছিল না। ওর ছেলেকে ডাকতাম বলতাম রাজেন দা। রাজেন দা স্পেশাল মাঞ্জা দিত। সবাইকে আলাদা আলাদা করে বলত “এবার বেশি বানাবে না – নেহাৎ তুমি বললে বলে আমার নিজের হাজার (গজ) এর সঙ্গে তোমার হাজার করে দেব।“

পরে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে দেখা গেল আমাদের পাড়ায় প্রায় দশজন রাজেনদার অত্যন্ত স্পেশাল মাঞ্জাটি নিজেই পেয়েছে এই শ্লাঘাতে অস্থির।

একবার তাই নিজেরাই মাঞ্জা দেব বলে ঠিক হল - হামান দিস্তায় কাঁচ গুড়োনো তারপর তাকে ছেঁকে নেওয়া পাতলা কাপড়ে – সেই মিহি কাঁচগুঁড়ো সাবু, গঁদ, রঙ মিশিয়ে সেটা জ্বাল দিয়ে হল মাঞ্জার মিশ্রণ। এতে অনুপাতটাই আসল – ভাই বা তার কোনো বন্ধু বোধ হয় সেই গোপন ফর্মুলা এনেছিল। আমাকে জানানো হয় নি।

রাস্তায় ল্যাম্পোস্টে মাঞ্জা দেওয়া শুরু – একজন রিল থেকে সুতো খুলে খুলে খুলে এগোচ্ছে – পিছন পিছন দুজন মাঞ্জার মিশ্রণ মাখাতে মাখাতে তার পিছনে একজন কাপড়ের টিপনি হাতে – সুতোয় লেগে থাকা অতিরিক্ত মাঞ্জা সাফ করতে করতে – সেই হল দক্ষতম টিমের মধ্যে – এই টিপনি ধরার কায়দাতে বোঝা যাবে এটা ছাড়া মাঞ্জা না টানা মাঞ্জা। অনেক দেরি হল সেবার। আড়াই হাজার মাঞ্জা বলে কথা। আগে থেকে বাড়ির অনুমতি ছিল বলে বিপদ হয়নি বড় একটা।

প্রতিবার বিশ্বকর্মা পুজোর সময়ে এতদিনের অধ্যাবসায়ের ফলে কিছুটা শিখে যেতাম। হয়ত আবহাওয়া কিছুটা অনুকুল হত বলেই বোধ হয়। সকাল সকাল নিজের চার পাঁচটা ঘুড়ি কাটা পরে গেলে নিজের স্টকের অবস্থা সুবিধার নয় মনে করে আকাশে খেয়াল লাগাতাম – যদি কোনো কাটা ঘুড়ি ছাত লক্ষ্য করে উড়ে আসে কিনা।

কেটে আসা ঘুড়িরা ভালো হয়। চট করে উড়ে যেতে পারে ওরা – গতিজাড্যের এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ খুব একটা দেখা হয় নি।

ঘুড়িরা দেখেছিলাম চুপ থাকে দোকান থেকে কিনে আনার পরেও। কলের ফুটো করার সময়ে খড়খড় করে কিছু। আর সুতো দিয়ে কল বাঁধার পর জ্যন্ত্য। দুইদিক সমান হল কিনা মাপা, একটু লাট দিতে হবে কিনা দেখা – এর সময় আর নেই যেন তার।

হাওয়া কম থাকলে লাট দেওয়া ঘুড়ি কাজে দেয়। কিন্তু সেই কাজ আমার সাধ্যের বাইরে। আমার ঘুড়ি হাওয়া থাকলে উড়বে নয়তো ছাতেই এদিক ওদিক মুখ লাগাবে, ছিঁড়ে যাবে। তখন আমি ভাইয়ের ঘুড়ি দেখব – সেটা মাঝ আকাশে প্রায় তখন। তার প্যাঁচ ট্যাচ খেলার জো হলে লাতাই ধরতে হবে তখন আমায়, ভাবা যায়?

আমি শুনতে পেতাম না লাটাই ধরার ডাক তাই মাঝে মাঝেই। আমার নজর তখন সেই উড়ন্ত ঘুড়ির উল্টোদিকে সেখানে যদি প্যাঁচট্যাচ লেগে কোনো ঘুড়ি যদি এদিকে আসে। কিন্তু বেশিরভাগ দিনই হয় না। বাড়ির পিছনে আর দুয়েক সারি বাড়ির পিছনেই জুটমিল সেখান থেকে কেউ ঘুড়ি বাড়ে না। পিছনের বাড়ি থেকে ঘুড়ি ওড়ায় সদে, ভালো নাম সদানন্দ, ট্যারা, কিন্তু ঘুড়ির মাস্টার। অনেকবার হয়েছে আমার সদ্য হাওয়া পাওয়া ঘুড়ি অল্প উড়তে শুরু করার পরে সে তার ঘুড়ি নামিয়ে এনে হাতের গোড়া থেকে উড়িয়ে দিয়েছে। আর তারপরে সেই তিরিক্ষে গলায় ভো... কা...ট্টা...।

শোধ নিতাম আমিও। সোজা পথে নয় যদিও। ওর ঘুড়ি কেটে গেলে সুতো পড়ত আমাদের ছাতে। হাত্তা করে মাঞ্জা ঝেড়ে দিতাম।

উচিত ছিল না যদিও। কিন্তু চলত।



ঘুড়ি ছাড়াও ছিল খেলাধুলো। সবচেয়ে জমত অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষে ডিসেম্বরে। কাছের পার্কে ব্যাট বল নিয়ে চল দুপুর দুপুর – খেলা চলত যতক্ষণ বল দেখা যেত ততক্ষণ। শীতের সন্ধে বড় তাড়াতাড়ি আসে বলে এক এক দিন ব্যাটিং ই পাওয়া গেল না হয়ত।

খেলাধুলো না থাকা শীতের দুপুর জুড়ে থাকত টোপাকুল ওলার নিষিদ্ধ ডাক। সরস্বতী ঠাকুরের পাপের ভয়ের চেয়ে লোভের জয়ই তো দেখতাম হত। গোল গোল অল্প হলদে হতে থাকা বোম্বাই কুল বেশি ভালো লাগত। সেই কুল খেতে খেতে ছাতে রোদে পিঠ করে গল্পের বই পড়ার বিলাসিতা ছিল স্বর্গীয়। দিদাও থাকত সেইসব দুপুরে, ছাতে। তখনই বোধ করি কথা বলা শুরু হল একা একা। মাঝে মাঝে নেমে এসে দিদার ছুঁচে সুতো পড়িয়ে দিয়ে ফের উধাও হতে সময় খুব নষ্ট হত না।

বড় বিশ্বাস ছিল তখন। হয়ত সাইজে ছোটো বলেই সাধারণকেও বড় বড় দেখাত। একটা পাঁচিল অনুভব করতাম, ছিল তখন সেটা। তার ওপারে কি বা কি কি আছে কেউ বলত না। বড় ইচ্ছে ছিল বড়ো হওয়ার, যেমন সবাইকার হয়। তার সঙ্গে একটা চিন্তাও হত, বড়োরা তো ভুল টুল সচরারচর করে না। আর আমার তো দেখি সবেতেই এত ভুল হয় – ক্যাবলার মতো হাঁটি, বাড়িতে অতিথি এলে টেলে হয় মুখ দিয়ে কথা সরে না বলে বকুনি – নয়তো তারা ফিরে যাওয়ার পর শুনতে হয় – অত গায়েপড়া হয়ে মিশলে লোকে কি ভাববে ভেবে দেখেছিস। এই শেখানো হয় তোমাকে -

আত্মীয় পরিজন বাবার বন্ধুর ছেলেমেয়েরা যে কত স্মার্ট, কত সুন্দর শুনতে শুনতে কান জ্বালা করলেও উপায় নেই। পাড়ায় ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনর দিনে পাশ করার খবরে ঝলমল করে। সেই খুশি বাড়িতে অনুবাদ করার চেষ্টা করে এত ঝাড় খেলাম – হতভাগা ইস্কুল প্রাপ্ত নম্বরের পাশেই রাখত ওই বিষয়ের সর্বোচ্চ নম্বরটি। আর একদম বাঁদিকে পাশ মার্ক্স। মাঝখানে আমার পাওয়া নম্বর প্রায়শই ওই সংখ্যার গড় হয়ে বিরাজমান। কি সুন্দর সেই মিল – কারোর চোখে একবার ও পড়ে না।

কাজেই বড়ো হয়ে লাভ নেই। ফুলপ্যান্ট পড়ে হ্যাটা খেতে মোটেও ভালো লাগবে না আমার।

পার্কে যাওয়ার সুবিধা হত না রোজ। রবারের দেড়টাকার বল নিয়েই ছাতেই তখন বসত ফুটবল, বা ক্রিকেটের আসর। ওইটুকু ছাতে কি বিপুল ফুটবল, পাড়ার বন্ধুরাও আসত কিছু। হাঁটু ছরে টরে যেত প্রায়শই। ঘাম হত। ঘাম গায়ে দেখলে – মা রেগে যেত খুব – কেন জানি না।


এইসব লম্বা লম্বা দিন রাত আরো টেনে টেনে হেঁটে তবে সেই পুজোর সময়ে পৌছনো হল। একটা নতুন জামা প্যান্ট তো হয়েই যায়। কখনো বাড়তি কিছু আসে। কিন্তু প্রতিটি পুজোর পাউরুটি ঝোলাগুড় সব আলাদা আলাদা। আগে থেকে বোঝার উপায় নেই তাকে। কে কিভাবে আসবে – জানা নেই, তবে কিছু তো হয়েই যাবে। প্রতিবার। যেমনটি হয়।

একবার যেমন ঘরের আলো নিভিয়ে দিতেই জানলা দিয়ে অনুভূমিক টুং টাং আলোরা ঘরে নেমে এলো জানলা দিয়েই। কেউ কেউ এসেছে জানলার বাইরে গাছপালা চড়ে। বিছানায় গড়াগড়ি দেওয়া আলোতে পুজোসংখ্যা ঝলমল করছিল। বুকের তলায় বালিশ চেপে এক ডুব সেই অথৈ গল্পের মধ্যে। আর কিছু মনে নেই আর। মানেও নেই আর কিছুর। মাঝে মাঝে ঝাঁক বেঁধে মানুষের দল পার হয় রাস্তাটা। তাতে সেই আলো কিছু নেচে ওঠে। বোধ হয় প্যান্ডেলে যাওয়ার কথা ছিল আগে, কিম্বা অন্য কোথাও।

তবে পুজোর কদিন পকেট অপেক্ষাকৃত গরম। ঘুড়ির চারানা জোগাড় করতে যেখানে ফেটে যেত – সেখানে পুজোয় এদিক ওদিক থেকে ছোটোখাটো নোটও চলে আসে। ফুচকা না এগরোল, নাকি বন্দুক ছুঁড়ে বেলুন ফাটানো, নাকি ওই সস্তার সোভিয়েত বই? অনন্ত প্রশ্নের কাছে থই পাওয়া ভার। তবে করচ হওয়ার আগে অবধি সেই টাকাগুলোইয় অসীম ধনী লাগে। এগরোল তো ইচ্ছে হলেই খাওয়া যায়। অনেক ঝাল দেওয়া চুরমুর – আর এমন কি দামী? ইচ্ছে করলে সারা পৃথিবী কেনা যায় – বলে বেশ বড়লোক লাগে।

তাই রাখা থাকে, রাখা থাকে বড়লোকী চাল – যতক্ষণ না কোনো একদিন সকালে হঠাৎ শোনা যাবে কেরোসিন দিচ্ছে আর বাড়িতে বাবা টাকা রেখে যায় নি বলে সেই কুড়ি তিরিশ টাকা আর জারিকেন নিয়ে লাইন দিতে হবে। অর্থ, সময় সবই জ্বলে যায় এইভাবে।

অপচয় মনে থাকে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কী আর ঠিকঠাক খরচ হয় নি? সপ্তমীতে যেবার প্রথমবার বেরোনর অনুমতি পাওয়া গেল ক্লাস নাইনে, স্কুলের সামনে দাঁড়ানর কথা বন্ধুদের বিকেল পাঁচটায় – ফোন আর বাড়িতে কোথায় তখন। যেদিন ছুটি পড়েছিল সেদিনই ঠিক হয়েছিল প্রোগ্রাম। ফুলবাগান থেকে আমি আর সুশোভন তো হাজির পাঁচটাতেই, সন্ধে তখন হব হব। কিন্তু কেউ নেই স্কুলের গেটে শুনশান। কিছু পরে একজন – তারপর আমরা তিনজনে মিলে বাকিদের গালি দেওয়া শুরু। এইভাবে সব তারা ফুটে গেলে দেখলাম দশজন হয়ে গেছি আমরা। বাসে ওঠা হল বাগবাজার যাওয়া হবে। সেই বাস ক্রমে জ্যামে আটকাতে থাকে আর ফাঁকা হতে থাকে। খান্না সিনেমার কাছে সেই বাসে আর ড্রাইভার কণ্ডাক্টর আর আমরা ছাড়া আর কেউ নেই দেখে ভিড়ে নেমে গেলাম। মিশে গেলাম। এর আগে এইসব ঠাকুর দেখাই হয় নি এভাবে। আমাদের দৌড় তো ছিল ওই বেলেঘাটা থেকে ওদিকে কাঁকুরগাছি স্বপ্নার বাগান। বাগবাজারের ঠাকুর দেখে হাঁ হয়ে গেছি। এমন হয় ঠাকুর? এত সুন্দর? আর ওখানেই কেন এ এত সুন্দর মুখের ভিড়?

আর সেখানেই দেখা হয়ে যায় কার সাথে যেন একদম হঠাৎ। লম্বা ফ্রক পরা ছিপছিপে। বন্ধুদের সঙ্গেই বেরিয়েছে সেও, চোখে পড়ে গেল। হারিয়েও গেল যেমন হয় ঠাকুর দেখার ভিড়ে। কিন্তু জানব কি করে আগে থেকে যে আবার ওই চোখ পরের প্যান্ডেলে, ফের আবার ফুচকাওলার কাছে, ফের আবার। এত চেনা হয়ে গেল সাহস করে হেসেছিলাম। পরের বার আর চোখ তোলেনি। দেখাও হয়নি আর। এত পরিচিত, তাও।


তাতে কি কিছু এসে যায়? তারপর কোন স্কুল, কোন ক্লাস, বাড়ি কোথায়, ফেলুদা না কাকাবাবু কে বেশি পছন্দ এই সবই জানা হয়ে যায়। সেদিন সঙ্গে দিদি ছিল বলে আর তাকায় নি সেটা নিজে নিজেই বলে ফেলে সে। আমি কেন শুধু দেখছিলাম তাকে সেদিন, কেনই বা অকারণে ইতিউতি খুঁজেছি তাকেই – বলে ফেলি। অন্যদিকে তাকিয়ে আঙুলে ওড়নার খুঁট জড়াতে থেকে সে। সন্ধে হয়ে যায়। মিলিয়ে যায় সে।

তা ছাড়াও না চাইতেও মেলে কিছু, ছপ্পরফুঁড়ে পাওয়া যায় - চটজলদি বেতের রিং ঠিক লাল সাদা মহার্ঘ প্যাকেটের আটকিয়ে যায়। একসঙ্গে এক প্যাকেট, দশটা। যেখানে এমনিতে অনেক অনেক খুশির কারণ ঘটলে তবেই একটা কিনে জ্বলন্ত দড়ির দিকে এগিয়েছি, সেখানে এক প্যাকেট। একেবারে।

গণিতে সবকিছু মেলে না। ভুগোলেও না। পায়ের ভিড়ে পায়ের ভিড়ে এগিয়ে যেতে যেতে কত কী যে দেখে যাই শুধু। কত ভিড়, কত মানুষ, ঝকঝকে চোখ, কথা বলা, আর হেঁটে যাওয়া, বাগবাজারের পর আহিরিটোলা, কুমোরটুলি দেখে সেনট্রাল অ্যাভেনিউ ধরে পরের গন্তব্য মহম্মদ আলি পার্ক। এখানেই গলির মুখে রহস্যময় মুখগুলো ফাটফ্যাট করে তাকিয়ে। চল চল দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে একরম তাড়িয়েই এগিয়ে নিয়ে গেল অয়ন। জানা ছিল। কিন্তু মেলানো গেল না। রাত প্রায় নটা। সপ্তমীর সন্ধে গণগণে। রাস্তার পাশে বাঁশে আটকানো লাইনে কখনো চলছি, কখনো থেমে আছি – সেবার নতুন জুতোও হয়েছিল, কালো রঙের, স্নিকার। ফোসকা পড়েনি। অনেক অনেকক্ষণ পরে পরে প্যাণ্ডেলে ঢোকা গেল – কিছুক্ষণ মাত্র। আবার নতুন প্যান্ডেলের দিকে যাওয়া। এর থেকে পরেরটা ভালো, কলেজ স্কোয়ার। একবার দিঘির ধারে পৌছলে আলো দেখতে দেখতে রাস্তা কখন ফুরিয়ে যায়।

তারপর রোল চাউমিন খেয়ে যে যার বাড়ি ফেরার পালা। হাঁটার জাড্যে বাড়ি অবধি হেঁটেই ফেরা গেল ভিড়ে মিশে মিশে। আর তখন ই দেখলাম পাড়ার প্যাণ্ডেলটা। এর আগে দুর্গাপুজো মানে ছিল ওই প্যাণ্ডেলটা। বাঁশ পোতার দিন থেকে সেখানেই সময় কাটত। ত্রিপল লাগত, কাপড়, তারপরে কুঁচি সাজানো হত সেটা আস্তে আস্তে। ঠাকুর আসার আগের দিনেই লেগে যেত আলো – সারা পাড়ায়। সাদা সবুজ টিউবলাইট। তাতেই আনন্দে অস্থির। সকাল থেকেই মাইক চলত – চেনা গান, সকালের দিকে কিছু বাংলা গান টান হয়ে বেলা বাড়লেই দ্রুত হিন্দি গান শুরু হয়ে যেত। মাইক বাজলেই পড়া বন্ধ। পুজোর গন্ধ।

আর এই রাতের বেলা – কত রাত হবে এগারটা হবে। রাস্তায় যেখানে কোনো প্যণ্ডেল নেই – সেখানেও থিকথিকে ভিড়। আর আমাদের পুজোর প্যান্ডেল – একটা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে চত্ত্বরে। এক কোণে ঢাকে ভর করে ঢাকিটা ঝিমোচ্ছে। কাঁসি বাজানো বাচ্চাটা গায়ের র্যাুপার বিছিয়ে পাশেই ঘুমিয়ে কাদা।

পাশ কাটিয়ে বাড় ফিরে আসি। বাড়ির ঘরোয়া পোশাকে ফের সেই খেলা চালু। আলো নিভিয়ে পর্দা তুলে দিলেই বিছানাময় গাছের পাতার কেটে কেটে যাওয়া আলো কুঁচিকুঁচি পড়ে। ক্লান্তি ফুরিয়ে যায়। পুজো তো আর মাত্র দুদিন। যাঃ।

গণিত, ভুগোল মায় সমস্ত পাঠ্যবই পার হয়ে গেল এর কুলকিনারায়। ফুটপাথ বদলে গেল যেন সেই মধ্যরাতেই।



Avatar: Ishani

Re: ধুলোবেলা - ২

ছবি লেখা !
Avatar: i

Re: ধুলোবেলা - ২

ঘুরে এলাম ।
মালা গাঁথা হয়ে গিয়েছিল তখন। ঠান্ডা মেঝে। রজনীগন্ধার বোঁটা, পায়ে পায়ে ধুলোবালি, সামান্য কাদা। বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল। পান জর্দার মৃদু বাস পাচ্ছিলাম। আলো জ্বলছিল । বৃষ্টি ধরতেই। পরেশনাথের মিছিল বেরিয়েছিল। টেলিফোন একলা ছিল । ঈষৎ মৃয়মান, পৃথুল ।
Avatar: π

Re: ধুলোবেলা - ২

গন্ধ। ডাঁই করা গন্ধ, লেখাটায়।
Avatar: i

Re: ধুলোবেলা - ২

এই স্কেচবই থেকে একটি উপন্যাস জন্ম নেবে একদিন- প্রত্যাশা করি।
Avatar: Ranjan Roy

Re: ধুলোবেলা - ২

ঠিক তাই। পরম যত্নে পেন্সিলে, স্কেচ বই।
Avatar: aranya

Re: ধুলোবেলা - ২

অপূর্ব। বড্ড ভাল
Avatar: সিকি

Re: ধুলোবেলা - ২

ফরিদার লেখা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। বড় মন ছুঁয়ে গেল।
Avatar: ফরিদা

Re: ধুলোবেলা - ২

বাহ। এবার বকিটা লেখার সাহস হচ্ছে।
Avatar: Ranjan Roy

Re: ধুলোবেলা - ২

ফরিদার সাহসের ভাঁড়ারে ঘাটতি!
মানছি না, মানবো না!
লিখুন, অধীর অপেক্ষায়।
Avatar: দ

Re: ধুলোবেলা - ২

বাঃ


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন