আমাদের কথা ২

দেশে এখন চলছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির হাওয়া। খুনের বদলে ফাঁসিটা বড় কম হয়ে যাচ্ছে, চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এ ব্যাপারে আমাদের ঐতিহ্য অবশ্য গৌরবজ্জ্বল। স্বামীর মৃত্যুর অপরাধে আমরা জিন্দা জালিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছি যুবতী বৌকে, এই তো সেদিন। আরও আগে, বৌদ্ধ যুগে, শুনেছি, অপরাধীর মাথার চুল ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে মাথার চামড়া অক্ষত অবস্থায় তুলে ফেলা হত অপূর্ব দক্ষতায়। তারপরে কাঁকর দিয়ে মেজে খুলিকে সযতনে ঝাঁ চকচকে করে তোলা হত। এবং সবশেষে রগের একপাশ দিয়ে একটা গরম শিক আস্তে আস্তে ঢুকিয়ে অন্যদিক দিয়ে বার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি শেষ করা হত। তো সেই রামও নই, বাবরি মসজিদও নেই, অতীত অতীতই। কিন্তু সুখের কথা এই, যে, এই পুরাতন ঐতিহ্যের একটি অংশ আজও আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছি। বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি, ফলে আপনার আমার জন্য সাজিয়ে দেওয়া হল দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির এক ইনকমপ্লিট লিস্টিং।

১। অপরাধী:ঘটি চোর বা সম্ভাব্য ঘটি চোর
শাস্তি: মৃত্যু
পদ্ধতি: গণপ্রহার
যদি আপনার বাড়ি থেকে কেউ একটা ছোটো ঘটি বা বাটি তুলে নিয়ে যায়, বা না নিয়ে গেলেও যদি আপনার সন্দেহ হয়, যে লোকটির আচার আচরণ সন্দেহজনক, ঘটি বাটি চুরি করার পূর্ণ পোটেনশিয়াল তার মধ্যে বিদ্যমান, তাহলে দেরি না করে পাড়ার ক্লাব থেকে তিনচার জনকে ডেকে এনে চটপট লোকটিকে বেঁধে ফেলুন খুঁটিতে, ব্যস আপনার কাজ খতম। এবার নিশ্‌চিন্তে বাড়ি ফিরে পরোটা আর লাউঘন্ট খেতে খেতে বৌকে বলতে পারবেন, উ: লোকটাকে যা মারছিলনা--- চোখে দেখা যায়না। আপনার দায়িত্ব শেষ, এবার হাজারে হাজারে অ্যাননিমাস জনতা এসে, লাঠি বল্লম ইট পাটকেল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, নাক চোখ থেকে শুরু করে একটা একটা করে শরীরের সমস্ত হাড় ভাঙতে ভাঙতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি শেষ করবে। এই পদ্ধতির সুবিধে হল, ১) এতে নরহত্যার পাপ বা গ্লানি গায়ে লাগেনা (সবাই ই মারছিল, আমি তো একা মারিনি), ২) ডেডবডি সরানোর ঝামেলা নেই, কাজকম্মো শেষ হলে, পুলিশ ডেডবডি যথাস্থানে পৌঁছে দেবে। বানতলা নামক একটি জায়গায় এই পদ্ধতির সফলতম প্রয়োগ হয়েছিল, যেখানে চোররা গাড়ি চড়েও পালাতে পারেনি।

২। অপরাধী: অবাধ্য গাড়িচালক
শাস্তি: মৃত্যু অথবা আজীবন পঙ্গুত্ব
পদ্ধতি: ঐ
কোনো অবাধ্য গাড়িচালক, যদি, রাস্তার ধারের দখলি জমিতে বে আইনি চায়ের দোকানে গাড়ি ভিড়িয়ে দেয়, এবং তার পরেও বাইচান্স প্রাণে বেঁচে থাকে, তবে তাকে পালাতে দেবেননা। দোষটা তার নিজের না হয়ে গাড়িরও হতে পারে, কিন্তু, সেক্ষেত্রে তুই জল নোংরা না করলেও তোর বাপ করেছিল নীতি প্রযোজ্য। মালটাকে, যদি একান্তই অসম্ভব না হয়, তবে, গাড়ি থেকে টেনে বার করুন। অজ্ঞান হয়ে গেলে ভালো করে মুখে চোখে জল দিন, কারণ ওটা ভান হতে পারে। আর ভান না হলেও, যদি দেখেন তেমন চোট লাগেনি, দুচারবার জলের ঝাপটাতেই মাল চোখ খুলছে, তাহলে এ ব্যাটার উপরেও পদ্ধতি ১ অনুসরণ করে রামঠ্যাঙানি শুরু করুন। এক্ষেত্রে, যুক্তি এই, যে, ১) ওর তো মরে যাবারই কথা ছিল, ভগবান যদি নিজের কাজ না করেন, তবে তাকে শুধরে দেবার দায় তো আমাদেরই, ২) এ ব্যাটা ছাড়া পেলে আবার গাড়ি চালাবে, আবার লোক মারবে, তার চেয়ে কারণটাকেই নিকেশ করে দিই, তাহলে রাস্তার বাকি লোকেরা দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবে। এই পদ্ধতির সুবিধে হল, যদি এর সঙ্গে এলাকার উন্নতির দু একটা ইস্যু যোগ করে একটা পথ অবরোধ শুরু করে দিতে পারেন, তাহলে, বহুদিন না দেখা এম এল এ, কপালে থাকলে সাংসদও দেখা দিতে পারেন। আর অবরোধে আটকে পড়া বাকি গাড়িগুলো থেকে, প্রয়োজনে টাকা তুলে তাদেরও এই রাস্তায় চলার অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, যাতে, ভাঙা দোকানের ক্ষতিপূরণ ছাড়াও একটা ছোটো ফিস্টি হয়ে যাবে।

৩। অপরাধী: প্রেমিক প্রেমিকা
শাস্তি: প্রেম ছুটিয়ে দেওয়া
পদ্ধতি: বিবিধ
রাস্তার ধারে, বা রাস্তা থেকে দূরে কোনো নির্জন সরোবরের ধারে, যদি কোনো কপোত কপোতীকে অকারণে সময় এবং নিজেদের নষ্ট করতে দেখেন, তাহলে, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিন। যদি ভদ্রলোক হন, তবে গায়ে থুথু দিয়ে চলে যান। যদি পাড়ার দাদা হন, তবে পরিষ্কার গিয়ে চাঁদা চান, কি কারণে চাঁদা সেটা না জানালেও চলবে, আমাদের বাগানে এসে প্রেম কচ্চো, দেবেনা মানে? যদি পুলিশ হন, তবে, অবিলম্বে থানায় নিয়ে যান। ওরা যদি প্রকাশ্যে বসে থাকে, তবে পাবলিক প্লেসে দৃশ্যদূষণের চার্জ দিন। আর যদি, একটু দূরে জনচক্ষুর আড়ালে বসে থাকে, তবে লুকিয়ে লুকিয়ে অশালীন আচরণের অভিযোগে ফাঁসিয়ে দিন। আর যদি চুমু টুমু খেতে দেখেন, তাহলে তো ইমমরাল ট্রাফিক অ্যাক্ট আছেই। এক্ষেত্রে অপরাধটা হল, ১) আপনি যদি ভদ্রলোক/মহিলা হন,আমাদের ঐতিহ্যে কেউ কখনও চুমু খায়নি (খেতে জানেইনা), আর এরা জিভে জিভ লাগিয়ে, একে অপরকে এঁটো করে, ম্যাগো: হাইজিন বলেও তো একটা ব্যাপার আছে? ২) যদি অভদ্রলোক হন, যথা পুলিশ,আমি কখনও প্রেম করার চান্স পেলামনা (মুর্গি ছিলাম, মেয়েরা পাত্তা দেয়নি), আর এরা রাস্তাঘাটে রাসলীলা করবে? ৩) যদি প্রগতিশীল হন, দেশে এতো জ্বলন্ত সমস্যা, হাজারে হাজারে লোক খেতে পাচ্ছেনা, আর এরা ভাতের বদলে চুমু খাচ্ছে? মেরি আঁতোনেতের যা হয়েছিল এদেরও তাই হওয়া উচিত, ৪)যদি আঁতেল হন, ফরাসী ছাত্র আন্দোলনের সময় চুমু একটা প্রতিবাদের অঙ্গ ছিল, কিন্তু, এরা, এদের সেই বিপ্লবী চেতনাও নেই, সমাজিক অঙ্গীকারও নেই, ধিক্‌। এই নীতিগত ক্রুসেডে মেয়েটিকে বেশ্যা সাজিয়ে মিথ্যা চার্জ সাজান। অবশ্য ওদের পকেটে পয়সা থাকলে, ঝোপ বুঝে কোপ মেরে ধর্মযুদ্ধটি স্থগিতও রাখা যেতে পারে। এই পদ্ধতির সুবিধা হল, ১) এতে সমাজ ও সংসারের উন্নতির জন্য দু পয়সা আসে, ২) বাগানগুলিতে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে।

৪। অপরাধী: পাশের বাড়ির মেয়ে (বয়স ষোল থেকে ছত্রিশ)
শাস্তি: নজরবন্দী
পদ্ধতি: কো অপারেটিভ
পাশের বাড়ির মেয়ে, সেতো আপনার বাড়ির মেয়ের মতই। যদি মিনিস্কার্ট পরে বাড়ি থেকে বেরোয়, তবে হেসে হেসে বলুন, কাপড়ের দাম বড্ড বেড়ে গেছে নারে? যদি স্লিভলেস পরে, তাহলে, তোর হাতাদুটো কি ইঁদুরে খেয়ে গেল নাকি? যদি শাড়ি পরে, শাড়ি পরলেই কি আর শান্ত শিষ্ট হওয়া যায়? যদি বাড়িতে ছেলে বন্ধুরা আসে, তাহলে, পাশের বাড়ির মাসিমার সঙ্গে সজোরে বাক্যালাপ করুন, ভদ্রবাড়িতে এই সব বেলেল্লাপনা আর চোখে দেখা যায়না, পাড়াটা ছাড়তে হবে মনে হয়। যদি বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বাইরে দেখা করে, নাচুনি মেয়ে কতজনকে নাচিয়েই যে ফিরল। যদি এসব ডায়ালগে একটু গ্রাম্যতা লেগে আছে মনে হয়, তাহলে কাস্টমাইজ্‌ড সফিস্টিকেটেড লেবেল লাগিয়ে এই মালকেই একটু নতুন কায়দায় বাজারে ছাড়ুন। আর হ্যাঁ, যথাসময়ে অভিভাবকসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে মেয়ের বাবা মাকে সতর্ক করে দিতে ভুলবেননা কিন্ত। তার জন্য বিভিন্ন পন্থা নিতে পারেন। ১) বাপকে রাস্তায় দেখে একটু গলা নামিয়ে বলুন, আপনার মেয়েকে সেদিন দেখলাম---এটা খুব কাঁচা হয়ে যাচ্ছে মনে হলে, ২) বিয়ে বাড়িতে প্রকাশ্যে মায়ের কাছে মেয়ের জন্য বেকার সম্বন্ধ আনুন --- মেয়ে তো বড় হচ্ছে (যেন সে জন্য আপনার প্রত্যেক রাতে দু:স্বপ্ন দেখে ঘুম আসেনা)। মোদ্দা কথা, মেয়েটিকে একদন্ডও শান্তিতে থাকতে দেওয়া চলবেনা, বুঝিয়ে দিতে হবে, বাছা তুমি রণে বনে জলে জঙ্গলে যেখানেই থাক, আমরা পাপারাৎজিরা আছি তোমাকে বোতলবন্দী করে রাখবার জন্য। এক্ষেত্রে যুক্তিটা হল, এইভাবে নিকৃষ্ট পশ্‌চিমী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ থেকে সমাজকে মুক্ত করে খাঁটি ঐতিহ্যপূর্ণ ভারতীয় রাখা যায়, কারণ, কে না জানে, মেয়েরাই হল সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। আর এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে পাড়ার সবকটা টেঁটিয়া চুলবুলিকে সমঝে দেওয়া যায়। এই পদ্ধতির সুবিধে অসুবিধে দুই ই আছে। অসুবিধে:নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করে অন্যের উপর নজর রাখতে হয় (সামাজিক জীব যখন,সমাজের জন্য এটুকু তো করতেই হবে)। সুবিধে: রোজকার আলুভাতে জীবনযাপনে, এতে করে একটু চাটনির আমদানি হয়।

আগেই বলা হয়েছে, তালিকাটি অসম্পূর্ণ। স্থান সময় ও অধ্যবসায়ের অভাবে শাস্তির সমগ্র তালিকাটি দেওয়া গেলনা, নচেৎ আমাদের প্ল্যান ছিল দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির একটি অনলাইন ডিরেক্টরি দুনিয়ার সামনে প্রকাশ করা। তবে, অতীত খুঁড়ে বেদনা জাগানোর চেয়ে, ভবিষ্যতের জন্য নতুনতর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি উদ্ভাবনই, আমাদের মত সংস্কৃতিবান সৃষ্টিশীল উদ্যমী প্রতিভাবান দ্রুত উন্নয়নশীল জনগোষ্ঠীর পক্ষে বেশি উপকারি ও কার্যকরি এক সমাজমনস্ক কাজ হবে। চিন্তা করবেননা, আমাদের ফুকো পন্থী ডিসিপ্লিন ও পানিশ বিশেষজ্ঞরা সে কাজেও পিছিয়ে নেই। শীঘ্রই আপনাদের সামনে নিয়ে আসা হবে নতুন, আরও কার্যকর, আরও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির এক অনবদ্য সম্ভার। কথা দিচ্ছি, সে শাস্তি হবে, ফাঁসিরও অধিক, গায়ের ছাল তুলে নুন লঙ্কা বাঁটা ঘষার চেয়েও উন্নততর, ক্রুশে টাঙানোর চেয়েও আধুনিক, এবং শূলে চড়ানোর চেয়েও ভয়াবহ। পাথর ছুঁড়ে মারা,মাটিতে পুঁতে কুত্তা দিয়ে খাওয়ানো, অ্যাম্ফিথিয়েটারে হাজার হাজার লোকের সামনে তারিয়ে তারিয়ে মারা, এই সমস্ত মাপ কাঠিকে ছাড়িয়ে আমাদের এই নতুন শাস্তি পৃথিবীর সামনে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, আর আমরা সক্কলে মিলে বেসুরো গলা সেধে নিয়ে ভুলে যাওয়া কোরাসটা আবার তারস্বরে গাইতে থাকব ---- জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে ---


Avatar: nam

Re: আমাদের কথা ২

আমার কোনো ক্থা নেই কেনো?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন