এই আমাদের মতের মিল, জগঝম্প, রূপকথারা আর কিছু সংলাপ কিছু প্রলাপ। পড়ুনঃ নিদ্রাকাল


  
এ হল আমাদের সাপ্তাহিক বিভাগ। সোমবার সকালে আমাদের বহুত বহুত ঘুম পায় বলে আমরা নিজেদের মতো সাজিয়ে নিই নতুন নতুন লেখাপত্তর। মানডে ব্লুজ কাটাতে হলে প্রতি সোমবার চোখ বোলাতে ভুলবেন না।

ক্রিকেট যুদ্ধ

ওয়াক্কাস মীর

ভারত পাকিস্তানের ম্যাচ দিল্লিতে বসে দেখলে উত্তর ভারতের পাকিস্তান বিরোধী মনোভাবটাও বেশ টের পাওয়া যায়। কয়েকটা স্লোগান তো বেশ পরিষ্কারভাবে ধর্মবিদ্বেষী। আমার পিছনেই বসেছিলেন সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে একজন, বন্ধুরা তাকে পন্ডিতজী বলে ডাকছিলেন। আমার টীম পাকিস্তানের টী শার্ট পরাটা তার আর কিছুতেই হজম হচ্ছিল না। আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলেন, "পাকিস্তান আজ জিতলে আর জ্যান্ত ফিরতে হবে না" বা "কাসভের মতন সব পাকিস্তানীকেই ফাঁসিতে লটকে দাও"। শুধু পাকিস্তান বিরোধী নয়, স্লোগানগুলো ছিলো মুসলিম বিরোধীও। লাহোরে শেষ যে ইন্ডিয়া পাকিস্তান ম্যাচ হয়েছিলো তার সুর কিন্তু অন্যরকম ছিল। সচীন মাঠে নামলে গোটা স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানিয়েছিল। সেই খেলায় ভারত জিতলে লাহোরবাসীরা ভারতীয়দের আলিঙ্গন করতেও ভোলেন নি। স্টেডিয়ামের বাইরে ভারতীয়রা খেলা জিতে নাচতে শুরু করলে লাহোরের ঢোলওয়ালারা সোৎসাহে ঢোল পিটিয়ে ছিলো। ক্রিকেট তো সবাই ভালোবাসে কিন্তু স্টেডিয়ামে এসে পরস্পরের জাতি বিদ্বেষটাকে কি না উগরে দিলেই নয়? খুব কি একটা উপর উপর ব্যাখ্যা দিলাম? আমার বন্ধুরা, যারা এর আগে দিল্লিতে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের ম্যাচ দেখেছিল, তাদের অভিজ্ঞতাও কিন্তু আমারই মতন।

আরও পড়ুন...

বস্টনে বঙ্গেঃ তৃতীয় পর্ব

বর্ন ফ্রী

যারা ভাবছেন, বিয়ের অধিকার না পাওয়া গেল তো কী এসে গেল, ইকুয়াল ডোমেস্টিক পার্টনারশিপ তো দেওয়াই হচ্ছে, তাদের জন্য একটা ছোট্ট সওয়াল। ধরুন কোন স্কুলে বলা হল, সবাইকে সমান ভাবে পড়ান হবে, একভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে, খাতা দেখা হবে, শুধু খাওয়ার জলের কলটা ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা হবে, মেনে নেবেন? জল একই থাকবে, শুধু কলটাকে সবুজ রঙ করে দেওয়া হবে? জানি আপনি মেনে নেবেন না, কেননা আপনি যদি মেনে নেওয়ার দলের হতেন তা হলে এই লেখাটা এতদূর পড়তেন না। দিনের শেষে সাম্যের অধিকার এক মৌলিক অধিকার, যে অধিকারের প্রশ্নে আপোষ করা চলে না।

আরও পড়ুন...

সংবাদ সারাক্ষণ - দ্বিতীয় পর্ব

শ্রমণ গৌতম শীল

স্বপন তখন তরুণ ছিল। এ সব শুনেছে, খুব যে বুঝেছে এমন না। কিন্তু সত্যি সত্যি দেখা গেল এই সব লোকগুলো পড়ছে তাদের কাগজ। তারা অমিতাভ নাইটের বদলে খাবারের দাম কেন বাড়ছে তা নিয়ে যতটা গভীরে যাওয়া সম্ভব খবরের কাগজে ততটা গিয়েই খবর করতো। খবরের পাঠকের দুনিয়া কলকাতা শহরে ভাগ হয়ে যেতে শুরু করলো। সুখবাজার অমিতাভ নাইটে জোর বেশি দিত। আরেকটা কাগজ ছিল ‘দিনকাল’ বলে। তারা বাংলা সমাজতন্ত্রীদের, বিশেষ করে আলো বসুর কুকীর্তি নিয়েই মত্ত থাকতো। পরের পর তদন্তমূলক সাংবাদিকতা তাদের ব্যানার হেডলাইন হত। সেটা আর সুখবাজার পড়তো ফেডারেশনের সমর্থকরা। বাংলা সমাজতন্ত্রীদের নিজেদের দলীয় মুখপত্র ‘লোকশক্তি’ পড়তো পার্টি মেম্বার আর সমর্থকরা। উত্তেজিত তর্ক-বিতর্ক এক সময় থামলে তখন শোনা যেত ‘সমকালীন’-এর পাঠকদের গলা। কী হয়েছে, কেন হয়েছে, কী হবের ব্যাখ্যা নিয়ে তারা হাজির! কাগজ বাড়ছিল। বাড়ছিল বলে ছোট আর মাঝারি বিজ্ঞাপন আসছিল নিয়মিত। দেরী হত মাইনেতে বিজ্ঞাপনদাতা আর পাঠকের টাকা আদায় করতে লোক কম ছিল বলে। বেশি ছিল না মাইনে। কিন্তু স্বপনের মনে হত একটা কাগজ করছে যার একটা জায়গা আছে। পাড়ার সাধারণ লোকেরা, সে যে দলের সমর্থকই হোক, স্বপনকে বলতো কাগজটা কিন্তু খবরটা করে। সরাসরি যারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে জড়িয়ে তারা অবশ্য চুপ থাকতো, কিন্তু তারাও চেষ্টা করতো ‘সমকালীন’ কী লিখেছে জেনে তবে কথা বলতে চায়ের দোকানে। সে সব ভেঙে দিয়েছিল বীতশোক। তার আগে অব্দি স্বপন বুঝেছিল একে বলে সম্পাদকীয় নীতি। আর অমিতাভ, শালা শ্বশুরবাড়ির পয়সায় মদ-মেয়েবাজি করে, গদার-ত্রুফো আওড়ে চ্যানেল পলিসি বানাবে? কিম্বা অনুরাগ বা জয়ন্ত ওই সব চিটিংবাজী করে বানাবে পলিসি?

আরও পড়ুন...

এদিন আজি কোন ঘরে গো

চিরকুমার পাত্র

আজি এ প্রভাতে রবির লুক
কেমনে টাচিল এ ফেসবুক

জন্মদিনের প্রাক্কালে হঠাৎই রবীন্দ্রনাথ। ফেসবুকে এই প্রথমবারের জন্য। বাকি সবার নজর এড়ালেও ধরা পড়লেন বুলবুলভাজার পাতায়।

আরও পড়ুন...

মুক্তধারার বাঁশিওলা

ইন্দ্রাণী

জ্যাক কিংএর গল্পটাই ধরুন। জ্যাক কেমিক্যাল এঞ্জিনীয়র। বহু বছর পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে সম্মানের চাকরি। তারপর সাউথ অস্ট্রেলিয়ান ডিপার্টমেন্ট অফ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিংএ যোগ দেওয়া। সমস্যার সূত্রপাত তখনই। জ্যাক কোস্টাল ওয়াটার সংরক্ষণের রিপোর্ট দাখিল করলেন ক্যাবিনেটে। রিপোর্টে পোর্ট পিরির লেড স্মেল্টারটিকে ভারি ধাতু দূষণের দায়ে সাব্যস্ত করলেন জ্যাক। ক্যাবিনেট থেকে নির্দেশ এল পোর্ট পিরির যাবতীয় রেফারেন্স অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার। অথচ ততদিনে সি এস আই আর ও র বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন লেড স্মেল্টারের ভারি ধাতু কিভাবে মারাত্মক ক্ষতি করছে সে অঞ্চলের জীবজগতের। বলাই বাহুল্য, কিং তাঁর মত থেকে একচুলও বিচ্যুত হ'লেন না। বরং মন্ত্রী, আমলাবর্গের কাছে বারংবার দরখাস্ত করে যেতে লাগলেন। কোনোরকম সাড়া না পেয়ে, বাধ্য হয়ে মিডিয়ায় গেলেন কিং। অর্থাৎ ফুঁ পড়ল বাঁশিতে। সঙ্গে সঙ্গে কিংএর পোজিশন 'রিডানড্যান্ট। এরপর সেই এক গল্প- মানসিক রোগীর তকমা সেঁটে দিয়ে চাকরিটি কেড়ে নেওয়া।

আরও পড়ুন...

আমার অগীত- অঞ্জলি

যশোধরা রায়চৌধুরী

একে তো রবি ঠাকুরের সার্দ্ধশতবর্ষ। সে এক খটমট বাংলা। তবু ১৫০ বছর বলা যাবে না। তাহলে অশিক্ষিত প্রমাণ হবে। মৃত্যুতে, জন্মে, বিবাহে, পৈতেতে, গাছ পোঁতায়, ফাংশনে, পুরস্কারে, তিরস্কারে, রাজদ্বারে, শ্মশানে, সর্বত্র গাওয়ার মত গান যে রবি ঠাকুর লিখে গেছেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের মত। না দ্বিতীয়জন গান লেখেন নি তবে সব ওকেশনের উপযুক্ত একটি করে কোটেশন ঝেড়ে গেছেন। সেগুলো যাতে সব বিষয়ের বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা যায়, সেই জন্য। ফিজিক্স, অংক, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, মাইক্রোবায়োলজি, এথিক্স, ফিলজফি, ফিল্ম চর্চা, কোন বিষয় বাদ দেন নি। রাশিয়ান পাব্লিকেশনের সব বইয়ের প্রথম পাতা খুললেই দেখতে পেতাম সেগুলো আমরা, সেই যুগে, যখন ভারত-রাশিয়া ভাই ভাই। বইগুলোও খুব চকচকে সস্তা সুন্দর।

রবি ঠাকুরের গানও তেমনি। কোন অকেশন বাদ নেই। ভুল করে এবার আপনি যদি জন্মদিনের অনুষ্ঠানে “সমুখে শান্তি পারাবার” গেয়ে ফেলেন, তাহলে পাপ দেবে না রবি ঠাকুর? অথবা বিয়ের দিন, আমরা দুজনা স্বর্গ খেলনা অথবা আজি এ আনন্দযজ্ঞে না গেয়ে, গেয়ে ফেলেন, এসেছিলে তবু আসো নাই জানায়ে গেলে। লোকে অশিক্ষিত বলবে না? তো, গীতাঞ্জলি নিয়ে যা লিখতে যাব, তাতে তো একই ব্যাপার। এত গুরুগম্ভীর ব্যাপার। আকাশে চক্ষু তুলে দীর্ঘশ্বাস, মাঝে মাঝে একটু একটু বলতে হবে, আর কয়েক মুহূর্ত থামতে হবে, অটলবিহারী বাজপেয়ীর মত।

আরও পড়ুন...

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী – শতবর্ষে (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

অমর মিত্র

তাঁর গল্পের প্রধান চরিত্ররা সকলেই অ্যান্টি হিরো। অসফল মানুষ, জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ মানুষ। সমুদ্র গল্পের লোকটিও তাই, মঙ্গল গ্রহ বা তারিণীর বাড়ি বদল গল্পের তারিণী, সামনে চামেলি গল্পের ক্রাচ বগলে লোকটিও তাই। কিন্তু প্রতিটি চরিত্রই হল গভীর অনুভূতিপ্রবণ। তাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় সব সময় সজাগ। এই সব ব্যর্থ মানুষের ভিতর আবার অন্য মানুষও আছে। তিনি ছিলেন জাত শিল্পী। শুধু মাত্র কাহিনি কথনের যখন রমরমা, দগদগে কাহিনি যখন বিক্রি হয়ে যায় হাজার হাজার, তখন প্রায় নিভৃতে তিনি শিল্পের সাধনা করে গেছেন। হ্যাঁ, একমাত্র জীবনানন্দকেই যেন মনে পড়ে যায় জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীকে পড়তে পড়তে। আমি যখন জীবনানন্দের জলপাইহাটি উপন্যাসটি পড়ি, সেই ব্যর্থ অসফল মানুষটির কথা পড়ি, তখন মনে পড়ে যায় জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর কথা। ট্রাঙ্ক বন্দী সেই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার হয়েছিল জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর মৃত্যুর বছর সাত আট বাদে তো নিশ্চয়। শিল্পের কথা যখন বলছি, ‘রাইচরণের বাবরি’ গল্পটির কথা বলি।

আরও পড়ুন...

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী – শতবর্ষে (প্রথম পর্ব)

অমর মিত্র

সে ছিল একটা নির্জন রাস্তা আর সেই রাস্তায় ক্রাচ বগলে সে হাঁটে। দুঃখী, বঞ্চিত আর ব্যর্থ মানুষের কল্পনা আর আকাঙ্খার গল্প। খুব বড় লেখক, আমার পিতৃতুল্য লেখক জিজ্ঞেস করতে লাগলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তখন তিনি শিশুর মতো। আমরা যারা ওই পুস্তক প্রকাশনীতে যেতাম, শচীন দাস, সমীর চট্টোপাধ্যায়, কখনো কবি তুষার চৌধুরী এবং পবিত্র মুখোপাধ্যায় – সকলেই তাঁকে পড়েছেন। তাঁর নানা লেখা নিয়ে আমাদের নানা কৌতুহল নিরসন করতেন হয়ত কখনো, কিন্তু বারবার প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতেন। আমার মনে আছে তাঁকে শুনিয়েছিলাম আশ্চর্য এক অভিজ্ঞতার কথা। গ্রামীণ যাত্রাদল আসছে শীতের ধানকাটা মাঠ ভেঙে, সুবর্ণরেখা নদী পার হয়ে। হিরোইনের কোলে দুধের বাচ্ছা। কোন ভোরে বেরিয়েছে ধ-ডাংরি যাত্রাদল। বেলা বারোটার পর এসে পৌঁছল। হিরোইনের মাথার চুলে খড়কুটো, বাচ্ছা কাঁদছে। রাস্তার দুপারে দাঁড়িয়ে গাঁয়ের চাষাভুসো মানুষজন দেখছে তাকে। কে যেন হেঁকে উঠে ডাকল আমাকে, হিরোইন হিরোইন দেখুন স্যার... তিনি মগ্ন চোখে তাকিয়ে আমার দিকে। আমি কুন্ঠিত গলায় বললাম, আপনি এইটা নিয়ে লিখবেন?

আরও পড়ুন...

বাজে গল্প (১)- বাইগন

বিক্রম পাকড়াশী

বেগুনের ভরের চেয়েও, বেগুনের জিন এর এই গুরুত্ব কিন্তু এর আগে বোঝা সম্ভব হয় নি। আসলে ভেবে দেখতে গেলে, জিএম বেগুনের জিনে এত বেশি রকমের তারতম্য, যে এগুলি বেগুনের উপসর্গ মাত্র। প্রকৃত প্রস্তাবে, এটি একটি সম্পূর্ণ নূতন প্রজাতির সিন্থেটিক সব্জি। এই তো কদিন আগেই বিদেশমন্ত্রী জুবেদা খাতুন রাষ্ট্রসংঘের বক্তৃতায় বললেন যে অর্গ্যানিক বেগুন চাষ বাংলাদেশের কৃষি স্বাধীনতা এবং সামাজিক পছন্দ (সোসাল চয়েস) এর দৃঢ় প্রতীক। কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত জিএম বেগুন যে শুধু মুনাফালোভী চক্রান্ত তাই নয়, সেগুলি বেগুনই নয়। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সদ্ভাব রক্ষা ও গবেষণায় সম্পূর্ণ সাহায্যে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মহামান্য আদালতের রায়ের পরে আশা করা যেতে পারে যে এ নিয়ে কোনওরকম ভুল বোঝাবুঝি থাকবে না ও প্রকৃতির দান প্রকৃতির কাছেই থাকবে। এ নিয়ে যেন দুই দেশের মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্ববোধে আঘাত না লাগে। এমন কি তিনি এও বললেন - লেট বাইগনস বি বাইগনস।

আরও পড়ুন...

সংবাদ সারাক্ষণ

শ্রমণ গৌতম শীল

এই চ্যানেলেও তাঁর টেকার এটাই রহস্য। এই যে তিনি চোখ বন্ধ করে ঘুমে তাতে তাঁর মাথা বন্ধ নেই। ঘুমের মধ্যেও তিনি দেখে চলেছেন যে ওপরের কোনো একটা ঘরে মিটিং হচ্ছে। সেখানে বসে নিত্যপ্রিয় তাঁকে খুব খিস্তি করছে। বলা বাহুল্য নিত্যপ্রিয়ই তাঁকে ‘সমকাল’ পত্রিকা থেকে এখানে এনেছিল। সেখানে থাকাকালীন নিত্যপ্রিয় ও তিনি একই লবিতেও ছিলেন। সম্পাদক-মালিক ছিল বীতশোক ঘোষ। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাঁর, বীতশোক আর নিত্যপ্রিয়র। বীতশোক যত যত মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হয়েছেন তত তত তাঁদের দূরত্ব বেড়েছে। বীতশোক অবশ্য যখন আজকের মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হয়েছেন তখন তিনি মন্ত্রীসভায় এক সদস্য মাত্র এবং কোণঠাসা। তার কিছুদিনের মধ্যেই ছেড়ে দেবেন মন্ত্রীত্ব। তারপরে একদিন ফিরেও আসবেন। আবার মন্ত্রী হবেন। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী যত অসুস্থ হতে থাকবেন, এনার গুরুত্ব বাড়তে থাকবে। বীতশোকও রাজ্য-রাজনীতিতে মাতব্বর হবেন। ভুলে যাবেন এককালে তিনি, নিত্যপ্রিয় ও অমানিশ একসঙ্গে রাত্রে ফিরতেন এক গাড়িতে।
তখন অবশ্য নিত্যপ্রিয় আর বীতশোক দুজনই বেকার। নিত্যপ্রিয় বৌ-এর স্কুল মাস্টারির টাকায় মদ খেয়ে বেড়ায়। কিন্তু স্কুল মাস্টারির টাকা কম বলে নিত্যর সঙ্গী তখন বাংলা। বীতশোকের স্ত্রী অধ্যাপিকা। ফলে বীতশোক বিদেশী মদ তখনো খেতেন। এবং নানা সময়েই নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাজির হতেন সন্ধেটা কোনো রকমে কাটাতে। প্রতিদিন পাবে গেলে অনেকটা টাকা যায়। এমনই এক অনুষ্ঠানে নিত্যপ্রিয়র সঙ্গে নতুন করে সখ্যতা। বীতশোককে মদ খাওয়ার পরে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটা নিতে নিত্যপ্রিয়র কোনো সমস্যা ছিল না। বিদেশী মদ এবং সঙ্গের চাট জুটলে সে জুতোও পরিয়ে দিতে পারে। প্রেস ক্লাবে মদ সস্তা এবং সেই খেতে ও আরো নানা জটিল ইক্যুয়েশন কশতে দুজনেই যেতেন সেখানে। প্রেস ক্লাব থেকে অমানিশের পত্রিকার রাত্রের গাড়িতে তিনজনে ফিরতেন বেশিরভাগ দিন।

আরও পড়ুন...

ছবি-ছাব্বা

শঙ্খ কর ভৌমিক

কার্টুনের শিরোনাম ? ঠিক করুন আপনারাই !

আরও পড়ুন...

হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ

ইন্দ্রনীল ঘোষদস্তিদার

এর থেকে মনে হয়, হাসাকে যতটা সুখী ভাবতাম-মানে এখন ভাবছি বসে- ততটা সুখী নিশ্চয় সে ছিল না। শাশুড়ী ও পোড়া রুটি প্রসঙ্গে তার অত খচে যাওয়ারই বা কি ছিল, সেসব কি তার দুর্বল পয়েন্ট, অ্যাকিলিসের হিল? আর বনিতা, সে-ই কি সার্থক সুখী ছিল?  নাকি সুখের কল্পনা করে রস পেত এত?সে কি হাসা'র নাম করে নিজের ভবিষ্যৎজীবনের সুখের ছড়াই বানাত বসে বসে?  এমন বনিতা , যার পায়ে সোনার নূপুর, যার শাশুড়ী পালিয়ে বেঁচেছে, এবং যে দিনান্তে পেট ভরে রুটিটা - পোড়া হোক যাই হোক-অন্ততঃ খেতে পায় ! এইরকম সব প্রশ্ন পায় এখন ভাবতে বসলে। হাসা ও বনিতাকে পেলে খুঁটিয়ে জেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তাদের পেলে তবে তো ! আমারও বয়স বাড়লো, আর দুজনেই  এক এক করে- না,  যা ভাবছেন তা নয়, একসঙ্গে   নয়- যে যার মত আলাদা আলাদা কোথায় যে খসে পড়লো, কে জানে। আর তাদের খুঁজে পাওয়া গেল না।

আরও পড়ুন...

সিলেবাসের মেয়েরা

সুমেরু মুখোপাধ্যায়

মরা মাছের চোখের মত তা ছিল ক্ষুদ্র ও নিষ্প্রভ, আমাদের স্কুল জীবন বা মফস্বল। মরা মাছের চোখ যায় যত দূরে, সাইকেল বুঝি কখনো অপেক্ষা করত ঠিক ততটা দূরে পার্শ্ববর্তী স্কুলের শেষ ঘন্টাটি শোনার জন্য। কার জন্য, আজও জানি না। তবে, রবিবারে ক্ষমাদি আসতেন সেতার শিখতে পাশের বাড়িটিতে, তার শাড়ি বা সালোয়ার মিশে থাকত তার পেলব ত্বকে, আজ যদি বলি সে’ই ছিল সেতার আর হাসলে ঝালা বাজত দুই বাড়ির সীমানায় থাকা কাঞ্চন ফুলের গাছে, তাহলে আজ সেই শহরের অনেকেই মেনে নেবেন, সেই ছিল আমাদের মধুবালা টু সুচিত্রা সেন। মাধ্যমিকের পর জেনেছিলাম ক্ষমাদির ছেলে পড়ে আমার থেকে এক ক্লাস নীচুতে, কাজেই দলে ভারী হওয়ারই সম্ভাবনা। গুপী ডাক্তারের মেয়ে মহাশ্বেতা ছিল আমার থেকে দুই বছরের ছোট। শান্ত মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে তর্ক করত নাওয়া-খাওয়া ভুলে, সেই JNU যাওয়ার আগে পর্যন্ত। কানগুলো লাল হতে হতে কখন যে ঝান্ডা হয়ে পতপত করে উড়ত টের পেতাম না। ভাবতাম বুঝি ম্যাজিক দেখছি, সে যে শুধু আমিই দেখতাম না তা নয়, বিজনজেঠুকে সাইকেলে নিয়ে তাদের বাড়ি যাওয়া সূত্রে; বিজনজেঠুই দেখতে পেত সকলের আগে। আমি কি ছাই সে বয়সে অত কিছু দেখতে পেতাম, আজও হয়ত পাইনে, কিন্তু মহাশ্বেতা উফফ সে এক প্রকাণ্ড কাণ্ড বটে, বিজনজেঠুর সঙ্গে তর্ক করত বেদ-উপনিষদ নিয়ে যার বিন্দুমাত্র বুঝতাম না আমি, নির্ঘাত সেসব বেদ-উপনিষদ ফ্রেঞ্চ নতুবা জার্মান ভাষার। টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আমাদের পাশের কোয়ার্টারের গায়েনকাকুর ছিল তিন মেয়ে শাশ্বতী, মহুয়া আর কাকলি। ছোটটি আমার সমবয়সি গানের গলা ছিল তারাপদ রায়ের মত। মেজটি একবছর অন্তর ফেল করে সমক্লাসী হয়েছিল, একদা। বড় মেয়ে সারা জীবনে একটা ছবিই নিদেন পক্ষে দশ হাজারবার এঁকে ছিল গুচ্ছের মোম ও জলরঙ নষ্ট করে। একটা বাঁশ যার মাথাটা মানুষের। কম্পিটিশনে-টনে ‘একটি গ্রামের দৃশ্য’ বা ‘বাংলার উৎসব’ বিষয় দেওয়া থাকলেও সে সেই হাইফান্ডার ছবিটিই আঁকত, ফলের আশা না করে। তার দেখাদেখি মেজ মেয়েটিও যখন ওই একই ছবি সকাল বিকেল প্র্যাকটিশ করতে শুরু করে সেই সময়ে আমরা কোয়ার্টার ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই। আমাদের একরত্তি মফস্বলে রুমঝুম মিত্র সম্ভবত বিখ্যাত ছিল অনেক কারণেই। প্রয়াগে যেমন গঙ্গা আর যমুনাকে রঙের তারতম্যে চেনা যায় তেমনি ছিল রুমঝুমের অন্তঃ ও বহিঃবাসের তফাত। অন্তঃ বলে কিছু আদিতে থাকলেও অন্তে থাকত না। অতএব সে ছিল ডাকাবুকো। প্রেম করত তারক নামের এক মোটর মেকানিক বা গ্যারেজের মালিকের সঙ্গে। মাধ্যমিকের পর তিনমাসের ছুটির অবকাশে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলে। আমি আমার উচ্চ-মাধ্যমিকের পর দেখেছি রুমঝুম বাচ্চা কোলে নিয়ে এক হাতে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চিত বুক ফুলিয়েই, বাচ্চার আড়াল থাকায় ততটা টের পাই নাই, মাইরি। আমাদের স্কুলের পাশেই গঙ্গা বরাবর হুগলি মহসীন কলেজে আমরা ক্লাস করতে যেতাম, উঁহু কোন জয়-জয়ন্তীর অপর্ণা সেন গোছের দিদিমণির জন্য নয়, সামান্য এক ছাত্রীর জন্য। ফলে ক্লাসের বিষয় ছিল গৌণ, চিত্রোপমা সেনগুপ্ত ঢের ঘটনাপ্রবণ, ফলে সব ক্লাসই ছিল দর্শনের। স্কুলের ব্যাগে একটা টি-শার্ট ভরা থাকত টানা বছর খানেক, দর্শন-শাস্ত্রে অনার্স পড়ার মামুলি পাসপোর্ট। স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখার চাইতে অন্য সিনেমায় প্রবেশ করতাম আমরা, আদি বাংলায় যার নাম ঝারি। এক ফুল দো মালি, মেনলি দুই বন্ধুর অভিপ্রায় বদবুদ, তার নামটা আর কবরস্থানে উল্লেখ করলাম না চারপাশে অশান্তির সংসারে বোঝা না বাড়ানই শ্রেয়, আজকাল সমতলেও ল্যান্ড স্লাইড ঘটছে ঘনঘন, ললিতা রায় বলে দিয়াছে গোরস্থানে সাবধান। ইউনিফর্ম বদলে সোজা কলেজ। এটা ছিল বেশ নিয়মিত ব্যপার, একজন অধ্যাপক আমাকে নামেও চিনতেন মনে আছে। সেই চিত্রোপমার নামডাক ছিল প্রেম ভাঙতে, সিওওওওওওওওওর শট। আভিজিৎ-মৌসুমীর তিন বছরের জমাট প্রেম ভাঙ্গতে সে সময় নিয়েছিল সাড়ে তিন মিনিট, মাত্র একটি চুম্বন। হায় তখন আমাদের জমাটি প্রেম নাই, ভাঙাভাঙিও নাই, শুধু হতাশা। ইংলিশ অনার্সে পড়ত রানু। রানু চক্রবর্তী। বিটিপিএস থেকে আসত। বন্ধু প্রতনুর তখন প্লে টাইম। আরেক সহপাঠী মিত্রার সঙ্গে লুকিয়ে চুটিয়ে প্রেম করায় রানুর কাছে আমি গেছি মাঝে মাঝে প্রক্সি দিতে, ডিস্ট্যান্ট প্রক্সিমিটি। ইংলিশ অনার্স পড়া রানু আমার সেকেন্ড পেপারের রিয়েল আনালিসিসের ক্লাস নোট সুন্দর করে ফেয়ার করে দিত, পাছে আমার একটু লেখাপড়ায় মন বসে। হা হতোস্মি, কাকস্যপরিবেদনা। না আমার কিস্যু পরিবর্তন হয়নি তাতে, বোঝে না সে বোঝে না। পরে, বছর ৫/৬ পরে শুনেছিলাম রানু বাড়ি থেকে পালিয়েছে শীতে কাশ্মীর থেকে আসা এক শাল-ওয়ালার সঙ্গে। কাজেই অকরিতকর্মা হিসাবে যেমন পেকে ঝানু হচ্ছিলাম দিনকেদিন, তেমনই পালাচ্ছিলাম সেই ছেঁড়া গার্ডারের মত নদীটির পাশে পড়ে থাকা চেনা মফস্বল ছেড়ে, কোন উপসিদ্ধান্তে আসাটা জরুরি নয় জেনেও। জানালার বাইরে তখন প্রবল ঝড়। মন অশান্ত। ঝান্ডা, মায়া, ভাষা সব সুনির্দিষ্ট অলৌকিকতার বশবর্তী ছিল না। অতঃপর আখ্যান আরম্ভ।

আরও পড়ুন...

বাটা ঝিলমিল বাটা ঝিলমিল বন্ধু খাওরে বাটার প্রাণ

সামরান হুদা

আমরা, ছোটরা তখন দাদির মুখের চিবুনো পান খেতাম। অনেকক্ষণ ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে পান খেত না দাদি। খানিকক্ষন চিবিয়ে রসটা খেয়ে নিয়ে পানটা হাতে নিয়ে আওয়াজ দিত, ‘পান কেডা খাইবি আয় রে’ বলে। ততক্ষণে পানের রসে টুকটুকে লাল হয়ে যেত টকটকে ফর্সা দাদির দুই ঠোঁট আর ঠোঁটের কষ। তাকালে দেখা যেত অপূর্ব এক লালের আভা ছড়িয়েছে ঠোঁট ছাড়িয়ে চিবুকের খাঁজে, বয়েসের ভাঁজে। একটা দুটো হাত সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে যেত সেই চিবুনো পান খাওয়ার জন্যে। সকালের নাশ্‌তা বা দুপুরের খাওয়া বা বিকেলের চায়ের পরে আব্বা যখন বারান্দায় দাদির বেতের সোফার পাশে দ্বিতীয় সোফাখানিতে গিয়ে বসত, তখন একখিলি করে পান এগিয়ে দিত দাদি। মায়ের পাশে বসে গল্প করতে করতে পান চিবুতো আব্বা।

আরও পড়ুন...

আলোহোমোরা

কৃষ্ণকলি রায়

এইই বিভ্রমের গল্প। এগারো বছর আগে একজন ঘুমপাড়ানী বুড়ো এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে যে উপহার দিয়ে গেছিলেন সেই গল্প। এখনও আমার ব্রেনে এনকেফালোম্যালেশিয়া আসন পেতে রয়েছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় এই নিয়ে আরো জানি। পড়ে ফেলি অনেক কিছু। জিজ্ঞেস করি যাঁরা জানেন তাঁদের। আবার পরের মূহূর্তে ভাবি -- থাক। ভালো লাগে এই অন্য দুনিয়ায় মাঝে মাঝে পা রেখে ফিরে আসতে। ম্যাজিক দুনিয়ার সমস্তটা জেনে ফেলে কী লাভ? ভালো লাগে এইই। ভালো লাগে যখন বিভ্রম আমার ঘাড়ের ওপর ফুঁ দেয়। আমার কানে কানে হাওয়ার স্বরে ফিসফিস করে বলে-- 'আলোহোমোরা'।

আরও পড়ুন...

কাব্যি

গাজন - সোমনাথ রায়

লিটলমেঘ মেলা - শুভ্রনীল সাগর                 

গণেশ পাইনের রানি - শিবাংশু দে

না-হওয়া কথারা -সোনালি সেনগুপ্ত

দৃষ্টিকোণ  - শান্তনু রায়

মামুলি কথা -মলয় ভট্টাচার্য

মুকুর - শ্ব 

মর্স কোড - অধীশা সরকার

গুহালিপি - চিরন্তন কুণ্ডু 

মনান্তর - নিশান চ্যাটার্জী

স্বগতভাষণ - সুমন মান্না 

ফেরা - মিঠুন ভৌমিক  

 

 

আরও পড়ুন...

স্কুলের পথে

শঙ্খ কর ভৌমিক

নতুন ছেলেটা খুব বকবক করছে। মেয়েটা খুব হাসছে। প্রথম ছেলেটার মুখে ক্ষুণ্ণ ভাব। হঠাৎ খেয়াল করে টিনের বাক্সটা এখনো তার হাতে। বাক্সটা মেয়েটাকে ফেরত দেয়। মেয়েটা এর হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে অম্লানবদনে অন্য ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে প্রথমজনের মুখের ক্ষুণ্ণ ভাবটা আরো বেড়ে গেল।

একটু পরে পথের ধারে একটা খারাপ হয়ে যাওয়া রোড রোলার। প্রথম ছেলেটা হাঁচোড়পাচোড় করে ড্রাইভারের সিটে ওঠার চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে সঙ্গীরা অনেকটা এগিয়ে গেছে দেখে হাল ছেড়ে দিয়ে আবার হাঁটা লাগায়।

স্কুল মনে হয় আর বেশি দূরে নয়। রাস্তায় এদের মতই রংজ্বলা নীল হাফপ্যান্ট অথবা স্কার্ট পরা কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়ে দেখা যাচ্ছে এবার।

আরও পড়ুন...

কাঠপাতার ঘর

কুলদা রায়

বাড়ির পেছন দিকে ছিল একটা এঁদো ডোবা। আর ঘন ঘাস। এই ঘাস শুকিয়ে হয়েছিল আমাদের প্রিয় বিছানা। এই নরম গরম বিছানায় আমরা জড়াজড়ি ঘুমাতাম। আবার ঘুমের মধ্যে স্বপ্নও দেখতাম। সে সময় আমাদের একটি ছোটো বোন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ও স্বপ্ন দেখতে জানত না।

আরও পড়ুন...

নিদ্রাকাল

পাপড়ি রহমান

বাদুরে খেয়ে ফেলা লিচুর খোসার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অন্ধকারে ফচকাটা ঝলসে ওঠে! রাত্তির সবে গভীর হতে শুরু করেছে। ঘন-দুধের সর হয়ে তখনো তা পুরু হতে পারে নাই! অথচ শলাগুলোর তীক্ষ্ণ আগা আয়শা খাতুনের দিকে তাক করা! খানিক পরই তা ধাই করে বুকে বিঁধে যাবে। একেবারে বাম পার্শ্বে। বাম পাশ, না ডান? ডান পাশ, না বাম? যেনো ভয়ানক তাল-বেতালের ভেতর পড়ে আয়শা খাতুন উদ্দিশ করতে পারে না! কিন্তু সে নিশ্চিত জানে তাক করে থাকা ফচকাটা তাকে বিদ্ধ করবে। করবেই। ফচকার ধারালো শলা বুকের মাংসপেশিতে ঠিক ইঞ্চি তিনেক গেঁথে যাবে। মুহূর্তে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটবে। আর আয়শা খাতুন তখন আর্তনাদ করে উঠবে। তীব্র-তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। অতঃপর মরিয়া হয়ে সুইচ বোর্ড হাতড়াবে। কাঠের বোর্ডটা হাতে ঠেকলে খুট করে সুইচ জ্বালাবে। 

এই পর্যন্তই।

তারপর সবকিছু শান্ত। স্থির। নিরব। নির্জন। নিথর। একেবারে গোরস্থানের মতো থই থই নির্জনতায় ভরে যাবে ঘরখানা। আয়শা খাতুন ধীরে সুস্থে এই নির্জনতায় পা ডুবাবে। বালিশের কাছে রাখা চশমাটা চোখে পড়বে। চশমা চোখে নিজের বুক-পেট ভালো করে দেখবে। হাতিয়ে হাতিয়ে রক্তচিহ্ন খুঁজবে। অতঃপর ফচকার তীক্ষ্ণধার শলাগুলো খুঁজবে। কিন্তু কোথাও কিনা ওইসবের আলামত নাই! সব যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে!

আয়শা খাতুন চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলবে। আঁচলের কোণা দিয়ে ভালো করে মুছে-টুছে ফের পড়বে। এবং পুনরায় দেখার চেষ্টা করবে। কোথায় সেই ক্ষত? কোথায় রক্তের প্রপাত? ঝলসে ওঠা ফচকা? এই সবের চিহ্নও কোথাও নাই!

এই রকম অযাচিত বিপদে আয়শা খাতুন কালে-ভদ্রে পড়েছে। অবশ্য এ বিষয়টাও তো নিশ্চিত নয়। জীবন যদি মস্তক হয় তাহলে তার লেজ হলো বিপদ! ফলে যতদিন জীবন ততদিন বিপদ। ধড় থেকে লেজ আলাদা করা যায় না। জীবন আর বিপদ তাই আষ্টে-পৃষ্টে বাধা থাকে!

আরও পড়ুন...

চিহ্ন

মাজুল হাসান

আমার মা ফার্মগেট চিহ্নিত করে রাখে একটা ব্যানার দিয়ে। যাতে লেখা ‘গরু-ছাগলের বিরাট হাট’। পাশ দিয়ে দুইটা বড় বিল্ডিং, তারপর টুকরি-মাথায় কয়টা বেঞ্চি, কিছু গাছ, হ্যাঁ পার্ক, তারপরেই চক্ষু হাসপাতাল। মায়ের চোখে সমস্যা। মা আমাকে চিনতে পারো তো মা? মা-মা! বারবার বলার পরও তার এই বাতিক যায় না। আরে বাবা, অই ব্যানার যে আজীবন থাকবে না—এই জানা কথা তারে কে বোঝায়? এমন তো হইতে পারে একদিন দেখা গেল—সামনে দিয়ে কালো বিড়াল পথ কেটে যায়নি, বাম চোখ সকাল থেকে থেকে-থেকে নাচেনি, আমার মা যাকে বলে চৌখ নাচানি, বলে ডাইন চৌখ নাচলে সুসংবাদ আর বাম চৌখ নাচিলে তোর কপালোত শনি। এমন তো হতে পারে সব পূর্বাভাসের দেবতারা, চিহ্নগুলো উধাও হয়ে গেছে! তখন? মা তারপরেও নাখালপাড়াকে চিনে রাখে ‘এইখানে ভাল হাতের কাজ করা হয়’, ইন্দিরা রোডকে ‘বনসাই প্রশিক্ষণ’ আর নিজের বাসাকে চিনে রাখে তিন রোড আগে একটা মস্ত বড় খাড্ডা দিয়ে। আমার ভয় করে। মা আমাকে চিনতে পারো তো মা? আমি তোমার লাল, মা, আমি তোমার লাল, লাল পান্না। আমি বলি মা পান্নাতো সবুজ। তবু মা টাকা জমায়, বুড়া বয়সে তাকে কে দেখবে? কে? এর কাছ থেকে চেয়ে, আধিয়ারের কাছে তিন ছটাক ধানের প্রাপ্য বুঝে নিয়ে, বাপের পকেট কেটে, আমাদের গিফটের টাকা জমানোর নাম করে, আমার সুন্নতের কচকচি নতুন ২ টাকার বান্ডিলের কথা এইমাত্র মনে পড়ল, এইভাবে নিজের পাত থেকে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য সরিয়ে রাখে মা। ‘মা আমি তো আছি’—বলতে পারি না। বলতে পারি না, মা এক ভয়ানক রূপসীর হাত থেকে পালিয়ে আছি, ওরা আমাকে মিষ্টি খাওয়াইতে চায়। মা সুরা পড়ে, ফুঁ দেয়, আমার চোখে মুখে লেপ্টে যায় বর্ণমালা। মা আমার হাতে লেখে ‘পুত্র’, চোখে লেখে ‘নীল’, হাতে-পায়ে ফোঁড়ার দাগের একটু নিচে লিখে দেয়— ‘৮ সোনারগাঁও জনপথ রোড, উত্তরা, মাস্কট প্লাজা থেকে সোজা পশ্চিমে একটা ৪ রাস্তা, তারপরে আরেকটা ৪ রাস্তা, দুই তিনটা বাড়ির পর একটা তিন ডাবগাছঅলা বাড়ি’—যাতে লোকে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারি এই আমার বাড়ির ঠিকানা।

আরও পড়ুন...