আমাদের কথা ৩

ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে যা হল, তার জন্য আমাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, দোষ আমাদের ঐতিহ্যের। সেই শ্রাবণে,আমাদের বাপ-পিতামহই তো তাঁদের পরম শ্রদ্ধেয় গুরুদেব শ্রী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শবযাত্রায় যূথবদ্ধ গুন্ডামি চালিয়ে ভদ্রলোকের দাড়ি উপড়ে নিয়েছিলেন। কুড়ি বছর আগে আমাদের কাকু-দাদারাই তো এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর শিখ ট্রাক ড্রাইভার দের এক এক করে লরি থেকে নামিয়ে খুঁটিতে বেঁধে টায়ার দিয়ে জিন্দা জালিয়েছেন। আমার বাপ-পিতেমো কাকু-দাদারা নয়, ওসব ওদের পাড়ার অন্য অসভ্য লোকেরা করেছে বলবেননা প্লীজ। পুলিশ ঘুষ নেয়,সরকারি কর্মচারীরা একেবারে কাজ করেনা, ভীষণ দুর্ব্যবহার করে, ডাক্তাররা ক্রমশ অর্থপিশাচ হয়ে যাচ্ছে,যখন এই সব কথা বলি আমরা, তখন এমন ভাব দেখাই, যেন, এই সমস্ত জীবরা হঠাৎই মঙ্গলগ্রহ থেকে নেমে এসে আমাদের সুখের যৌথ পরিবারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। প্লীজ, আসুন শেষ করি এই সমস্ত ধ্যাষ্টামি। আমার ঠাকুদ্দা ছিলেন ভীষণ নরম মনের মানুষ, সারাদিন কণিকার গান শুনতেন, উনি কিকরে গুরুদেবের দাড়িতে হাত দিতে পারেন? আসুন শেষ করি এই জাতীয় ন্যাকাপনা। যে পুলিশ ঘুষ নেয় সে আপনার বন্ধুর দাদা, যে ডাক্তার অর্থপিশাচ, সে আপনার বড়ো জামাইবাবু, আর যিনি কাজের জায়গায় গিয়ে সারাদিন ম্যাগাজিন পড়ে সময় কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন, তিনি আপনার নিজের দিদি। আমিআপনিই ,ছেলে হলে,ভিড়ে মেয়েদের বুকে কনুই চালাই, ট্রামে বাসে পিছনে নুঙ্কু ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, মেয়ে হলে, অর্থপূর্ণ চাউনি ন্যাকামি আর সামান্য শরীরের বিনিময়ে সুবিধে আদায় করি। প্লীজ, পুঁজিবাদী সমাজের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ঘাড়ে দোষ চাপাবেননা, ঢের ঢের পুঁজিবাদী দেশ দেখা আছে, কোথাওই ট্রেনে-বাসে চোখের সামনে কোনো দুর্ঘটনা দেখলে বাবারে কি রক্ত বলে সযত্নে নিজের ল্যাজটি ট্যাঁকে গুঁজে পাশ কাটানো,আর চোর ব্যাটাকে পেলে গণধোলাই দিয়ে পরোপকারের পবিত্র কর্তব্য সমাধা করাটা আদর্শ সামাজিক আচরণ বলে গণ্য হয়না।

তো, পুঁজিবাদ টাদ নয়, আসুন স্বীকার করি ওসব আমাদের রক্তে আছে। লোককে পিটিয়ে মারতে আমাদের ভালো লাগে। ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ক্লাস বা অফিসে প্রোমোশন বাগাতে প্রয়োজনে বস বা প্রফেসরের বাড়ির বাজার করে দিতে কিংবা তাঁর সঙ্গে শুয়ে পড়তে আমরা অপার আনন্দ পাই। আমরা দৃঢচেতা প্রতিবাদী শুধু বাজারের সব্জীওয়ালা, বাসের কন্ডাকটার আর রিক্সাওয়ালার কাছ থেকে দু পয়সা বাঁচানোর যুদ্ধে, পরম নৈতিক শুধু মধুচক্রের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে পেশিআস্ফালনে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। পুলিশ, প্রশাসন, মিউনিসিপ্যালিটির কাউন্সিলার, শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, উকিল সকলেই একেকটি দুর্নীতির ট্রামডিপো (শুধু আমি নিজে ছাড়া) -- এই নিয়ে ট্রেনে বাসে পাড়ায় বাড়িতে আমাদের বিক্ষোভ বিদ্রোহ বিপ্লবের অন্ত নেই, কিন্তু কার্যোদ্ধারে এদের কারো সামনে পড়লেই নৈতিকতা আর বিপ্লবের পত পত পতাকা নেতিয়ে পড়ে স্যর স্যর ডাক আর হাত কচলানোতে রূপান্তরিত হয়।

তাই আসুন, সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব দূর করে বুক বাজিয়ে ঘোষণা করি বিপ্লব, প্রতিবাদ, নৈতিকতা, শিল্প, সংস্কৃতি, পঁচিশে বৈশাখ পাঞ্জাবি/জামদানি মাঞ্জা দিয়ে জোড়াসাঁকো-রবীন্দ্রসদন,মিছিলে উই শ্যাল ওভারকাম, পাড়ায় ম্যারাপ বেঁধে র-স-¤ন সন্ধ্যায় গলা কাঁপিয়ে তোমাআর ন্যায়ের দন্ডও পোত্যেকের পরে, আর নাকি গলায় আলোকেরেই ঝর্ণাধারায়, এ শুধু আমাদের এক শিল্পিত ন্যাকামি। প্রয়োজন হলেই এই সব নাগরিক নৈতিকতা, এই শিল্পিত সূক্ষ্মতাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করে আদিম আত্মার ন্যায় উদুম হয়ে যেতে পারি। আসুন, ওসবের পিছনে সজোরে লাথি মেরে বুক বাজিয়ে ঘোষণা করি,বেশ করেছি দাড়ি উপড়েছি, বেশ করেছি চুরাশিতে জিন্দা জ্বালিয়েছি, চান্স পেলে আবার জ্বালাব। সেবার ওদের জ্বালিয়েছি, এবার অন্য --- ছেলেদের বর্ডার পার করে দিয়ে আসব।

কানে আঙুল দিচ্ছেন? শুনতে খারাপ লাগার ভান করছেন? জানি তো এসব আপনি বলবেননা,সেই শ্যামা শাপমোচন মার্কা মুখোশটা সারাদিন পরে আমি কি কালচার্ড আমি কি কালচার্ড বলে বগল বাজাবেন। অবশ্য সত্যি ই তো, গায়ে আঁচ লেগে যাবার ভয় আছে, পাড়ার দাদাদের ধাতানির ভয় আছে, সর্বোপরি আছে পুলিশ, যারা ট্রাকের সামনে মেরা ভারত মহান লেখা না থাকলেও ফাইন করে। অগত্যা স্ট্যাটাস কু ই থাক, ঘোষণা টোষণার বীরত্ব দেখিয়ে আর লাভ নেই। ভগবান আমাদের মঙ্গল করুন।

আমেন।


Avatar: chandal

Re: আমাদের কথা ৩

বঙ্কীমবাবুর বাবুতেই তো কব্বে লেখা আছে! নতূন কিছু বলুন দিকি।
Avatar: তথাগতা

Re: আমাদের কথা ৩

নতুন লিখে আর কি হবে।।। সেই বন্কিম থেকে লিখে লিখে কাগজকলম নষ্ট! শোনে কেডা !?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন